ঢাকা ০২:৪৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে ঝুঁকিতে ২ কোটি ৩৪ লাখ শিশু: ইউনিসেফ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৪:৩৬:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
  • / 24

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বৈশ্বিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অতিরিক্ত ২ কোটি ৩০ লাখের বেশি শিশু দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে।
নতুন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর ফলে বছরের পর বছর ধরে যেসব অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে তা ম্লান হতে পারে, লাখ লাখ শিশু আরও দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারে এবং বৈষম্য বাড়বে।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) এক বিবৃতিতে ইউনিসেফ জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং এর প্রভাবে সমুদ্র পথে পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় শিশুদের ওপর ব্যাপক ক্ষতিকর এবং অনেক ক্ষেত্রে অপূরণীয় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর ফলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ অতিরিক্ত ২ কোটি ৩৪ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারে। আজ বৃহস্পতবিার প্রকাশিত ইউনিসেফের নতুন এক বিশ্লেষণে এই সতর্ক বার্তা উঠে এসেছে।

দ্য ইম্প্যাক্ট অব দ্য ওয়ার ইন দ্য মিডল ইস্ট অন চিলড্রেন ইন মানিটারিলি পুওর হাউজহোল্ডস শীর্ষক এই বিশ্লেষণে বিশ্বের ১৬৭টির বেশি দেশের তথ্য নিয়ে কাজ করা হয়েছে। এখানে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পণ্য পরবিহনে বিঘ্নসহ বৃহত্তর অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি খাবার ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে কীভাবে পরিবারগুলোর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সামর্থ্য কমেছে, তার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। এর সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা।

“মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের মূল্য দিচ্ছে শিশুরা- শুধু ওই অঞ্চলের নয়, বহু দূরবর্তী অঞ্চলের শিশুদেরও এর মূল্য দিতে হচ্ছে,” বলেছেন ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথেরিন রাসেল। তিনি বলেন, “এটা যত দিন চলতে থাকবে, এর প্রভাব ততটা ভয়াবহ হবে। নিত্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় অনেক পরিবারের জন্য খাবার কেনা ও শিক্ষা অব্যাহত রাখা এখন সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। আর যেসব শিশু আগে থেকেই দারিদ্র্যের মধ্যে ছিল, তাদের জন্য এই সংকট বঞ্চনাকে আরও গভীর করছে এবং এর প্রভাবে তাদের এমন ক্ষতি হতে পারে যার প্রভাব থাকবে সারা জীব্ন।”

প্রতিবেদনে দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে- বিরূপ ও তীব্র দারিদ্র্য। বিরূপ পরিস্থিতিতে মাঝারি মাত্রার অর্থনৈতিক অভিঘাতের কারণে অতিরিক্ত ১ কোটি ৮৩ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে। আর যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তীব্র পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তাতে দীর্ঘমেয়াদে পণ্য পরিবহন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হয়ে অতিরিক্ত ২ কোটি ৩৪ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে চলে যেতে পারে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষতির সঙ্গে শিশুদের অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র হওয়ার জোরালো সম্পর্ক রয়েছে। খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় এবং অনেক দেশের সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে পরিবারগুলোর জন্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছে।

অর্থনৈতিক দারিদ্র্য সবচেয়ে বেশি বাড়তে পারে এশিয়া ও আফ্রিকায়। বিশ্বে মোট যে সংখ্যায় অর্থনৈতিক দারিদ্র্য বাড়তে পারে, তার প্রায় ৮০ শতাংশই হবে এই দুই অঞ্চলে। এই দুই মহাদেশে আগে থেকেই দারিদ্র্যের হার বেশি এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে যে কোনো বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হলে তার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে এই দুই মহাদেশে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সোমালিয়ায় মধ্যপ্রাচ্য সংকটের তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা দিয়েছে। সংঘাত শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই মোগাদিশুতে জ্বালানির দাম বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। এর প্রভাবে খাবার, পানি, পরিবহন ও মানবিক সহায়তার খরচও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশটি আরও তীব্র অপুষ্টিজনিত সংকটের মধ্যে পড়েছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় ইথিওপিয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর। ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩১ শতাংশ। আর মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে ব্যবহৃত জ্বালানির খরচ বেড়েছে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ। ফলে দুর্গম এলাকায় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই অর্থনৈতিক অভিঘাতে নাইজেরিয়ায়ও দারিদ্র্য বেড়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই খাদ্য ও যাতায়াতে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও তাদের ক্রয়ক্ষমতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশেও চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, শাকসবজি, মাছ ও মুরগির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। এর ফলে দেশে অতিরিক্ত প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে চলে যেতে পারে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে বহু বছরের অর্জিত অগ্রগতি পিছিয়ে পড়ছে। সময়োচিত ও লক্ষ্যভিত্তিক নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই সংকট লাখ লাখ শিশুকে আরও পিছিয়ে দেবে। এর ফলে দারিদ্র্য আরও বাড়বে এবং পরিবারগুলোর জন্য ঘুরে দাঁড়ানো আরও কঠিন হয়ে উঠবে। এই সংকট শিশুদের সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা সেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত করে দিচ্ছে।

