দুদকের জালে রূপালী ব্যাংকের ৮০১ কর্মকর্তা
- সর্বশেষ আপডেট ০৪:০৪:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬
- / 386
রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক পিএলসি-তে চাকরি, পদোন্নতি ও ঋণ সুবিধা নিয়ে বিস্ফোরক দুর্নীতির অভিযোগে বড় অভিযান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ উঠেছে, বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পরীক্ষা ছাড়াই চাকরি, জাল সনদ ব্যবহার এবং মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নিয়োগ ও পদোন্নতির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
এই অভিযোগের অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে দুই সদস্যের একটি বিশেষ টিম গঠন করেছে দুদক। দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন সহকারী পরিচালক (ব্যাংক) মোহাম্মদ আজগর হোসেন। সদস্য হিসেবে আছেন উপসহকারী পরিচালক মো. ইয়াছিন মোল্লা।
অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে ব্যাংকের ২০১৪ সালে সিনিয়র অফিসার পদে নিয়োগপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে প্রিন্সিপাল অফিসার পদে উন্নীত ১০ জন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। দুদকের প্রধান কার্যালয়ে গত ৫ ও ৬ জুলাই দুই দফায় তাঁদের হাজির হয়ে বক্তব্য প্রদানের নির্দেশ দেয় অনুসন্ধান টিম। রূপালী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও-কে পাঠানো এক চিঠিতে এই কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত নিশ্চিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল।
দুদকের নথিপত্র এবং নোটিশের বিবরণ অনুযায়ী, গত ৫ জুলাই (রবিবার) প্রথম দফায় সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে ৫ জন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁরা হলেন- প্রিন্সিপাল অফিসার তাপসী রায়, তানভীর আহম্মেদ চৌধুরী, মনির হোসেন, অমৃত কুমার বারুরী এবং মো. আখেরুল ওয়ালিদ। এর পরের দিন, অর্থাৎ ৬ জুলাই (সোমবার) একই সময়ে বাকি ৫ কর্মকর্তাকে উপস্থিত হতে বলা হয়। এই তালিকায় ছিলেন- প্রিন্সিপাল অফিসার সজিব সরদার, মাহমুদুল হাসান টুটুল, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, মো. আলমগীর হোসেন ও সাম্মী আক্তার। জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নেওয়ার সময় তাঁদের সকল শিক্ষাগত যোগ্যতার মূল সনদপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র, নিয়োগ পরীক্ষার মূল আবেদনের কপি, প্রবেশপত্র, ভাইভা কার্ড এবং কোটা সুবিধা গ্রহণ করে থাকলে তার সপক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ বা সনদপত্র সাথে নিয়ে আসার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
অনুসন্ধানের গভীর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তলবকৃত এই কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশই রূপালী ব্যাংক লিমিটেড ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী পদে আসীন ছিলেন। এদের মধ্যে আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও সজিব সরদার সাংগঠনিক সম্পাদক, মাহমুদুল হাসান টুটুল মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা সম্পাদক, মো. আলমগীর হোসেন ক্রীড়া সম্পাদক, অমৃত কুমার বারুরী সাংস্কৃতিক সম্পাদক, তানভীর আহমেদ চৌধুরী আন্তর্জাতিক সম্পাদক এবং আখেরুল ওয়ালিদ মোবাইল ব্যাংকিং বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের ধারণা, তৎকালীন সময়ে চরম দলীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কোনো প্রকার নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এই নিয়োগ ও পদোন্নতিগুলো দেওয়া হয়েছিল, যার পেছনে ছিল বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন।
এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায়, ২০১৪ সালে রূপালী ব্যাংকে মোট ৭৫১ জন অফিসার এবং ৪০১ জন সিনিয়র অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে কমার্শিয়াল ইনভেস্টিগেশন টিমের একটি বিশেষ অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে এই কর্মকর্তাদের মধ্যে ৬২ জনের বিরুদ্ধে ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার এবং পরীক্ষায় অংশ না নিয়েই সরাসরি চাকরিতে যোগদানের মতো মারাত্মক সব জালিয়াতির তথ্য উঠে আসে। এই সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই দুদক প্রাথমিকভাবে ১০ জনকে তলব করে।
দুদকের অনুসন্ধানের জাল এখানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো দুদকের আরেকটি পৃথক চিঠি থেকে জানা গেছে, সংস্থাটি ২০১৪ সালে নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র অফিসার ও অফিসারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের আরও ৮০১ জন কর্মকর্তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ এবং নিয়োগ-সংক্রান্ত সমস্ত নথি তলব করেছে। চিঠিতে দুদক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এমসিকিউ, লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষার মূল মূল্যায়ন খাতা বা উত্তরপত্র চেয়েছে। একই সাথে ভুয়া বা জাল সনদের মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার বিষয়ে রূপালী ব্যাংকের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ তদন্ত কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো বিশেষ প্রতিবেদনে যদি কোনো তথ্য বা অনিয়ম উঠে এসে থাকে, তবে সেই সব প্রতিবেদনের কপিও জরুরি ভিত্তিতে সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।
তদন্তের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করতে দুদক সে সময়ে দায়িত্বে থাকা নীতি-নির্ধারকদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনছে। চিঠিতে ২০১৪ সালের ওই বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার সময় দায়িত্ব পালনকারী রূপালী ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চেয়ারম্যান এবং পরিচালনা পর্ষদের সকল পরিচালকদের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর এবং স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানার বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। একই সাথে নিয়োগের প্রতিটি ধাপে পরিচালনা পর্ষদের দেওয়া অনুমোদনের কপি এবং নিয়োগপ্রাপ্তদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, অভিযুক্তদের একজন মাহমুদুল হাসান টুটুল সব অভিযোগ অস্বীকার করে গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন, তিনি নিয়ম মেনেই পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেয়েছেন এবং তার সব নথিপত্র বৈধ। তিনি ৩৩ ও ৩৪তম বিসিএস-এর ভাইভা দিয়ে নন-ক্যাডার তালিকায় ছিলেন, তাই তাঁর ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হওয়ার সুযোগ নেই- বলে দাবি করেন এই কর্মকর্তা।



































