ঢাকা ০৮:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রাথমিক শিক্ষার সংকট কাটাতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ

সিনিয়র প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৪:৫৬:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 36

প্রাথমিক শিক্ষার সংকট কাটাতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ

প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের। তাই এক দিন, এক মাস কিংবা ছয় মাসে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সরকার কাজ করছে। আগামী ২, ৩, ৫ বা ১০ বছরে নেওয়া উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়মিত নজরদারির আওতায় রাখতে হবে।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকার গুলশানের লেকশোর হোটেলে ‘নাগরিক প্ল্যাটফর্ম সংলাপ: সরকার কতখানি এগোলো? প্রাথমিক শিক্ষার ওপর আলোকপাত’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ এ সংলাপের আয়োজন করে।

ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার সাফল্য শুধু বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে কতটা শিখছে এবং সেই শেখার মাধ্যমে তাদের মধ্যে কী পরিবর্তন আসছে, সেটিই শিক্ষার সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক শিক্ষায় অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয় হলেও এখন শিক্ষার্থীর শেখার ফলাফলকে কেন্দ্র করে পুরো ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের বিষয়টি একদিকে, আর শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ও শেখার বিষয়টি অন্যদিকে। এ দুটিকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীর শেখার ফলাফল নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য হতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ, পেশাগত ক্যারিয়ার, মূল্যায়ন, প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন; সব বিষয়কে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার কাজ চলছে।

শিক্ষকদের নিয়োগ থেকে শুরু করে ক্যারিয়ার, মূল্যায়ন ও প্রশিক্ষণব্যবস্থায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন ও কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হচ্ছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি, এক শিফট চালু এবং শ্রেণিকক্ষে কার্যকর শিখনসময় নিশ্চিত করার বিষয়েও নতুন করে ভাবা হচ্ছে। কারিকুলাম প্রণয়নে শিশুমনোবিজ্ঞানী ও প্রারম্ভিক শিক্ষার বিশেষজ্ঞদের আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

দেশের সব ধরনের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ধাপে ধাপে কার্যকর মনিটরিংয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। এ জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা তৈরি করে পর্যায়ক্রমে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।

বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম ও কিন্ডারগার্টেনসহ প্রাথমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের যেকোনো ধরনের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

সংলাপে সিপিডির পর্যালোচনায় জানানো হয়, প্রাথমিক শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট ২৪টি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কোনোটিই এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। কিছু উদ্যোগের প্রস্তাব করা হয়েছে, কিছু কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং কিছু নীতি ও আইনগত পর্যায়ে রয়েছে।

সিপিডি জানায়, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদিত হয়নি। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। দ্রুত অনুমোদনের পাশাপাশি বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

পিইডিপি-৫কে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে ববি হাজ্জাজ বলেন, দীর্ঘদিনের প্রকল্প কাঠামো এখন অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করছে। অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি ও শিক্ষার মানোন্নয়নের মতো ভিন্ন ধরনের বিষয় একই প্রকল্পের মধ্যে রাখায় স্বচ্ছতা ও সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এ কাঠামোয় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় শিক্ষক সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদগুলোর সঙ্গে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। আগামী বছর থেকে দুর্গম এলাকার সব বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, পুষ্টিকর খাবারের মান নির্ধারণ করা হলেও কিছু এলাকায় সরবরাহকারী না পাওয়ায় দরপত্রপ্রক্রিয়া পিছিয়েছে। দুই দফায় পর্যাপ্ত সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি। এখন তৃতীয়বার দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আগামী বছর সীমিত পরিসরে রান্না করা খাবার দেওয়ার পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

সংলাপে স্বাগত বক্তব্যে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষাকে প্রধান শক্তি ও ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার সব স্তরের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষা শক্তিশালী না হলে পরবর্তী স্তরগুলোও শক্তিশালী হবে না।

তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় পাস করতে পারছে না, আবার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীও পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে মেধাবী শিক্ষকদের অনেকে শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছেন। এসব সমস্যা সমাধানে প্রাথমিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ আয়ের দেশে যেতে এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করতে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। শিক্ষা ছাড়া দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অভিভাবকদের বাড়তি কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানোর ব্যয় করতে না হয়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসন; এই চার পক্ষকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বিদ্যালয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরিতে জন্মনিবন্ধনের জটিলতা দূর করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

