পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু: নিয়তি নয়, প্রতিরোধযোগ্য বাস্তবতা
- সর্বশেষ আপডেট ০৩:৫০:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
- / 20
পানির অপর নাম জীবন। এ কথায় ভিন্নমত নেই। পানি ছাড়া পৃথিবীর কোনো প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। মানুষের জীবন, জীবিকা, কৃষি, অর্থনীতি ও প্রকৃতির ভারসাম্য, সবকিছুর সঙ্গেই পানি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে যদি বলা হয় ‘পানির অপর নাম মৃত্যু’- সেটা কি বিশ্বাস করা যায়?
বরিশালের একটি গ্রামীণ সকাল। শিশু শেফালী উঠোনে একা খেলছে। মা রান্নাঘরে ব্যস্ত। বাবা কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাড়ির সামনেই নিত্যদিনের চেনা পুকুর। কেউ কখনো এটাকে বিপদ ভাবেনি। কারণ এই পুকুর পরিবারের কাছে নতুন কোনো জায়গা নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনের অংশ। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে চেনা দৃশ্যপট পাল্টে যায়। শেফালীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অতঃপর পুকুরপাড়ে মানুষের জটলা। মা-বাবার গগনবিদারী কান্না, বুক ফাটা আর্তনাদ।
এবার বিশ্বাস করতেই হয়, পানির অপর নাম মৃত্যুও হতে পারে!
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু এভাবেই নীরবে ঘটে। কয়েক সেকেন্ডের অসতর্কতা একটি পরিবারকে সারাজীবনের জন্য শোকের মধ্যে ফেলে দেয়। বাবা-মা সারাজীবন ভাবেন, যদি আর একবার সুযোগ পাওয়া যেত তাকে দেখে রাখার! যদি একটু আগে খেয়াল করা যেত! তবে এটি কোনো নিয়তি নয়। পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য। প্রয়োজন শুধু সামগ্রিক উদ্যোগ, সচেতনতা, নিরাপদ পরিবেশ এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
২৫ জুলাই বিশ্ব পানিতে ডোবা প্রতিরোধ দিবস। আন্তর্জাতিকভাবে ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে “Unite to Turn the Tide”, অর্থাৎ সবাই মিলে পানিতে ডুবে মৃত্যুস্রোত বদলে দিই। এই বার্তাটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ আমাদের দেশে পানিতে ডুবে মৃত্যু এখনো প্রতিদিনের এক অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে বছরে তিন লাখের বেশি মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। প্রতি ঘণ্টায় এ সংখ্যা প্রায় ৩০ জন, যার একটি বড় অংশই শিশু। পানিতে ডুবে মৃত্যুর এই মিছিল ঠেকাতে আন্তর্জাতিকভাবে ২০৩৫ সালের মধ্যে এ ধরনের মৃত্যু ৩৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ হেল্থ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে ২০২৩ অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১৮ হাজার ৬৬৫ জন পানিতে ডুবে মারা যায়। তাদের মধ্যে ১৪ হাজার ২৬৯ জনই শিশু, যাদের বয়স ১ থেকে ৪ বছরের মধ্যে। পানিতে ডুবে এসব মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটে বাড়ির পাশে কয়েক গজের মধ্যে। অর্থাৎ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনা ঘটে এমন জায়গায়, যাকে পরিবার নিরাপদ মনে করে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ ও উপকূলীয় অঞ্চলে পুকুর, নদী, খাল ও জলাশয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কিন্তু শিশুদের জন্য এসব জায়গা অনেক সময় বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহলী এবং তাদের ঝুঁকি বোঝার সক্ষমতা সীমিত। তাই এই বয়সী শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুকে ‘নীরব মহামারি’ হিসেবে বর্ণনা করে। কারণ এর ভয়াবহতার তুলনায় এটি অনেক কম মনোযোগ পায় এবং নীরবে শিশুদের জীবন কেড়ে নেয়।