রূপালি পর্দার জাদুকরী গল্প পথের পাঁচালী থেকে শোলে
- সর্বশেষ আপডেট ০৮:৫০:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬
- / 131
কলকাতায় ই. এম. বাইপাসের পঞ্চসায়রে প্রধান সড়কের বাম পাশে উঁচু সাইনবোর্ডের দিকে তাকালেই বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দিতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (SRFTI)। সবুজে ঘেরা ৪০ একর জমির উপর তৈরি এই প্রতিষ্ঠান। প্রধান ফটক পেরিয়ে পিচঢালা রাস্তা। এই রাস্তা ধরে বিশাল পুকুরের পাড় ঘেঁষে এগুলেই ডান দিকে প্রমোদ পতি সিনেমা শিল্প ও প্রযুক্তি জাদুঘর।

ভেতরে প্রবেশ করলেই যেন অন্য এক জগতে পৌঁছে যাওয়ার অনুভূতি । জাদুঘরের দরজার দুপাশে পুরনো ফিল্মের রিলে নায়ক-নায়িকাদের ছবি। আর দেয়াল জুড়ে কালজয়ী চলচ্চিত্রের পোস্টার প্রদর্শিত হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে হৃষিকেশ মুখার্জীর ‘গুড্ডি’, কালজয়ী নির্মাতা অদুর গোপালকৃষ্ণানের মালয়ালম ভাষার ‘এলিপাথায়াম’, মীরা নায়ারের ‘সালাম বম্বে’, রমেশ সিপ্পীর ‘শোলে’। এতে বীরু ও জয় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অমিতাভ বচ্চন ও ধর্মেন্দ্র । শ্যাম বেনেগালের ‘অংকুর’, বিশাল ভরদ্বাজের ‘মকবুল’ ইত্যাদি খ্যাতনামা পরিচালক-প্রযোজকদের চলচ্চিত্রের পোস্টার।
এনালগ ক্যামেরা আর সেলুলয়েড ফিতায় জাদুকরী গল্প
জাদুঘরটি ঘুরে দেখার সময় যে জিনিসে চোখ আটকে যাবে তা হলো সাজিয়ে রাখা বিশাল আকারের দুর্লভ ক্যামেরা। এই ক্যামেরাগুলো দিয়েই নির্মিত হয়েছিল শতবছরের জনপ্রিয় সব চলচ্চিত্র ।
যদিও আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ডিজিটাল ক্যামেরার একটি মাত্র ক্লিকেই এখন বন্দি হয়ে যায় হাজারো দৃশ্য। মেমোরি কার্ডের ছোট্ট একটা চিপে জমা থাকে আস্ত সিনেমা। কিন্তু ৫০ দশক বা তারো আগে সিনেমা তৈরির এই ক্যামেরাগুলো দেখলেই ধারণা পাল্টে দেয়। বিশাল আকৃতির অ্যানালগ ক্যামেরা, চড়া আলোর লাইট আর মাইলের পর মাইল সেলুলয়েড ফিতা। সেই ফিতার বুকেই জীবন্ত হয়ে উঠত রূপালি পর্দার সব জাদুকরী গল্প।
অ্যারিফ্লেক্স কোম্পানির সিক্সটিন মিলিমিটার এসটি ক্যামেরা, অ্যারিফ্লেক্স এসআর থ্রি সিক্সটিন মিলিমিটার,অ্যারিফ্লেক্স এসআর টু সিক্সটিন মিলিমিটার, অ্যারিফ্লেক্স টু এ, বি, সি, অ্যারিফ্লেক্স থার্টিফাইভ মিলিমিটার, অ্যারিফ্লেক্স টু থার্টিফাইভ মিলিমিটার ফরমেটের ক্যামেরা ফিল্মে শ্যুট করা হতো। দম দেওয়া ঘড়ির মতোন ক্যামেরা বোলেক্স এইচ সিক্সটিন ক্যামেরা, ডিজিটাল ক্যামেরা ও লাইট মিটার এনালগও রয়েছে।
এছাড়াও শত বছরের পুরনো ক্যামেরা মিচেল এসথ্রিফাইভসি। এই মডেলের এস থার্ট্রি ফাইভ ক্যামেরায় ‘পথের পাঁচালী’ শ্যুট করা হয়েছে।
পাশাপাশি বিভিন্ন ম্যাগাজিন, লেন্স, মাউন্ট, অ্যাটাচমেন্ট এবং আলোক পরিমাপক যন্ত্র যেমন মিনোল্টা ইনসিডেন্ট মিটার, সিকোনিক কালার মিটার, স্প্রেকট্রা ইনসিডেন্ট মিটার, প্রদর্শিত হয়েছে।
ছবি : ক্যামেরা
আলোয় ভুবন ভরা
