কোটি কোটি টাকার যন্ত্র অচল
সরকারি হাসপাতালে রোগনির্ণয় ও চিকিৎসাসেবার নীরব বিপর্যয়
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:১৩:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 32
যন্ত্র কেনার মধ্যেই দায়িত্ব শেষ নয়; প্রয়োজনভিত্তিক ক্রয়, প্রশিক্ষিত জনবল, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দ্রুত মেরামত এবং প্রতিটি যন্ত্রের সচলতার তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
সরকারি হাসপাতালের একটি সিটি স্ক্যান, এমআরআই, এনজিওগ্রাম কিংবা রেডিওথেরাপি যন্ত্র অচল হওয়া শুধু একটি যান্ত্রিক ত্রুটি নয়। এর অর্থ; স্ট্রোকের রোগীর দ্রুত রোগনির্ণয় বিলম্বিত হওয়া, দুর্ঘটনাকবলিত রোগীর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ সময়মতো শনাক্ত না হওয়া, হৃদ্রোগীর এনজিওগ্রাম ও রক্তনালিতে রিং স্থাপনের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়া অথবা ক্যানসার রোগীর রেডিওথেরাপির তারিখ অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যাওয়া।
কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা এসব যন্ত্র যখন দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর অচল থাকে, তখন রাষ্ট্র শুধু একটি যন্ত্রের আর্থিক মূল্য হারায় না; রোগী হারান সময়, অর্থ এবং অনেক ক্ষেত্রে বেঁচে থাকার সুযোগ।
সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা না হওয়ায় রোগীকে বেসরকারি রোগনির্ণয় কেন্দ্রে কয়েক গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। যাঁদের সেই সামর্থ্য নেই, তাঁরা চিকিৎসা বিলম্বিত করেন, অসম্পূর্ণ রাখেন অথবা বিনা চিকিৎসায় বাড়ি ফিরে যান।
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য এবং বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে পাওয়া হালনাগাদ চিত্র বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এটি কোনো একটি হাসপাতালের বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
ঢাকা মেডিকেলের তিনটি সিটি স্ক্যান ও এনজিওগ্রাম যন্ত্র অচল
প্রাপ্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশের সর্ববৃহৎ সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তিনটি সিটি স্ক্যান যন্ত্র এবং এনজিওগ্রাম যন্ত্র অচল। প্রতিদিন কয়েক হাজার রোগীর চিকিৎসাসেবা দেওয়া এই হাসপাতালে একসঙ্গে তিনটি সিটি স্ক্যান যন্ত্র বন্ধ থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
জরুরি বিভাগে আসা মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত রোগী, স্ট্রোকের রোগী, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, বুক ও পেটের গুরুতর আঘাত এবং জটিল অস্ত্রোপচারের রোগীদের চিকিৎসায় তাৎক্ষণিকভাবে সিটি স্ক্যানের প্রয়োজন হয়। হাসপাতালের নিজস্ব যন্ত্র অচল থাকায় এসব রোগীকে বাইরে নিয়ে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এতে রোগনির্ণয় ও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি রোগীর পরিবারকে বহন করতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ।
একইভাবে এনজিওগ্রাম যন্ত্র অচল থাকায় হৃদ্রোগীদের করোনারি এনজিওগ্রাম, রক্তনালিতে রিং স্থাপন এবং অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী হস্তক্ষেপমূলক চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে হার্ট অ্যাটাকের রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত এনজিওগ্রাম করে রক্তনালির বন্ধ পথ খুলে দেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিটের বিলম্ব হৃদ্পেশির ক্ষতি ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়।
যে হাসপাতালে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সবচেয়ে বেশি জরুরি, জটিল ও সংকটাপন্ন রোগী আসেন, সেখানে তিনটি সিটি স্ক্যান এবং এনজিওগ্রাম যন্ত্র অচল থাকা কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি একটি জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংকট।
যন্ত্রগুলো কত দিন ধরে অচল, বিকল হওয়ার কারণ কী, মেরামতের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কবে নাগাদ সেগুলো চালু হবে; এসব তথ্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
ময়মনসিংহে ১১ কোটি টাকার সিটি স্ক্যান পাঁচ মাস ধরে অচল