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিআইপিআরবির গবেষণায় দেখা গেছে, এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের আঁচলে (শিশুযত্ন কেন্দ্রে) রাখলে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি ৮২ শতাংশ পর্যন্ত কমানো যায়। অন্যদিকে, ছয় থেকে দশ বছর বয়সী শিশুদের জীবন রক্ষাকারী সাঁতার এবং উদ্ধার কৌশল শেখালে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, পরিকল্পিত ও কমিউনিটিভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে এই মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর মহামারি প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি বাস্তবায়ন করেছে Integrated Community Based Center for Child Care, Protection and SwimSafe Facilities Project (ICBC) প্রকল্পের প্রথম ধাপ। প্রকল্পের আওতায় সমাজভিত্তিক শিশুযত্ন কেন্দ্র পরিচালনা এবং শিশুদের সাঁতার ও জীবন রক্ষাকারী দক্ষতা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সরকারি উদ্যোগ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সহায়তা, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী অংশীজন এবং স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে এ প্রকল্প পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এ ধরনের উদ্যোগ শুধু শিশুদের জীবন রক্ষা করে না, পাশাপাশি পরিবারকে মানসিক ও সামাজিক ক্ষতির হাত থেকেও রক্ষা করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে পানিতে ডুবা প্রতিরোধ কার্যক্রম বাস্তবায়নে নতুন নতুন বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। আগে ধারণা করা হতো পানিতে ডুবে মৃত্যু মানে শুধু পুকুর বা নদী কেন্দ্রিক বিপদ। কিন্তু বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগগুলোর ভয়াবহতা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সিআইপিআরবি, যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইন্সটিটিউশন (আরএনএলআই) এবং প্রিন্সেস শার্লিন অব মোনাকো ফাউন্ডেশনের সহায়তায় পরিচালিত ‘নিরাপদে ভাসা’ প্রকল্প থেকে এ তথ্য উঠে এসেছে। বন্যা, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ, শৈত্যপ্রবাহ, বজ্রপাত, ঘূর্ণিঝড়, জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য দুর্যোগ শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে।
এছাড়াও পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ কাজের সঙ্গে শিশুদের নিরাপদ যাতায়াত, স্থিতিশীল পরিবেশ এবং নিয়মিত আঁচলে উপস্থিতির বিষয়গুলো সরাসরি জড়িত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা শিশুর অসুস্থতার কারণে সেবা কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ করতে হয়। প্রয়োজনে শিশুযত্ন কেন্দ্র পরিচালনার সময়ও কমাতে হয়। এতে শিশুদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ সরকার ২০২৫ সালে ‘পানিতে ডুবা প্রতিরোধ জাতীয় কর্মকৌশল ও কর্মপরিকল্পনা’ অনুমোদন করেছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এখন প্রয়োজন সকল পর্যায়ের জন্য সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন নির্দেশনা, দায়িত্ব বণ্টন এবং পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ।
তারও আগে দরকার সকল অংশীজনকে নিয়ে এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
সঠিক ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে সারাদেশে পানিতে ডুবে অনাকাঙ্ক্ষিত হাজারো শিশুর মৃত্যুঝুঁকি কমানো সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিটি শিশুর জীবন মূল্যবান। একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি সমাজ ও দেশের জন্যও অপূরণীয় ক্ষতি।
বিশ্ব পানিতে ডোবা প্রতিরোধ দিবস ২০২৬-এ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি এ মৃত্যুকে কেবল সংখ্যায় হিসাব করতে থাকব, নাকি প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব?
পানি বাংলাদেশের সম্পদ। কিন্তু সেই পানিতেই শিশুর মৃত্যু আমাদের কাম্য হতে পারে না। আর একটিও শিশু হারানোর আগে বাংলাদেশের অঙ্গীকার হোক-
“পানি থাকবে, পানি কেন্দ্রিক জীবন ব্যবস্থাও থাকবে; কিন্তু সুরক্ষাহীনতার কারণে আর কোনো শিশুকে অকালে ঝরে যেতে হবে না।”
লেখক:
উপ-পরিচালক, সিআইপিআরবি
borkatdu@gmail.com





