চলচ্চিত্র ধারণের সময় ক্যামেরা ব্যবহারে দিনের বেলা আলোর তারতম্য ঘটাতে এবং কৃত্রিম আলো তৈরিতে ডে-লাইট যন্ত্র ব্যবহার করা হতো। সেকালে ব্যবহার করা ডে লাইটগুলোর কয়েকটি এই জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে। টাংগস্টেন হ্যালোজিন লাইট , স্পট টু থাউজেন্ডওয়াট, ক্যানাকুল, স্পট সিক্স হানড্রেড ফিফটিওয়াট, এইচএমআই ব্যালাস্ট (ফেসনেল) টুয়েলভ হানড্রেডওয়াট।
কাচের টেবিল শোকেজে প্রদর্শিত হয়েছে স্প্রিহেরিক্যাল রিফ্লেক্টর , বারনডোর, গ্রাফার গ্রিপ, প্লাগ টপ ও পিন।
আরেক কাচের টেবিল শোকেজে প্রদর্শিত হয়েছে বিভিন্ন আকারের এবং পাওয়ারের কালার স্পট ল্যাম্প।
এছাড়াও প্রদর্শিত হয়েছে মেটাল সফট লাইট বক্স । সিনেমা, বিজ্ঞাপন, ডকুমেন্ট তৈরিতে আলোকচিত্র। ফিল্মে শ্যুট ম্যাগাজিন। ক্যামিকেলের ব্যবহার ইত্যাদি।
ঘূর্ণায়মান ফিল্ম রিল, প্রজেক্টরের মৃদু গুঞ্জন এবং ফিল্ম স্টকের স্বতন্ত্র গন্ধ দর্শককে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সিনেমার সোনালি অতীতে। ফ্রেমে ফ্রেমে স্বপ্ন ধারণ করা সেই অ্যানালগ প্রযুক্তির প্রতি আজও এক বিশেষ রোমান্টিক আবেদন অনুভূত হয়।
ছবি : লাইট
প্রমোদ পতি সিনেমা শিল্প ও প্রযুক্তি জাদুঘরের ম্যানেজার সুশোভন চ্যাটার্জ্জী বলেন, চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যবহৃত টাংগস্টেন হ্যালোজিন লাইট, ইলেকট্রোনিক ব্যালাস্ট, সান গান প্রভৃতি আলোক সরঞ্জামের পাশাপাশি প্রদর্শিত হয়েছে প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক সুব্রত মিত্র’র উদ্ভাবিত বিখ্যাত সফট বক্স লাইট। সত্যজিৎ রায়ের দীর্ঘদিনের সহকর্মী সুব্রত মিত্র সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (SRFTI)-এর এমেরিটাস অধ্যাপকও ছিলেন। এখানে যে আলোকসজ্জা প্রদর্শিত হয়েছে এর বিশেষত্ব রয়েছে। এই আলোকসজ্জাগুলো সুব্রত মিত্রের নিজের হাতে তৈরি করা।
তিনি আরো বলেন, এখানে লাইটেরও ইভ্যুলেশন রয়েছে, হ্যালোজিন লাইট, কিছু লাইটের আলো ছড়িয়ে পড়ে, কিছু লাইটের আলো স্পটে পড়ে। পুরনো দিনের ‘নায়ক’ বা ওই সময়ের সিনেমাগুলোতে সুব্রত মিত্র এই ধরনের লাইট ব্যবহার করতেন।
মেটাল সফট লাইট আগের সময়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যবহার করা হতো। বুস্টার ফাইভ সেভেনটি ওয়াট প্রথমবার জ্বালানোর জন্য ডাবল পাওয়ার ব্যবহার করা হতো। এছাড়া ছোট ছোট লাইটও রয়েছে। থিয়েটারে ব্যবহৃরিত বিভিন্ন কালারের লাইট ব্যবহার করা হতো। বিভিন্ন আকার ও পাওয়ারের ল্যাম্প আলোকচিত্র গ্রহণের ক্ষেত্রে সিনেমা, ডকুমেন্টারি, বিজ্ঞাপন, শট ফিল্ম ব্যবহার করা হয়।
সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ থেকে অমিতাভ বচ্চনের ‘শোলে’
এখানেই দেখা মিলবে সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী, অমিতাভ বচ্চনের ‘শোলে’, ‘দেবী’ ছবির পোস্টার।
আর সত্যজিৎ রায়ের সব চলচ্চিত্রের ছবি এডিট করেছেন দুলাল দত্ত।
ছবি : সত্যজিৎ রায়ের সাথে সুব্রত মিত্র