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগনির্ণয় ও চিত্রায়ণ বিভাগে ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা একমাত্র সিটি স্ক্যান যন্ত্রটি প্রায় পাঁচ মাস ধরে অচল।
২০১৯ সালের শুরুর দিকে চালু হওয়া যন্ত্রটির নিশ্চয়তার মেয়াদ ছিল সাত বছর। প্রতিদিন এই যন্ত্রের মাধ্যমে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন রোগীর পরীক্ষা করা হতো। স্বাভাবিক দৈনিক সক্ষমতার হিসাবে পাঁচ মাসে হাজার হাজার রোগীর পরীক্ষা হওয়ার সুযোগ হারিয়েছে হাসপাতালটি।
হাসপাতালের দুটি এমআরআই যন্ত্রের একটি দীর্ঘদিন ধরে অচল। তিনটি এক্স-রে যন্ত্রের মধ্যে একটি পুরোপুরি নষ্ট; দুটি সচল রয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অচল যন্ত্র সংস্কারের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন যন্ত্র স্থাপনের আশা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার রোগী আসেন। ময়মনসিংহ ছাড়াও শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গাজীপুরের একাংশ এবং সুনামগঞ্জের বহু মানুষ এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল।
এমন একটি হাসপাতালে একমাত্র সিটি স্ক্যান এবং একটি এমআরআই যন্ত্র অচল থাকা শুধু রোগীর দুর্ভোগ নয়; জরুরি চিকিৎসার ধারাবাহিকতায় একটি বিপজ্জনক বাধা।
চট্টগ্রামে দুটি এনজিওগ্রাম সচল, পুরোনো যন্ত্র ছয় বছর ধরে নষ্ট
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় কিছুটা উন্নত হয়েছে। ২০২৫ সালে হাসপাতালটিতে একটি মাত্র এনজিওগ্রাম যন্ত্র সচল ছিল। আরেকটি যন্ত্র ২০২১ সালের শেষ দিক থেকে নষ্ট ছিল। এদিকে মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অব্যবহৃত দুটি এনজিওগ্রাম যন্ত্রের একটি চট্টগ্রামে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
১৮ জুন ২০২৬ প্রকাশিত দৈনিক আজাদীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুটি এনজিওগ্রাম যন্ত্র সচল রয়েছে। মানিকগঞ্জ থেকে আনা অব্যবহৃত যন্ত্রটি ২০২৫ সালের শেষ দিকে স্থাপন করে চালু করা হয়েছে।
তবে হাসপাতালের জাপানে তৈরি পুরোনো এনজিওগ্রাম যন্ত্রটি প্রায় ছয় বছর ধরে নষ্ট অবস্থায় পড়ে আছে। এর ছবি তৈরির নল মেরামতে আনুমানিক ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছিল। যন্ত্রটি মেরামত এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কেন্দ্রীয় রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অর্থ বরাদ্দ চেয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রামের সক্ষমতা আগের তুলনায় বাড়লেও ছয় বছর ধরে একটি মূল্যবান যন্ত্র অচল পড়ে থাকার ঘটনাটি আমাদের রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা স্পষ্ট করে।
মানিকগঞ্জে যন্ত্র ছিল, চালানোর জনবল ছিল না
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ২২ জুন ২০২৫-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০১৮-১৯ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে দুটি এনজিওগ্রাম যন্ত্র সরবরাহ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবলের অভাবে যন্ত্র দুটি চালু করা যায়নি। পরে একটি যন্ত্র চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় এবং সেটি সেখানে সচল রয়েছে।
অব্যবহৃত যন্ত্রকে ‘নষ্ট যন্ত্র’ বলা কারিগরিভাবে সঠিক নয়। কিন্তু রোগীর দৃষ্টিতে ফলাফল একই—সরকারি অর্থ ব্যয় করে যন্ত্র কেনা হয়েছে, অথচ রোগী সেবা পাননি।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, শুধু যন্ত্র কেনাই উন্নয়ন নয়। যন্ত্র স্থাপনের উপযুক্ত কক্ষ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্স ও প্রযুক্তিবিদ, প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য সামগ্রী এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলে কোটি টাকার যন্ত্রও কার্যত মৃত সম্পদে পরিণত হয়।
বরিশালে এনজিওগ্রাম সেবা নিয়ে আবারও অনিশ্চয়তা
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনজিওগ্রাম যন্ত্রটি বর্তমানে অচল; এমন হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ লিখিত বক্তব্য প্রকাশ না হওয়ায় যন্ত্রটি ঠিক কত দিন ধরে বন্ধ এবং মেরামতের অগ্রগতি কী, তা স্পষ্ট নয়।
নির্ভরযোগ্য প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যন্ত্রটি ২০১৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর নষ্ট হওয়ার পর প্রায় চার বছর বন্ধ ছিল। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মেরামতের পর এনজিওগ্রাম যন্ত্রটি পুনরায় চালু করা হয়েছে। একই সময়ে আড়াই বছর বন্ধ থাকা সিটি স্ক্যান যন্ত্রও সচল করা হয়েছিল।
