শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথে যেসব বাঁধা!
- সর্বশেষ আপডেট ০২:১৩:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
- / 44
বাংলাদেশে কি সত্যিই ফিরছেন শেখ হাসিনা? যদি ফেরেন, তাহলে কি বিমানবন্দরেই গ্রেপ্তার হবেন? মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন পলাতক আসামি হিসেবে দেশে ফিরে কি আপিল করার সুযোগ পাবেন? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- তার কাছে যদি বৈধ পাসপোর্টই না থাকে, তাহলে বাংলাদেশে ফিরবেন কীভাবে?
সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের পলাতক নেতারা ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। এর আগে ভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যমেও তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের খবর প্রকাশিত হয়। এরপর থেকেই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর এই রায় ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও কার্যকর রয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, তিনি দেশে ফিরলে কী হবে?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ফিরতে প্রথম বাধা হতে পারে তার ভ্রমণ নথি। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় তার কাছে কূটনৈতিক বা লাল পাসপোর্ট ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সরকার সেটি বাতিল করেছে। ফলে বর্তমানে তার কাছে বৈধ বাংলাদেশি পাসপোর্ট না-ও থাকতে পারে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরতে হলে তাকে ট্রাভেল পাস বা বিশেষ ভ্রমণ অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে। আর সেই ট্রাভেল পাস দেওয়ার ক্ষমতা সরকারের হাতে। সরকার অনুমতি দিলে তিনি দেশে ফিরতে পারবেন, না দিলে সেই পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
তবে যদি কোনোভাবে তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেন, তাহলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর হওয়ার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে।
এখানেই আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার পর আপিলের নির্ধারিত ৩০ দিনের সময় তো অনেক আগেই শেষ হয়েছে। তাহলে কি তার আর আপিলের সুযোগ নেই?
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, অতীতেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর আদালত আপিল গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ বিলম্বের যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে আবেদন করলে আদালত সেটি বিবেচনা করতে পারেন। যেমনটি ঘটেছে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আবুল কালাম আজাদের ক্ষেত্রে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা যদি দেশে ফিরে আপিল করেন এবং আদালত সেই আপিল গ্রহণ করেন, তাহলে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কার্যকারিতা সাময়িকভাবে স্থগিত বা ‘স্টে’ হতে পারে। এরপর শুরু হবে মূল আপিলের শুনানি।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। পরে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি ল ফার্মের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে পাঠানো এক চিঠিতে বিচার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলেও দাবি করা হয়।
তবে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের দাবি, ওই ল ফার্মের অস্তিত্বের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে চিঠিটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এখন শুধু রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি একই সঙ্গে একটি জটিল আইনি ও কূটনৈতিক প্রশ্ন। তিনি আদৌ ট্রাভেল পাস পাবেন কি না, দেশে ফিরতে পারবেন কি না, ফিরলে গ্রেপ্তার হবেন কি না, আর আদালত তার বিলম্বিত আপিল গ্রহণ করবেন কি না- এসব প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করে দিতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতির পরবর্তী অধ্যায়।




































