ঢাকা ০৪:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

সিনিয়র প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ১২:১৯:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 18

ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাসদ সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর দেওয়া প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার এই রায়ে তার বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটি প্রমাণিত হয়েছে। তবে তিন অভিযোগে ১০ বছর করে কারাদণ্ড হলেও সাজা একসঙ্গে চলবে। ফলে ইনুকে মোট ১০ বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

রোববার রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে ৩০ জুন ২০২৬ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ইনুর বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করে। রায়ে ৩, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিটিতে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগে তাকে এক লাখ টাকা করে জরিমানাও করা হয়। অন্য পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর গুরুতর আঘাত, নির্যাতন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনায় ইনুর দায় প্রমাণিত হয়েছে। একই সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা ও সহযোগিতার অভিযোগেও তার দায়ের কথা রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলায় ইনুই ছিলেন একমাত্র আসামি। রাষ্ট্রপক্ষ তার বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনে। এসব অভিযোগের মধ্যে ছিল জুলাই আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগে উসকানি, তৎকালীন ১৪ দলীয় জোটের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে নির্দেশনা, প্ররোচনা ও সহায়তা এবং আন্দোলন দমনে বিভিন্ন পদক্ষেপে সম্পৃক্ততার অভিযোগ।

যেসব অভিযোগে সাজা

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৪ দলীয় জোটের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে অভিযোগ করা হয়। ওই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ইনুর নির্দেশনা, প্ররোচনা ও সহযোগিতা ছিল বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে।

এ ছাড়া ২০ জুলাই ইনু কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, এর পর কুষ্টিয়ায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ ও ধরপাকড়ের ঘটনা ঘটে।

মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, আন্দোলন দমনের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে ইনু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার, আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মতো পদক্ষেপে তিনি সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়েছেন বলেও অভিযোগ আনা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষ আরও অভিযোগ করে, ২৭ জুলাই একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইনু আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করে বক্তব্য দেন। এসব বক্তব্য আন্দোলন দমনে উসকানি হিসেবে কাজ করেছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে।

২৯ জুলাই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সভায় ইনুর উপস্থিতির কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। সেখানে আন্দোলন দমন এবং জামায়াত নিষিদ্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ছিল।

কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহতের অভিযোগ

মামলার অন্যতম অভিযোগ ছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় ছয় আন্দোলনকারী নিহত হওয়ার ঘটনা। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে বলা হয়, আন্দোলন দমনে বিভিন্ন পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে গুলিবর্ষণ করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দিন কুষ্টিয়ায় আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন। আরও অনেকে আহত ও আটক হন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

তবে ইনুর বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগের সবগুলো ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগের মধ্যে ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ছয় আন্দোলনকারী হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগটিও প্রমাণিত হয়নি।

মামলার তদন্ত শুরু হয় ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ। ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ১০ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে এবং আসামিপক্ষ দুইজন সাক্ষী হাজির করে।

শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত তিন অভিযোগে পৃথকভাবে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হলেও দণ্ড একসঙ্গে কার্যকর হওয়ায় ইনুর মোট সাজা ১০ বছর।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

সর্বশেষ আপডেট ১২:১৯:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাসদ সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর দেওয়া প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার এই রায়ে তার বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটি প্রমাণিত হয়েছে। তবে তিন অভিযোগে ১০ বছর করে কারাদণ্ড হলেও সাজা একসঙ্গে চলবে। ফলে ইনুকে মোট ১০ বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

রোববার রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে ৩০ জুন ২০২৬ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ইনুর বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করে। রায়ে ৩, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিটিতে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগে তাকে এক লাখ টাকা করে জরিমানাও করা হয়। অন্য পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর গুরুতর আঘাত, নির্যাতন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনায় ইনুর দায় প্রমাণিত হয়েছে। একই সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র, প্ররোচনা ও সহযোগিতার অভিযোগেও তার দায়ের কথা রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলায় ইনুই ছিলেন একমাত্র আসামি। রাষ্ট্রপক্ষ তার বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনে। এসব অভিযোগের মধ্যে ছিল জুলাই আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগে উসকানি, তৎকালীন ১৪ দলীয় জোটের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে নির্দেশনা, প্ররোচনা ও সহায়তা এবং আন্দোলন দমনে বিভিন্ন পদক্ষেপে সম্পৃক্ততার অভিযোগ।

যেসব অভিযোগে সাজা

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৪ দলীয় জোটের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে অভিযোগ করা হয়। ওই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ইনুর নির্দেশনা, প্ররোচনা ও সহযোগিতা ছিল বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে।

এ ছাড়া ২০ জুলাই ইনু কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, এর পর কুষ্টিয়ায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ ও ধরপাকড়ের ঘটনা ঘটে।

মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, আন্দোলন দমনের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে ইনু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার, আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মতো পদক্ষেপে তিনি সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়েছেন বলেও অভিযোগ আনা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষ আরও অভিযোগ করে, ২৭ জুলাই একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইনু আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করে বক্তব্য দেন। এসব বক্তব্য আন্দোলন দমনে উসকানি হিসেবে কাজ করেছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে।

২৯ জুলাই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সভায় ইনুর উপস্থিতির কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। সেখানে আন্দোলন দমন এবং জামায়াত নিষিদ্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ছিল।

কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহতের অভিযোগ

মামলার অন্যতম অভিযোগ ছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় ছয় আন্দোলনকারী নিহত হওয়ার ঘটনা। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে বলা হয়, আন্দোলন দমনে বিভিন্ন পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে গুলিবর্ষণ করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দিন কুষ্টিয়ায় আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন। আরও অনেকে আহত ও আটক হন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

তবে ইনুর বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগের সবগুলো ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগের মধ্যে ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ছয় আন্দোলনকারী হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগটিও প্রমাণিত হয়নি।

মামলার তদন্ত শুরু হয় ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ। ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ১০ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে এবং আসামিপক্ষ দুইজন সাক্ষী হাজির করে।

শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত তিন অভিযোগে পৃথকভাবে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হলেও দণ্ড একসঙ্গে কার্যকর হওয়ায় ইনুর মোট সাজা ১০ বছর।