যন্ত্রটি আবার অচল হয়ে থাকলে তা দক্ষিণাঞ্চলের হৃদ্রোগীদের জন্য গুরুতর সংকট। হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসায় সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি এনজিওগ্রাম ও রক্তনালিতে রিং স্থাপনের জন্য কয়েক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় যাওয়া অনেক রোগীর পক্ষেই সম্ভব নয়।
বরিশালের মতো একটি বিভাগীয় শহরের প্রধান সরকারি হাসপাতালে এনজিওগ্রাম সেবা বন্ধ থাকা আঞ্চলিক স্বাস্থ্যবৈষম্যেরও বড় উদাহরণ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উচিত যন্ত্রটির বর্তমান অবস্থা, মেরামতের উদ্যোগ এবং সম্ভাব্য সময়সীমা জনসমক্ষে প্রকাশ করা।
২৩ মেডিকেল কলেজে অচল ছিল ১১টি সিটি স্ক্যান ও ১০টি এমআরআই
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে অচল যন্ত্রের সামগ্রিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২ ডিসেম্বর ২০২৪ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, দেশের ২৩টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মোট ৩১টি সিটি স্ক্যান যন্ত্রের মধ্যে ১১টি অচল ছিল। একই হাসপাতালগুলোতে থাকা ২৪টি এমআরআই যন্ত্রের মধ্যে অচল ছিল ১০টি।
এ ছাড়া ১৮টি সরকারি বিশেষায়িত চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে থাকা ১৭টি সিটি স্ক্যান যন্ত্রের সাতটি এবং নয়টি এমআরআই যন্ত্রের চারটি অচল ছিল। দেশের ৬১টি জেলা সদর হাসপাতালে মাত্র ১০টি সিটি স্ক্যান ছিল; সেগুলোর একটি অচল। তিনটি এমআরআই যন্ত্রের একটিও অচল ছিল।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, অচল যন্ত্রগুলোর প্রায় অর্ধেক মেরামত-অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। অনেক যন্ত্রের বিক্রয়োত্তর সেবার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির ব্যয় নিয়ে সরকার ও সরবরাহকারীদের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় মেরামতের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছিল।
তথ্যগুলো ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের। এর মধ্যে কোনো কোনো যন্ত্র মেরামত অথবা প্রতিস্থাপন হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু ২০২৬ সালেও হাসপাতালভিত্তিক উন্মুক্ত ও নিয়মিত হালনাগাদ তথ্যভান্ডার না থাকায় দেশের সব সরকারি চিকিৎসা যন্ত্রের বর্তমান অবস্থা সাধারণ মানুষ, গণমাধ্যম, এমনকি নীতিনির্ধারকদের পক্ষেও জানা কঠিন।
জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালে সব রেডিওথেরাপি যন্ত্র অচল হওয়ার নজির
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নয়; কিন্তু দেশের চিকিৎসা যন্ত্র ব্যবস্থাপনার সংকট বোঝার জন্য প্রতিষ্ঠানটির ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১২ জানুয়ারি ২০২৫ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালটির ছয়টি রেডিওথেরাপি যন্ত্রই তখন অচল ছিল। এর মধ্যে চারটি আগে থেকেই অকেজো ছিল এবং সচল থাকা বাকি দুটিও ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বন্ধ হয়ে যায়। এতে প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ২২০ জন ক্যানসার রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছিল।
এরপর কোনো যন্ত্র মেরামত অথবা নতুন যন্ত্র চালু হয়ে থাকতে পারে। তাই এটিকে বর্তমান অবস্থা হিসেবে নয়, দেশের প্রধান ক্যানসার হাসপাতালে সংঘটিত একটি গুরুতর ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার নথি হিসেবে দেখতে হবে।
একই সংকট বারবার ফিরে আসে কেন
সরকারি হাসপাতালে যন্ত্র অচল ও অব্যবহৃত থাকার পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ রয়েছে।
প্রথমত, অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ প্রয়োজন নিরূপণ ছাড়াই যন্ত্র কেনা হয়। কোথাও রোগীর চাপের তুলনায় যন্ত্রের সংখ্যা অপ্রতুল, আবার কোথাও যন্ত্র থাকলেও সেটি চালানোর মতো জনবল ও অবকাঠামো নেই।
দ্বিতীয়ত, যন্ত্র কেনার আগে উপযুক্ত কক্ষ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ, বিকিরণ-নিরাপত্তা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং ব্যবহার্য সামগ্রীর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয় না।