এই সংকটের মারাত্মক গুরুতর প্রভাব থেকে শিশুদের সুরক্ষার জন্য ইউনিসেফ বিভিন্ন দেশের সরকার, দাতা দেশগুলোর সরকার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এ জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে:

স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও শিশু সুরক্ষাসহ যেসব সেবা ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর শিশুরা নির্ভরশীল, সেগুলো অব্যাহত রাখতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ ও টেকসই করা, যার মধ্যে শিশুবান্ধব নগদ সহায়তা কর্মসূচি রয়েছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন পণ্য ও সেবায় ভর্তুকি প্রত্যাহারের আগে যেন সহায়তা অব্যাহত থাকে, তা নিশ্চিত করা।

মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম সরকারি ব্যয় নিশ্চিত করে শিশু ও পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সেবা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে পাওয়া নিশ্চিত করা।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো অপরিহার্য খাতগুলোতে দেশীয় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো। যেসব দেশে ঋণ পরিশোধে স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা সামাজিক সুরক্ষার চেয়ে বেশি ব্যয় হয়, সেখানে ঋণ পরিশোধ স্থগিত বা ঋণ পুনর্গঠনের মতো ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

শিশুর প্রয়োজনীয়তাগুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং তা বাস্তবায়ন করা, যাতে ভবিষ্যতে সংকট দেখা দিলে দ্রুত ও বৃহৎ পরিসরে শিশুদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে নতুন করে আসা অভিঘাতের প্রভাব কমাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও জোরদার করা প্রয়োজন।
“এই সংকট শিশুদের জীবন ও ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বিশ্ব যদি দ্রুত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয় তাহলে সংঘাত, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও মূল্যবৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাব লাখ লাখ শিশুকে গভীর দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দেবে,” বলেছেন ক্যাথেরিন রাসেল। তিনি আরও বলেন, “এতে বহু বছরের কষ্টার্জিত উন্নয়ন অর্জনও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।”

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে ঝুঁকিতে ২ কোটি ৩৪ লাখ শিশু: ইউনিসেফ

সর্বশেষ আপডেট ০৪:৩৬:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বৈশ্বিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অতিরিক্ত ২ কোটি ৩০ লাখের বেশি শিশু দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে।
নতুন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর ফলে বছরের পর বছর ধরে যেসব অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে তা ম্লান হতে পারে, লাখ লাখ শিশু আরও দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারে এবং বৈষম্য বাড়বে।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) এক বিবৃতিতে ইউনিসেফ জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং এর প্রভাবে সমুদ্র পথে পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় শিশুদের ওপর ব্যাপক ক্ষতিকর এবং অনেক ক্ষেত্রে অপূরণীয় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর ফলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ অতিরিক্ত ২ কোটি ৩৪ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারে। আজ বৃহস্পতবিার প্রকাশিত ইউনিসেফের নতুন এক বিশ্লেষণে এই সতর্ক বার্তা উঠে এসেছে।

দ্য ইম্প্যাক্ট অব দ্য ওয়ার ইন দ্য মিডল ইস্ট অন চিলড্রেন ইন মানিটারিলি পুওর হাউজহোল্ডস শীর্ষক এই বিশ্লেষণে বিশ্বের ১৬৭টির বেশি দেশের তথ্য নিয়ে কাজ করা হয়েছে। এখানে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পণ্য পরবিহনে বিঘ্নসহ বৃহত্তর অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি খাবার ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে কীভাবে পরিবারগুলোর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সামর্থ্য কমেছে, তার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। এর সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা।

“মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের মূল্য দিচ্ছে শিশুরা- শুধু ওই অঞ্চলের নয়, বহু দূরবর্তী অঞ্চলের শিশুদেরও এর মূল্য দিতে হচ্ছে,” বলেছেন ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথেরিন রাসেল। তিনি বলেন, “এটা যত দিন চলতে থাকবে, এর প্রভাব ততটা ভয়াবহ হবে। নিত্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় অনেক পরিবারের জন্য খাবার কেনা ও শিক্ষা অব্যাহত রাখা এখন সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। আর যেসব শিশু আগে থেকেই দারিদ্র্যের মধ্যে ছিল, তাদের জন্য এই সংকট বঞ্চনাকে আরও গভীর করছে এবং এর প্রভাবে তাদের এমন ক্ষতি হতে পারে যার প্রভাব থাকবে সারা জীব্ন।”

