আট মাসে নিখোঁজ ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার
- সর্বশেষ আপডেট ০২:৩৩:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 23
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা তারা নিজে থেকে ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
গতকাল কুমিল্লায় নিখোঁজের পর ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। চলতি বছর নিখোঁজ হওয়ার পর কোনো শিশুর মরদেহ মিলেছে মাটিচাপা অবস্থায়, আবার কারও মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে নদী থেকে।
শুধু নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধার নয়, চলতি বছর ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শিশু নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর জামালপুরের মাদারগঞ্জে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর নিখোঁজ হয় সাত বছরের এক শিশু। দুই দিন পর ১২ সেপ্টেম্বর তার সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে পরিসংখ্যান তৈরি করে আসক। সংগঠনটির হিসাবে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন ঘটনায় ১৫৫ শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে ৬৮, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে ৪৯, ধর্ষণের পর ২৬ এবং ধর্ষণচেষ্টার পর চার শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া গুলিতে তিনজন, গৃহকর্মী হিসেবে শারীরিক নির্যাতনে দুজন, উত্ত্যক্তকারীর হাতে দুজন এবং অপহরণের পর একজন শিশু নিহত হয়েছে।
আসকের হিসাবে, এ সময় আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধারের ৯৯টি ঘটনাও ঘটেছে।
সাম্প্রতিক চারটি ঘটনায় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সাত শিশুও নিহত হয়েছে। গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি ভাড়া বাসায় এক নারী ও তার তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত তিন মেয়ের মধ্যে সিপার বয়স ছিল ১০ বছর। অপর দুজন ইকরা ও সাইমা আক্তারের বয়স যথাক্রমে ১৭ ও ২১ বছর।
আগস্টে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে ১২ বছরের ছেলে আয়ুশও হত্যার শিকার হয়। একই মাসে মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের পাঁচ দিন পর ২৪ আগস্ট নদী থেকে তার এক বছর বয়সী সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে একই পরিবারের ১০, ৭ ও ২ বছর বয়সী তিন শিশুকে হত্যার ঘটনাও ঘটে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৩৬২টি হত্যা মামলা হয়েছে। সে হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৯৫টি হত্যা মামলা হয়েছে।
শিশুদের ওপর সহিংসতা নিয়ে গত ২২ মে উদ্বেগ জানিয়েছিল ইউনিসেফ। সংস্থাটির তৎকালীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এসব ঘটনায় দায়মুক্তির অবসান এবং ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রতিটি পরিসরে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় সুরক্ষা সেবা এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তার ঘাটতি দূর করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, শিশুদের বিরুদ্ধে এ ধরনের নৃশংসতা সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এখন প্রশ্ন উঠছে, শিশুদের জন্য নিরাপদ জায়গা কোথায়। খেলার মাঠ, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যাওয়া কিংবা পরিবারের সঙ্গে থাকলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
শিশুদের ওপর সহিংসতার পেছনে অপরাধীদের বিকৃত মানসিকতার পাশাপাশি প্রতিশোধ, পারিবারিক বিরোধ কিংবা বড়দের দ্বন্দ্বও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, এসব ঘটনার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে এবং শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা কমাতে তা ভূমিকা রাখতে পারে।






