তৃতীয়ত, নিশ্চয়তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নিয়মিত ও পূর্ণাঙ্গ রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি থাকে না। ছোট একটি যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে মেরামতের নথি হাসপাতাল, অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয় ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘুরতে থাকে। তত দিনে যন্ত্র মাসের পর মাস বন্ধ থাকে।
চতুর্থত, অনেক যন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ শুধু নির্দিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া যায়। ফলে মেরামতের ব্যয়, সময় ও শর্তের বিষয়ে রাষ্ট্রের দর-কষাকষির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
পঞ্চমত, হাসপাতাল পরিচালকদের হাতে জরুরি মেরামতের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই। অল্প মূল্যের একটি যন্ত্রাংশ কেনার সিদ্ধান্তও অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে নেওয়া যায় না।
ষষ্ঠত, একটি যন্ত্র কত দিন সচল ছিল, কত দিন বন্ধ ছিল এবং কতজন রোগী সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে মাসের পর মাস যন্ত্র বন্ধ থাকলেও কারও জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না।
যন্ত্র অচল হলে লাভবান হয় কারা
সরকারি হাসপাতালের যন্ত্র বন্ধ হলে রোগীরা আশপাশের বেসরকারি রোগনির্ণয় কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হন। সরকারি হাসপাতালে স্বল্পমূল্যে যে পরীক্ষা হওয়ার কথা, বাইরে তার জন্য দুই থেকে কয়েক গুণ বেশি অর্থ দিতে হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত রোগীরা।
যন্ত্র দীর্ঘদিন অচল থাকার পেছনে অবহেলা, অদক্ষতা কিংবা স্বার্থের সংঘাত কাজ করছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। তবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা উচিত নয়।
অনুসন্ধান করে দেখা দরকার; সরকারি যন্ত্র বন্ধ থাকলে রোগীরা কোন কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন, রোগী পাঠানোর কোনো অনৈতিক ব্যবস্থা রয়েছে কি না এবং যন্ত্র মেরামতে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব ঘটছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান নয়, স্বাধীন নিরীক্ষা ও তথ্যপ্রমাণের মাধ্যমে বের করতে হবে।
জাতীয় চিকিৎসা যন্ত্র তথ্যভান্ডার প্রয়োজন
দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা যন্ত্রের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে। সেখানে উল্লেখ থাকবে;
কোন হাসপাতালে কোন যন্ত্র রয়েছে;
যন্ত্রটি সচল, আংশিক সচল, অচল, মেরামতাধীন নাকি অব্যবহৃত;
কত তারিখ থেকে যন্ত্র বা সেবা বন্ধ;
অচল হওয়ার কারণ কী;
মেরামতের দায়িত্ব কোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার;
মেরামতের সম্ভাব্য সময়সীমা;
নিশ্চয়তা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির মেয়াদ;
প্রতিদিন কতজন রোগী সেবা পাচ্ছেন;
যন্ত্র বন্ধ থাকায় কতজন রোগী সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য নিয়মিত স্বাধীন কারিগরি নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। তথ্য গোপন অথবা ভুলভাবে উপস্থাপন করা হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
যন্ত্রের পূর্ণ জীবনচক্র পরিকল্পনা করতে হবে
প্রতিটি বড় চিকিৎসা যন্ত্র কেনার আগে রোগীর চাপ ও প্রকৃত প্রয়োজন নিরূপণ করতে হবে। শুধু ক্রয়মূল্য নয়; অন্তত পরবর্তী ১০ বছরের যন্ত্রাংশ, ব্যবহার্য সামগ্রী, জনবল, প্রশিক্ষণ, পরিচালনব্যবস্থা, বিদ্যুৎ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও হিসাব করতে হবে।
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমন চুক্তি থাকতে হবে, যাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যন্ত্র মেরামত না করলে আর্থিক জরিমানা দিতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রের জন্য বাধ্যতামূলক বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের মজুত নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিটি বিভাগে প্রশিক্ষিত জৈব-চিকিৎসা প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদের সমন্বয়ে আঞ্চলিক রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে লোক আসার অপেক্ষায় কোনো জীবনরক্ষাকারী যন্ত্র মাসের পর মাস বন্ধ থাকতে পারে না।