অন্যদিকে ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রের ছবি এডিট করেছেন রমেশ যোশী।
ছবি : ফ্রেমে বন্দি ঋত্বিক ঘটকের সাথে রমেশ যোশীর আলাপচারিতার দৃশ্য
শব্দ ধারণ প্রযুক্তি
শব্দ ধারণ প্রযুক্তির যন্ত্রপাতিও এখানে প্রদর্শিত হয়েছে। প্রথমদিকে শব্দ ও চিত্র আলাদাভাবে ধারণ করা হতো । পরে তা সমন্বিত করা হতো। প্রদর্শনীতে রয়েছে বুম মাইক্রোফোন, ফিল্ড রেকোর্ডার মাল্টিট্র্যাক অডিও সিস্টেম এবং চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সাউন্ড রেকর্ডিং যন্ত্র নাগরা। এছাড়াও প্রদর্শিত হয়েছে বহু-চ্যানেলের সাউন্ড মিক্সার ।
মুভিওলা এডিটিং মেশিন
জাদুঘরের এক প্রান্তে রয়েছে একটি বিশালাকৃতির মুভিওলা এডিটিং মেশিন যা একসময় সেলুলয়েড ফিল্মকে বড় পর্দায় প্রদর্শনের জন্য ব্যবহৃত হতো। এটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ঐতিহ্যবাহী প্রযুক্তির এক অনন্য নিদর্শন।
ছবি : মুভিওলা এডিটিং মেশিন
জাদুঘরের নামকরণ
এই জাদুঘরটির নামকরণ করা হয়েছে ভারতীয় অ্যানিমেশন এবং পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রের মহানায়ক প্রমোদ পতির নামে। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ভারতের ফিল্মস ডিভিশনের প্রধান থাকাকালীন তিনি প্রামাণ্যচিত্র এবং পরীক্ষামূলক অ্যানিমেশনের মাধ্যমে ভারতীয় ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ে এক বৈপ্লবিক ও যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিলেন। চলচ্চিত্র নির্মাণকে একটি বিকাশমান শিল্প হিসেবে দেখা এবং অ্যানালগ যুগের যন্ত্রপাতি সংরক্ষণের দূরদর্শী ভাবনাটি প্রথম তারই ছিলো। তার সেই স্বপ্নকে সম্মান জানাতেই এই উদ্যোগ।
দর্শকদের জন্য প্রমোদ পতি সিনেমা শিল্প ও প্রযুক্তি জাদুঘর ২০২৪ সালে উদ্বোধন করা হয় । এই উদ্যোগের নেতৃত্বে ছিলেন পরিচালক হিমাংশু শেখর খাটুয়া, শিল্প নির্দেশক বিপিন বিজয়, প্রধান কিউরেটর সমীরণ দত্ত (আইএসসি), প্রধান প্রদর্শনী পরিকল্পনাকারী রণজিৎ ঘরাই ও সায়ন্তন মণ্ডল। গবেষণা ও বিষয়বস্তু নির্মাণে যুক্ত ছিলেন সুকান্ত মজুমদার, সৈকত এস. রায়, সুমন মজুমদার, জয়দীপ বসু, হিতেশ লিয়া, অয়ন ভট্টাচার্য, অগ্নিত্র চক্রবর্তী, পৌষালী সেনগুপ্ত, বিরাজা প্রসন্ন কর, উজ্জ্বল চন্দ্র, কেশব মান্না এবং সাবেরী দাস। প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করেন ড. সুশ্রুত শর্মা (রেজিস্ট্রার), মহাশ্বেতা বন্দ্যোপাধ্যায় (সিইও) এবং প্রণেশ মণ্ডল (পিও)।
জাদুঘরে প্রবেশাধিকারে নিয়ম ও সময়সীমা
এই জাদুঘরটি সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের (SRFTI) ভেতরে অবস্থিত। সাধারণ দর্শনার্থী, গবেষক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও এটি পরিদর্শন করতে পারবেন। সোমবার থেকে শুক্রবার, সকাল সাড়ে ৯ থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শনিবার ও রবিবার সাপ্তাহিক বন্ধ।





































