অধ্যাপক বদিউর রহমানকে স্মরণে উদীচীর আয়োজন
- সর্বশেষ আপডেট ১০:২৭:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
- / 19
গান, আবৃত্তি ও সশ্রদ্ধ স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সংগ্রামী সভাপতি, বিশিষ্ট গবেষক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সাহিত্যিক, অধ্যাপক বদিউর রহমান-এর প্রথম প্রয়াণবার্ষিকী পালন করেছে উদীচী।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকাল সাড়ে ৪টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচার কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা মিলনায়তনে উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদ আয়োজন করে Ôস্মরণানুষ্ঠান ও স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন’। অনুষ্ঠানের শুরুতেই অধ্যাপক বদিউর রহমান-এর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানায় উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদ, ঢাকা মহানগর সংসদ, বাংলাশে ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর এবং বাংলাদেশ কলেজ বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, বাকবিশিস। এরপর তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিরবতা পালন করা হয়।
এরপর সম্মিলিত পরিবেশনা উপস্থাপন করে উদীচী কেন্দ্রীয় সঙ্গীত ও আবৃত্তি বিভাগের শিল্পীরা। তারা পরিবেশন করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-` তুমি কি কেবলই ছবি’ গানের সাথে কথন। এরপর দুটি বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশন করেন উদীচী কেন্দ্রীয় আবৃত্তি বিভাগের বাচিক শিল্পীরা। এছাড়া, `দুঃখের তিমিরে যদি জ¦লে’ এবং `ভোরের আকাশ আশা নিয়ে থাকে সূর্য উঠবে বলে ‘ গান দুটি সমবেতভাবে পরিবেশন করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সঙ্গীত বিভাগের শিল্পীরা। অধ্যাপক বদিউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে `ভোরের আকাশ আশা নিয়ে থাকে সূর্য উঠবে বলে’ গানটি রচনা করেছেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি প্রবীর সরদার, আর সুর করেছেন উদীচীর শিল্পী অনুপম হালদার। এরপর উদীচী কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র ও চারুকলা বিভাগ প্রযোজিত এবং কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য তুষার চন্দন পরিচালিত তথ্যচিত্র `মানুষ গড়ার কারিগর অধ্যাপক বদিউর রহমান’।
এরপর উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম-এর সভাপতিত্বে শুরু হয় আলোচনা ও স্মৃতিচারণ পর্ব। এ পর্বের শুরুতে অধ্যাপক বদিউর রহমান-এর স্মারকগ্রন্থ ‘বদিউর রহমান: লক্ষ্যে অবিচল এক জীবন সংগ্রাম ‘ এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। মোড়ক উন্মোচন করেন অধ্যাপক বদিউর রহমান-এর জীবনসঙ্গী তাহমিনা রহমান। এরপর অধ্যাপক বদিউর রহমান-এর জীবন, কর্ম, সাংস্কৃতিক সংগ্রাম, সাহিত্য জীবন নিয়ে আলোচনা করেন রামেন্দু মজুমদার, নূর মোহাম্মদ তালুকদার, ডা. আবু সাঈদ, এম এ আজিজ মিয়া, অধ্যাপক এম এম আকাশ, বদিউর রহমান-এর বোন ড. ফেরদৌসী বেগম, অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক মাসুম, অধ্যাপক কাবেরী গায়েন, নাট্যজন অনন্ত হীরা, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সদস্য শংকর সাওজাল, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি সাইফুর রহমান মিরণ, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য সুখেন রায়, কথাসাহিত্যিক ও প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্য-এর চিফ কো-অর্ডিনেটর অস্ট্রিক আর্যু এবং অধ্যাপক বদিউর রহমান-এর বড় সন্তান সুপা সাদিয়া। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে।
আলোচনা পর্বে বক্তারা বলেন, বদিউর রহমান ছিলেন নিভৃতচারী একজন মানুষ। কাজের মানুষ ছিলেন, অনেক কাজ এবং বহুধরনের কাজ করেছেন, কিন্তু নিজেকে জাহির করেননি কখনোই। তার কাছে কাজই ছিল সামনে, কাজের অভ্যন্তরেই থাকতে ভালোবাসতেন। কর্মই ছিল তাঁর জীবন এবং কর্মেই তাঁর পরিচয়। বদিউর রহমান ছিলেন সমাজ-পরিবর্তনে অঙ্গীকারাবদ্ধ। সমাজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা সেবকের ছিল না, ছিল না সংস্কারকেরও, সেটি ছিল বিদ্যমান সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানোর; পরিষ্কার অর্থে সামাজিক বিপ্লবের।
তারা আরো বলেন, অধ্যাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে অধ্যাপক বদিউর রহমান নিজের কার্যপরিধিকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। এই বৃহৎ কর্মযজ্ঞের ক্ষেত্র বিস্তৃত; মানবমনের রূপান্তর সাধনে এর প্রভাবও সীমাহীন। একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্বই আমৃত্যু পালন করে গেছেন তিনি। বদিউর রহমান যথার্থ মানুষ হয়ে ওঠার পাশাপাশি এই দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মনোভূমিকে জৈবিকতা থেকে মুক্ত করে মানবিক বোধে উত্তীর্র্ণ করার এক মহান ব্রত ধারণ করেছিলেন। এই ব্রত থেকেই তিনি সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। মানুষের মনোজগৎ থেকে জৈবিকতার অন্ধকার দূর করে তাদের মধ্যেকার সুপ্ত সুকুমার বৃত্তিগুলোকে জাগ্রত করে মানবিকতার আলো ফোটানোর চেষ্টায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। এখানেই তিনি স্থাপন করেছেন একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। এখানেই তাঁর মানবজীবনের সার্থকতা।
আলোচনা পর্বের সভাপতি, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম বলেন, মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত সংগঠনের কাজে সার্বক্ষণিক সক্রিয় ছিলেন অধ্যাপক বদিউর রহমান। ভালো-মন্দ, সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক সংকটসহ যেকোন বিষয়ে সবসময়ই বলিষ্ঠভাবে প্রকৃত অভিভাবকের ভূমিকা রেখেছেন তিনি। বিশেষ কোন শারীরিক জটিলতা না থাকলেও তাঁর এই হঠাৎ প্রয়াণে উদীচীর শিল্পী-কর্মী সহযোদ্ধারা হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন। তবে, শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও যে আদর্শের বীজ অধ্যাপক বদিউর রহমান বপণ করে গেছেন সেটিকে ধারণ করেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক, মৌলবাদমুক্ত, সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠায় উদীচী আজীবন কাজ করবে।





