প্রাথমিক শিক্ষায় রাজনৈতিক প্রভাব ও হস্তক্ষেপের সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. ইলিয়াস মোল্লা। তিনি বলেন, বিদ্যালয় নির্মাণ ও বিভিন্ন প্রকল্পে রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে প্রশাসনের স্বাধীনভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান বলেন, বড় প্রকল্পের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা ও পাঠাভ্যাস গড়ে তোলায় গুরুত্ব দিতে হবে। বই বা ট্যাব দেওয়ার পাশাপাশি সেগুলো শিক্ষার্থীরা কীভাবে ব্যবহার করছে, সেটিও নজরদারিতে রাখতে হবে। কারিকুলামে শিশুমনোবিজ্ঞান ও শিক্ষামনোবিজ্ঞান যুক্ত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, শিক্ষকদের ক্যারিয়ার, প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ চলছে। প্রশিক্ষণে প্রাথমিক চিকিৎসা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষকদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, কোনো শিশুকে শিক্ষার বাইরে না রাখতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি নেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও খেলার মাঠ উন্নয়নেও কাজ চলছে। এ জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অংশীজনের সমন্বয় প্রয়োজন।

চিকিৎসক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাসনিম জারা বলেন, বড় পরিকল্পনার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ছোট ছোট বাস্তব সমস্যার সমাধানও জরুরি। একটি বিদ্যালয়ে অসুস্থ শিশুকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার মতো প্রস্তুতি শিক্ষক বা পর্যাপ্ত চিকিৎসাসামগ্রী ছিল না। এ ধরনের অভিজ্ঞতা পরিকল্পনা ও বাস্তবতার ব্যবধান তুলে ধরে।

তিনি বলেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পুরো অর্থ কেন ব্যয় হচ্ছে না, তা চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

সংলাপে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রাথমিক শিক্ষক, অভিভাবক প্রতিনিধি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাঁরা প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল বৃদ্ধি, শিক্ষক উন্নয়ন, বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নয়ন এবং শিক্ষা প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নাহরিন ইসলাম খান।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

প্রাথমিক শিক্ষার সংকট কাটাতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ

সর্বশেষ আপডেট ০৪:৫৬:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের। তাই এক দিন, এক মাস কিংবা ছয় মাসে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সরকার কাজ করছে। আগামী ২, ৩, ৫ বা ১০ বছরে নেওয়া উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়মিত নজরদারির আওতায় রাখতে হবে।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকার গুলশানের লেকশোর হোটেলে ‘নাগরিক প্ল্যাটফর্ম সংলাপ: সরকার কতখানি এগোলো? প্রাথমিক শিক্ষার ওপর আলোকপাত’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ এ সংলাপের আয়োজন করে।

ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার সাফল্য শুধু বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে কতটা শিখছে এবং সেই শেখার মাধ্যমে তাদের মধ্যে কী পরিবর্তন আসছে, সেটিই শিক্ষার সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রাথমিক শিক্ষায় অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয় হলেও এখন শিক্ষার্থীর শেখার ফলাফলকে কেন্দ্র করে পুরো ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের বিষয়টি একদিকে, আর শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ও শেখার বিষয়টি অন্যদিকে। এ দুটিকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীর শেখার ফলাফল নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য হতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ, পেশাগত ক্যারিয়ার, মূল্যায়ন, প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন; সব বিষয়কে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার কাজ চলছে।

শিক্ষকদের নিয়োগ থেকে শুরু করে ক্যারিয়ার, মূল্যায়ন ও প্রশিক্ষণব্যবস্থায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন ও কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হচ্ছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি, এক শিফট চালু এবং শ্রেণিকক্ষে কার্যকর শিখনসময় নিশ্চিত করার বিষয়েও নতুন করে ভাবা হচ্ছে। কারিকুলাম প্রণয়নে শিশুমনোবিজ্ঞানী ও প্রারম্ভিক শিক্ষার বিশেষজ্ঞদের আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

দেশের সব ধরনের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ধাপে ধাপে কার্যকর মনিটরিংয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। এ জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা তৈরি করে পর্যায়ক্রমে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।

বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম ও কিন্ডারগার্টেনসহ প্রাথমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের যেকোনো ধরনের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

সংলাপে সিপিডির পর্যালোচনায় জানানো হয়, প্রাথমিক শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট ২৪টি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কোনোটিই এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। কিছু উদ্যোগের প্রস্তাব করা হয়েছে, কিছু কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং কিছু নীতি ও আইনগত পর্যায়ে রয়েছে।

সিপিডি জানায়, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদিত হয়নি। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। দ্রুত অনুমোদনের পাশাপাশি বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

পিইডিপি-৫কে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে ববি হাজ্জাজ বলেন, দীর্ঘদিনের প্রকল্প কাঠামো এখন অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করছে। অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি ও শিক্ষার মানোন্নয়নের মতো ভিন্ন ধরনের বিষয় একই প্রকল্পের মধ্যে রাখায় স্বচ্ছতা ও সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এ কাঠামোয় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় শিক্ষক সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদগুলোর সঙ্গে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। আগামী বছর থেকে দুর্গম এলাকার সব বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবার পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, পুষ্টিকর খাবারের মান নির্ধারণ করা হলেও কিছু এলাকায় সরবরাহকারী না পাওয়ায় দরপত্রপ্রক্রিয়া পিছিয়েছে। দুই দফায় পর্যাপ্ত সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি। এখন তৃতীয়বার দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আগামী বছর সীমিত পরিসরে রান্না করা খাবার দেওয়ার পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

সংলাপে স্বাগত বক্তব্যে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষাকে প্রধান শক্তি ও ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার সব স্তরের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষা শক্তিশালী না হলে পরবর্তী স্তরগুলোও শক্তিশালী হবে না।

তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় পাস করতে পারছে না, আবার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীও পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে মেধাবী শিক্ষকদের অনেকে শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছেন। এসব সমস্যা সমাধানে প্রাথমিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ আয়ের দেশে যেতে এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করতে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। শিক্ষা ছাড়া দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অভিভাবকদের বাড়তি কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানোর ব্যয় করতে না হয়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসন; এই চার পক্ষকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বিদ্যালয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ইউনিক আইডি তৈরিতে জন্মনিবন্ধনের জটিলতা দূর করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

প্রাথমিক শিক্ষায় রাজনৈতিক প্রভাব ও হস্তক্ষেপের সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. ইলিয়াস মোল্লা। তিনি বলেন, বিদ্যালয় নির্মাণ ও বিভিন্ন প্রকল্পে রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে প্রশাসনের স্বাধীনভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান বলেন, বড় প্রকল্পের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা ও পাঠাভ্যাস গড়ে তোলায় গুরুত্ব দিতে হবে। বই বা ট্যাব দেওয়ার পাশাপাশি সেগুলো শিক্ষার্থীরা কীভাবে ব্যবহার করছে, সেটিও নজরদারিতে রাখতে হবে। কারিকুলামে শিশুমনোবিজ্ঞান ও শিক্ষামনোবিজ্ঞান যুক্ত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, শিক্ষকদের ক্যারিয়ার, প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ চলছে। প্রশিক্ষণে প্রাথমিক চিকিৎসা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষকদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, কোনো শিশুকে শিক্ষার বাইরে না রাখতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি নেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও খেলার মাঠ উন্নয়নেও কাজ চলছে। এ জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অংশীজনের সমন্বয় প্রয়োজন।

চিকিৎসক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাসনিম জারা বলেন, বড় পরিকল্পনার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ছোট ছোট বাস্তব সমস্যার সমাধানও জরুরি। একটি বিদ্যালয়ে অসুস্থ শিশুকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার মতো প্রস্তুতি শিক্ষক বা পর্যাপ্ত চিকিৎসাসামগ্রী ছিল না। এ ধরনের অভিজ্ঞতা পরিকল্পনা ও বাস্তবতার ব্যবধান তুলে ধরে।

তিনি বলেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পুরো অর্থ কেন ব্যয় হচ্ছে না, তা চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

সংলাপে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রাথমিক শিক্ষক, অভিভাবক প্রতিনিধি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তাঁরা প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল বৃদ্ধি, শিক্ষক উন্নয়ন, বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নয়ন এবং শিক্ষা প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নাহরিন ইসলাম খান।