ব্যর্থতার অভিযোগের মধ্যেই প্রকল্প পরিচালকের পদোন্নতি
এক প্রকল্পে তিন সরকার, অগ্রগতি ১২ শতাংশ
- সর্বশেষ আপডেট ০৮:২৩:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
- / 42
যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন গতি আনতে নেওয়া হয়েছিল প্রায় ৪ হাজার ৫০ কোটি টাকার একটি মেগা সেতু প্রকল্প। লক্ষ্য ছিল দেশের ৩৫টি উপজেলার পল্লী সড়কে ৮২টি গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণের। কিন্তু চার বছর পর সেই স্বপ্নের প্রকল্পই পরিণত হয়েছে সরকারের গলার কাটায়।
প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে, চলেছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে, আর এখন বিএনপি সরকারের সময়েও শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ এক প্রকল্পে তিন সরকার, তবুও শেষ হচ্ছে না কাজ।
এর মধ্যেই প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগ থাকা প্রকল্প পরিচালক শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দারকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে এলজিইডি ও প্রকৌশল মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) অনুযায়ী ২০২৭ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা। অথচ ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত যেখানে ৭৬ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ১২ শতাংশ। নতুন করে আরো এক বছর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে।
বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮২টি সেতুর মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে মাত্র ৪৬টি (প্রকল্প পরিচালকের দাবি, বর্তমানে ৪৭টির কাজ চলছে)। ১৬টি সেতুর নকশা দীর্ঘদিনেও সম্পন্ন হয়নি, ১৬টির কাজ এক শতাংশও এগোয়নি, ১২টির নির্মাণকাজ কার্যত বন্ধ এবং ১৪টির টেন্ডারই শুরু হয়নি।
এ পর্যন্ত নির্মাণ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মিটার সেতু, যার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৫৪ কোটি টাকা। বাকি প্রায় ১৪ হাজার ১৯৭ মিটার সেতুর কাজ এখনো চলমান। অনেক ক্ষেত্রে সংযোগ সড়ক নির্মাণ হয়নি, ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প শুরুর আগে প্রয়োজনীয় মাঠসমীক্ষা, হাইড্রোলজিক্যাল ও মরফোলজিক্যাল বিশ্লেষণের যথাযথ প্রতিফলন ডিপিপিতে ছিল না। ফলে শুরু থেকেই একাধিক সেতুর বাস্তবায়ন জটিলতায় পড়ে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিলো কোন ধরনের সমীক্ষা ছাড়াই।
আইএমইডি আরও বলছে, প্রকল্প পরিচালনায় নিয়মিত তদারকি ছিল না। প্রতি তিন মাসে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) এবং প্রতি ছয় মাসে স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভা হওয়ার কথা থাকলেও চার বছরে উভয় কমিটির মাত্র চারটি করে সভা হয়েছে।
প্রকল্পে নিয়োজিত ৪৭ জন পরামর্শকের মধ্যে ১৭ জন মাঠে না গিয়ে ঢাকাতেই অবস্থান করেছেন। আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, তারা এ পর্যন্ত প্রায় ১৭ কোটি টাকা পারিশ্রমিক নিয়েছেন, অথচ অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন এলজিইডির সদর দপ্তরে। ফলে মাঠপর্যায়ে নির্মাণের মান নিশ্চিত হয়নি, একাধিক সেতুতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে। এমনকি পাঁচটি সেতুতে ভার্টিক্যাল ত্রুটিও শনাক্ত হয়েছে।
আইএমইডি আরও উল্লেখ করেছে, প্রকল্পের মূল ডিপিপিতে ডিজাইন ও ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটেন্সি খাতে ১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও অধিকাংশ নকশা এলজিইডির নিজস্ব ডিজাইন ইউনিটে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং পরে বুয়েট থেকে ভেটিং নেওয়া হয়েছে। তবুও একাধিক নকশায় ত্রুটি রয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইএমইডির তদন্তে আরও উঠে এসেছে ভয়াবহ নির্মাণ অনিয়ম। কুমিল্লা সদর উপজেলার গোমতী নদীর ওপর নির্মাণাধীন ৩১০ মিটার সেতুতে বালির পরিবর্তে মাটি এবং খোয়ার পরিবর্তে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। গার্ডারের রড দীর্ঘদিন খোলা অবস্থায় পড়ে থেকে মরিচা ধরেছে, যথাযথ কিউরিংও করা হয়নি।
মাগুরা সদর উপজেলার একটি সেতু নির্মাণেও চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে পাগলা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুতে সম্পূর্ণ নদী বাঁধ দিয়ে সাটারিং করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।
আইএমইডি বলছে, এসব অনিয়মের পরও কোনো ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সদ্য সাবেক প্রকল্প পরিচালক শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দার বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে বলেন, “কাজ না করার কোনো সুযোগ নেই। বর্তমানে মাত্র তিনটি সেতুর ডিজাইন বাকি। ৫৯টি সেতুর টেন্ডার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৪৭টি সেতুর কাজ চলছে। কোনো ধরনের অনিয়ম আমরা করিনি। শুরুতে ৮২টি সেতুর কোনো ডিজাইনই ছিল না, শুধু ফিজিবিলিটি স্টাডি ছিল।”
তিনি আরও বলেন, “এক বছরের জন্য প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। তবে একটি সেতু নির্মাণ শেষ করতেই অন্তত তিন বছর লাগে। কাজ শুরু করতেই ৮–৯ মাস সময় চলে যায়।”
প্রকল্প পরিচালকের এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হলেও প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। একই সঙ্গে আইএমইডির পর্যবেক্ষণও বলছে, দুর্বল পরিকল্পনা, তদারকির ঘাটতি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণেই প্রকল্পটি লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে পড়েছে।
বর্তমান প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ সায়েদুজ্জামান সাদেক বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে জানান, তিনি প্রকল্পের দায়িত্ব নিয়েছেন মাত্র তিন দিন আগে। তবে আইএমইডির প্রতিবেদন তিনি দেখেছেন। কোন অসঙ্গতি পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।





































