বন্যায় বিপর্যস্ত ১১ লাখ মানুষ, সহায়তা বাড়াচ্ছে অক্সফাম
- সর্বশেষ আপডেট ১০:৩৪:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
- / 22
৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ভারী মৌসুমি বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পানির ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ও ভূমিধসে বাংলাদেশের ১১ লাখেরও বেশি মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে চট্টগ্রামে; অন্যদিকে কক্সবাজার—যেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোর অবস্থান। সেখানেও বন্যা, ভূমিধসের ঝুঁকি এবং জরুরি সেবা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ) এক বিবৃতিতে অক্সফাম ইন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অনিল পান্ত বলেন, “এটি এমন একটি জরুরি পরিস্থিতি যা দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে একইসাথে ঘটছে। বন্যা ও এর ধারাবাহিক প্রভাব মানুষের জীবন ও জীবিকাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। চট্টগ্রাম ও অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত জেলায় পরিবারগুলো তাদের ঘরবাড়ি ও আয়ের উৎস হারিয়েছে। পাশাপাশি নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধাও তাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। কক্সবাজারে পরিস্থিতি বিশেষ করে উদ্বেগজনক, কারণ সেখানে রোহিঙ্গা পরিবারগুলো ঝুঁকিপূর্ণ ঢালু জমিতে ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে বসবাস করে। সেখানে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার মতো জায়গার অভাব রয়েছে এবং বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিও অত্যন্ত বেশি।”
বন্যায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এছাড়া ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, বাঁধ, পানির উৎস, শৌচাগার, ফসলি জমি, মৎস্য খামার ও ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক পরিবার তাদের খাদ্যসামগ্রী, বিছানাপত্র, রান্নার সরঞ্জাম ও গৃহস্থালি সম্পদ হারিয়েছে। প্লাবিত এলাকায় হাজার হাজার মানুষ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে; আবার অনেক পরিবার শুকনো জায়গা বা রান্নার জ্বালানির অভাবে খাবার তৈরি করতে পারছে না।
এই দুর্যোগটি ১০টি জেলা—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জ—জুড়ে ১১ লাখেরও বেশি মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
১৪ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এতে ৫৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৩৯ জন আহত হয়েছেন। নিরাপদ খাবার পানি, জরুরি খাদ্যসামগ্রী, আশ্রয়কেন্দ্রের উপকরণ, স্বাস্থ্যবিধি ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সামগ্রী (ডিগনিটি কিট), স্যানিটেশন সহায়তা এবং নমনীয় নগদ অর্থ সহায়তা—এসবই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন। অন্তত ৩ হাজার ৫০০টি পানির উৎস এবং ১২ হাজার ৪০০টি ল্যাট্রিন বা শৌচাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি তীব্র হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ঘরবাড়ি ও ওয়াশ (WASH) বা পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত অবকাঠামো মেরামত এবং জীবিকা পুনরুদ্ধারে সহায়তারও প্রয়োজন হবে।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বন্যাদুর্গত বাসিন্দা আক্কাস আলী বলেন, “পানির স্তর এত দ্রুত বেড়েছিল যে আমরা প্রায় কিছুই বাঁচাতে পারিনি। আমাদের খাবার, বিছানাপত্র ও রান্নার সরঞ্জাম সব হারিয়ে গেছে এবং বিশুদ্ধ পানি পাওয়াও খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। আমাদের পরিবার যাতে আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে, সেজন্য খাবার, নিরাপদ পানি এবং ঘর মেরামতের সহায়তার প্রয়োজন।”
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ১৬৪টি ভূমিধস ও ৪২টি বন্যার ঘটনা ঘটেছে। আশ্রয়কেন্দ্র ও বিভিন্ন স্থাপনা ধসে পড়ার ঘটনায় ১৫ জন রোহিঙ্গা প্রাণ হারিয়েছেন। ৯ হাজার ৭০৭ জন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে সাময়িকভাবে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন; এছাড়া আবহাওয়া-জনিত ৪৮২টি ঘটনায় ৯ হাজার ৪৬৩টি পরিবারের প্রায় ৪৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যার পানি আশ্রয়কেন্দ্র ও ওয়াশ স্থাপনাগুলোতে ঢুকে পড়েছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে আকাশ মেঘলা থাকায় অনেক পরিবার আলো বা বিদ্যুৎ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
নারী ও কিশোরী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মা এবং নারী-প্রধান পরিবারগুলো সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির মুখে পড়েছে। স্থানান্তরের জন্য সীমিত জায়গা, পাহাড়ের ঢালের অস্থিতিশীলতা, ক্ষতিগ্রস্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত জনঘনত্ব পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তুলেছে । সেখানকার বাসিন্দাদের অসহায়ত্ব চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
অক্সফাম ইন বাংলাদেশ তাদের জরুরি সাড়াদান কার্যক্রম শুরু করেছে ।চট্টগ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করার জন্য ১ কোটি ২০ লাখ ৬৫ হাজার টাকা (প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ৭০ হাজার টাকা) বরাদ্দ করেছে। স্থানীয় অংশীদারদের মাধ্যমে অক্সফাম দ্রুত প্রয়োজন ও লিঙ্গ-বিষয়ক মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং সরকারি কর্তৃপক্ষ, ‘নিডস অ্যাসেসমেন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’ ও জাতিসংঘের বিভিন্ন ক্লাস্টারের সাথে সমন্বয় সাধন করছে।
চট্টগ্রামে অক্সফামের পরিকল্পিত সহায়তার মধ্যে রয়েছে জরুরি খাদ্য, নিরাপদ খাবার পানি এবং স্বাস্থ্যবিধি ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী (যেমন—সাবান, ডিটারজেন্ট, স্যানিটারি প্যাড ও ওরাল স্যালাইন), শাড়ি ও লুঙ্গি। এছাড়া, প্রতিটি পরিবারকে ৮ হাজার টাকা করে বহুমুখী নগদ সহায়তা প্রদানের পরিকল্পনাও রয়েছে। যাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো খাদ্য, বাসস্থান মেরামত, স্বাস্থ্যসেবা, যাতায়াত এবং জীবিকা পুনরুদ্ধারের মতো জরুরি প্রয়োজনগুলো মেটাতে পারে।
কক্সবাজারে অক্সফাম ও এর সহযোগী সংস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো নিরূপণ ও মেরামতের কাজে সহায়তা করছে। পাশাপাশি, সম্মুখসারির কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ১০০ জন রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবককে অক্সফাম ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) প্রদান করেছে।
অনিল পান্ত বলেন, “আমরা ইতিমধ্যেই আমাদের সহযোগী সংস্থাগুলোর সাথে মাঠপর্যায়ে কাজ করছি। ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কথা শুনছি এবং তাদের সবচেয়ে জরুরি অগ্রাধিকারগুলোর ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিচ্ছি। আমাদের প্রাথমিক বরাদ্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অত্যন্ত সামান্য। আমরা দাতা সংস্থা, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী এবং সচেতন নাগরিকদের প্রতি নমনীয় অর্থায়নের আহ্বান জানাচ্ছি। যাতে আরও বেশি পরিবার জীবন রক্ষাকারী সহায়তা পেতে পারে এবং মর্যাদার সাথে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।”
অক্সফাম স্থানীয় নেতৃত্ব ও জেন্ডার সংবেদনশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ৩ মিলিয়ন ইউরো তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে পরিচালিত এই কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হলো—তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তা, জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু-সহনশীল পুনর্গঠন।


