প্রতিবেদনে দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে- বিরূপ ও তীব্র দারিদ্র্য। বিরূপ পরিস্থিতিতে মাঝারি মাত্রার অর্থনৈতিক অভিঘাতের কারণে অতিরিক্ত ১ কোটি ৮৩ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে। আর যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তীব্র পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তাতে দীর্ঘমেয়াদে পণ্য পরিবহন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হয়ে অতিরিক্ত ২ কোটি ৩৪ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে চলে যেতে পারে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষতির সঙ্গে শিশুদের অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র হওয়ার জোরালো সম্পর্ক রয়েছে। খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় এবং অনেক দেশের সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে পরিবারগুলোর জন্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছে।

অর্থনৈতিক দারিদ্র্য সবচেয়ে বেশি বাড়তে পারে এশিয়া ও আফ্রিকায়। বিশ্বে মোট যে সংখ্যায় অর্থনৈতিক দারিদ্র্য বাড়তে পারে, তার প্রায় ৮০ শতাংশই হবে এই দুই অঞ্চলে। এই দুই মহাদেশে আগে থেকেই দারিদ্র্যের হার বেশি এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে যে কোনো বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হলে তার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে এই দুই মহাদেশে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সোমালিয়ায় মধ্যপ্রাচ্য সংকটের তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা দিয়েছে। সংঘাত শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই মোগাদিশুতে জ্বালানির দাম বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। এর প্রভাবে খাবার, পানি, পরিবহন ও মানবিক সহায়তার খরচও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশটি আরও তীব্র অপুষ্টিজনিত সংকটের মধ্যে পড়েছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় ইথিওপিয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর। ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩১ শতাংশ। আর মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে ব্যবহৃত জ্বালানির খরচ বেড়েছে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ। ফলে দুর্গম এলাকায় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই অর্থনৈতিক অভিঘাতে নাইজেরিয়ায়ও দারিদ্র্য বেড়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই খাদ্য ও যাতায়াতে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও তাদের ক্রয়ক্ষমতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশেও চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, শাকসবজি, মাছ ও মুরগির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। এর ফলে দেশে অতিরিক্ত প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে চলে যেতে পারে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে বহু বছরের অর্জিত অগ্রগতি পিছিয়ে পড়ছে। সময়োচিত ও লক্ষ্যভিত্তিক নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই সংকট লাখ লাখ শিশুকে আরও পিছিয়ে দেবে। এর ফলে দারিদ্র্য আরও বাড়বে এবং পরিবারগুলোর জন্য ঘুরে দাঁড়ানো আরও কঠিন হয়ে উঠবে। এই সংকট শিশুদের সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা সেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত করে দিচ্ছে।

এই সংকটের মারাত্মক গুরুতর প্রভাব থেকে শিশুদের সুরক্ষার জন্য ইউনিসেফ বিভিন্ন দেশের সরকার, দাতা দেশগুলোর সরকার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এ জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে:

স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও শিশু সুরক্ষাসহ যেসব সেবা ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর শিশুরা নির্ভরশীল, সেগুলো অব্যাহত রাখতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ ও টেকসই করা, যার মধ্যে শিশুবান্ধব নগদ সহায়তা কর্মসূচি রয়েছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন পণ্য ও সেবায় ভর্তুকি প্রত্যাহারের আগে যেন সহায়তা অব্যাহত থাকে, তা নিশ্চিত করা।

মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম সরকারি ব্যয় নিশ্চিত করে শিশু ও পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সেবা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে পাওয়া নিশ্চিত করা।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো অপরিহার্য খাতগুলোতে দেশীয় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো। যেসব দেশে ঋণ পরিশোধে স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা সামাজিক সুরক্ষার চেয়ে বেশি ব্যয় হয়, সেখানে ঋণ পরিশোধ স্থগিত বা ঋণ পুনর্গঠনের মতো ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

শিশুর প্রয়োজনীয়তাগুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং তা বাস্তবায়ন করা, যাতে ভবিষ্যতে সংকট দেখা দিলে দ্রুত ও বৃহৎ পরিসরে শিশুদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে নতুন করে আসা অভিঘাতের প্রভাব কমাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও জোরদার করা প্রয়োজন।
“এই সংকট শিশুদের জীবন ও ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বিশ্ব যদি দ্রুত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয় তাহলে সংঘাত, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও মূল্যবৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাব লাখ লাখ শিশুকে গভীর দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দেবে,” বলেছেন ক্যাথেরিন রাসেল। তিনি আরও বলেন, “এতে বহু বছরের কষ্টার্জিত উন্নয়ন অর্জনও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।”