ক্ষমতা দেখালেন বিআরটিএ’র শহীদুল্লাহ ও মাসুদ!
- সর্বশেষ আপডেট ০৮:৪০:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
- / 67
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর একটি রহস্যজনক বদলি আদেশ ঘিরে ফের তোলপাড় শুরু হয়েছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত দুই কর্মকর্তা- সদর কার্যালয়ের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মো. মাসুদ আলম- কে বদলির মাত্র ৪৬ ঘণ্টার ব্যবধানে সেই আদেশ বাতিল করা হয়।
বিআরটিএর ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এটি সাধারণ কোনো বদলি নয়। বরং প্রভাবশালী একটি চক্রের হস্তক্ষেপেই শেষ মুহূর্তে বদলির আদেশ বাতিল করা হয়েছে। ফলে নিজেদের চেয়ার অক্ষত রেখেছেন বহুল আলোচিত এই দুই কর্মকর্তা।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মো. মাসুদ আলম দীর্ঘদিন ঢাকার মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়ে উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালের ২২ জুন পদোন্নতি পেয়ে খুলনায় গেলেও ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক হিসেবে যোগ দেন এবং এখনো সেই পদেই বহাল আছেন।
২০১৭ সালে তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের একটি মন্তব্যের পর তিনি দেশজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘ভাইরাল মাসুদ’ নামে।
মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়ে সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগের মুখে ওবায়দুল কাদের প্রকাশ্যে বলেছিলেন, “ভালো হয়ে যাও মাসুদ।”
সেখানেই থেমে থাকেননি তিনি। আরও বলেছিলেন, “মাসুদের সঙ্গে দেখা হলেই আমি বলি, মাসুদ তুমি ভালো হয়ে যাও। কিন্তু সে এখনও পুরোপুরি ভালো হয়নি। ব্যবহার ভালো, মধুর মতো। কিন্তু যা করার একটু ভেতরে ভেতরে করে।”
বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও সেই মন্তব্য আজও বিআরটিএর করিডোরে আলোচনার বিষয়।
অন্যদিকে পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধেও রয়েছে গুরুতর অভিযোগের পাহাড়। ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময় চট্টগ্রামে কর্মরত অবস্থায় ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিকশা প্রতিস্থাপনে প্রতি ইউনিটে ২ লাখ টাকা এবং নিবন্ধনের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে উৎকোচ আদায়ের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, উত্তরা মোটরসের সাতজন ডিলার এই লেনদেনে মধ্যস্থতাকারী ছিলেন। শুধু এই একটি প্রকল্প থেকেই ২৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এতেই শেষ নয়। ভারতে তৈরি চার আসনের দুই হাজার ম্যাগজিমা অটোরিকশাকে বেআইনিভাবে সাত আসনের অটো-টেম্পু হিসেবে নিবন্ধন দিয়ে গাড়িপ্রতি ২ লাখ টাকা করে মোট ৪০ কোটি টাকা ঘুষ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া চট্টগ্রামের ২০ হাজার ‘গ্রামবাংলা’ সিএনজি অটোরিকশা থেকে গাড়িপ্রতি ৩০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সরকার পরিবর্তনের পর গত বছরের ৪ মার্চ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহকে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয় থেকে সদর কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। সেই আদেশও তিনি চ্যালেঞ্জ করেন এবং দীর্ঘদিন নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। পরে ২৩ জুন তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়।
এরপর চলতি বছরের ৭ মার্চ উপপরিচালক (প্রশাসন) তানভীর আহমেদ সিদ্দিকি স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে শহীদুল্লাহকে রোড সেফটি বিভাগের পরিচালক এবং মাসুদ আলমকে সদর কার্যালয়ের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) হিসেবে বদলি করা হয়।
আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল- “প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও দাপ্তরিক প্রয়োজনে” এই বদলি কার্যকর করা হচ্ছে। কিন্তু নাটকীয়ভাবে মাত্র একদিন পর, ৯ মার্চ, নতুন একটি অফিস আদেশে পুরো সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। এবার স্বাক্ষর করেন উপপরিচালক (প্রশাসন) হেমায়েত উদ্দিন।
মাত্র ৪৬ ঘণ্টার ব্যবধানে এমন দুই বিপরীতমুখী সিদ্ধান্তে বিআরটিএর ভেতরে শুরু হয়েছে জোর গুঞ্জন। যদিও এই দুই কর্মকর্তাই আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে দাপটের সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সরকার পরিবর্তনের পরও তাদের ক্ষমতার কাছে অসহায় অনান্য কর্মকর্তারা।
প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, দুই কর্মকর্তাই তাদের বর্তমান কর্মস্থলে শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। সেই কারণেই তারা কোনোভাবেই বর্তমান দায়িত্ব ছাড়তে চান না। আর সেই প্রভাবই শেষ পর্যন্ত বদলির আদেশ ঠেকিয়ে দিয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য জানতে বিআরটিএর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান, পরিচালক (প্রশাসন) নাজনীন হোসেন, উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. সামিউল মাসুদ, পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মো. মাসুদ আলম-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন সেবাখাতে দুর্নীতি ও ঘুস লেনদেন নিয়ে গত ২৫ জুন এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টান্যাশনাল বাংলাদেশ। সেখানে দাবি করা হয়, আগের জরিপের মতো এবারও বিআরটিএ থেকে সেবা নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ দুর্নীতি ও ঘুসের লেনদেনের শিকার হয়েছেন।





