একই সঙ্গে একটি যন্ত্রের ওপর পুরো অঞ্চলের সেবা নির্ভরশীল রাখা যাবে না। সিটি স্ক্যান, এমআরআই, এনজিওগ্রাম, ভেন্টিলেটর, ডায়ালাইসিস ও রেডিওথেরাপির মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবায় বিকল্প যন্ত্র এবং আনুষ্ঠানিক রোগী স্থানান্তর পরিকল্পনা থাকতে হবে।
মেরামতের নির্দিষ্ট সময়সীমা চাই
জীবনরক্ষাকারী যন্ত্র অচল হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ত্রুটি নথিভুক্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে;
৭২ ঘণ্টার মধ্যে কারিগরি পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে; সাত দিনের মধ্যে মেরামত, যন্ত্রাংশ সংগ্রহ অথবা প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং ৩০ দিনের বেশি বন্ধ থাকলে স্বাধীন তদন্ত ও বিকল্প সেবাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
হাসপাতাল পরিচালকের হাতে নির্দিষ্ট অঙ্কের জরুরি মেরামত তহবিল এবং সীমিত ক্রয়ক্ষমতা দিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যয়ের পূর্ণ তথ্য প্রকাশ ও পরবর্তী নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ কোনো যন্ত্র বন্ধ হলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালকে নিকটবর্তী সরকারি প্রতিষ্ঠানে রোগী পাঠানোর আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু রোগীর হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
জবাবদিহি কার
যন্ত্র কেনার সময় উদ্বোধন ও প্রচার করা সহজ; কিন্তু পাঁচ বছর পর যন্ত্রটি সচল আছে কি না; এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন। যন্ত্র অচল হওয়ার দায় শুধু হাসপাতালের পরিচালক অথবা সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকদের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না।
ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষ, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, রক্ষণাবেক্ষণ সংস্থা, হাসপাতাল প্রশাসন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়—প্রত্যেকের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করতে হবে।
প্রতি মাসে হাসপাতালভিত্তিক ‘চিকিৎসা যন্ত্র সচলতা প্রতিবেদন’ প্রকাশ করতে হবে। হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় শুধু খাবারের মান, পরিচ্ছন্নতা কিংবা চিকিৎসকের উপস্থিতি দেখলে হবে না; কতটি সিটি স্ক্যান, এমআরআই, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম, এনজিওগ্রাম, ভেন্টিলেটর, ডায়ালাইসিস ও রেডিওথেরাপি যন্ত্র সচল; সেটিও দেখতে হবে।
যন্ত্র অচল হওয়ার সাত দিনের মধ্যে মেরামতের দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে। ৩০ দিনের বেশি অচল থাকলে স্বাধীন তদন্ত এবং তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
শেষ কথা
একটি হাসপাতালের যন্ত্র নষ্ট হতে পারে; এটি অস্বাভাবিক নয়। অস্বাভাবিক হলো, কোটি টাকার জীবনরক্ষাকারী যন্ত্র মাসের পর মাস নষ্ট পড়ে থাকা; মেরামতের নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকা; বিকল্প ব্যবস্থা না করা এবং সেই ব্যর্থতার জন্য কারও জবাবদিহি না থাকা।
সরকারি হাসপাতালে যন্ত্র অচল থাকার মূল্য শেষ পর্যন্ত রোগীই পরিশোধ করেন; অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে, চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করে, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরে এবং কখনো নিজের জীবন দিয়ে।
তাই শুধু নতুন যন্ত্র কেনার ঘোষণা নয়, আগে অচল ও অব্যবহৃত যন্ত্রের পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করতে হবে। প্রয়োজনভিত্তিক ক্রয়, প্রশিক্ষিত জনবল, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দ্রুত মেরামত, স্বাধীন কারিগরি নিরীক্ষা এবং জনসমক্ষে তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত না করলে কোটি কোটি টাকার যন্ত্র কেনা হবে, উদ্বোধন হবে, ছবি উঠবে; কিন্তু প্রয়োজনের সময় রোগী সেবা পাবেন না।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাফল্য কতটি যন্ত্র কেনা হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। কতটি যন্ত্র সচল আছে এবং কতজন রোগী সময়মতো, নিরাপদে ও স্বল্প খরচে সেবা পাচ্ছেন; সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড সেটিই।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল; ক্লিনিক্যাল ও ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট।






























