ঢাকা ০৪:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মহাকাশে চিনির সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা!

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ০২:২৬:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬
  • / 8

মহাকাশে চিনির সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা!

বিজ্ঞানীরা বহু দশক ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। সেই দীর্ঘ অনুসন্ধানে এবার যোগ হলো এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। পৃথিবী থেকে হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরের মহাশূন্যে প্রথমবারের মতো পাওয়া গেছে একটি প্রাকৃতিক শর্করা (চিনি), যার নাম এরিথ্রুলোজ। গবেষকদের ধারণা, এই ছোট্ট অণুই হয়তো বহন করে এনেছে পৃথিবীতে জীবনের সূচনার এক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।

এরিথ্রুলোজ আমাদের কাছে একেবারে অপরিচিত কোনো পদার্থ নয়। এটি পৃথিবীতে রাস্পবেরি ফলের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায়। এমনকি কৃত্রিম ট্যানিং (ফেক ট্যান) প্রসাধনীতেও এটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু একই শর্করা যে পৃথিবীর বাইরেও, নক্ষত্রের মাঝের বিশাল মহাশূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছে এমন ধারণা কয়েক বছর আগেও বিজ্ঞানীদের কাছে অকল্পনীয় ছিল।

সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের কাছে অবস্থিত জি+০.৬৯৩−০.০২৭ নামের একটি বিশাল আণবিক মেঘে এই শর্করার উপস্থিতি শনাক্ত করেন। অত্যন্ত সংবেদনশীল দুটি রেডিও টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করে তারা এর রাসায়নিক উপস্থিতি খুঁজে পান। পরে পরীক্ষাগারের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি সত্যিই এরিথ্রুলোজ।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার
জীবনের মৌলিক উপাদানগুলোর মধ্যে শর্করার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেহের প্রতিটি কোষে থাকা ডিএনএ ও আরএনএর গঠন এবং বিভিন্ন জৈব প্রক্রিয়ায় শর্করার অবদান অপরিহার্য। সহজভাবে বললে, জীবন গঠনে যেসব উপাদান প্রয়োজন, শর্করা তাদের অন্যতম ভিত্তি।

তবে একটি প্রশ্ন বহুদিন ধরে বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে, এই শর্করাগুলো প্রথম তৈরি হলো কীভাবে?

পৃথিবীতে প্রাণের জন্মের আগের পরিবেশ অনুকরণ করে গবেষণাগারে নানা পরীক্ষা চালানো হয়েছে। কিন্তু সেই পরীক্ষাগুলোতে স্বাভাবিকভাবে এমন জটিল শর্করা তৈরি করা যায়নি। ফলে জীবনের কিছু প্রয়োজনীয় উপাদান পৃথিবীতে তৈরি হয়নি, এসেছে মহাশূন্য থেকেই এমন ধারণা আরও জোরালো হতে থাকে।

মহাকাশ থেকে এসেছিল প্রাণের উপাদান?
এর আগে উল্কাপিণ্ড ও গ্রহাণুর নমুনায় বিভিন্ন ধরনের শর্করার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এসব পদার্থ সৌরজগত গঠনের সময়কার আদিম আণবিক মেঘ থেকেই এসেছে। কিন্তু নক্ষত্রগুলোর মাঝখানের বিশাল আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে সরাসরি এমন কোনো শর্করার অস্তিত্ব আগে শনাক্ত করা যায়নি।

নতুন এই আবিষ্কার সেই শূন্যস্থান পূরণ করল। অর্থাৎ, জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় জটিল অণু নক্ষত্রের জন্মের আগেই মহাশূন্যে তৈরি হতে পারে, এই আবিষ্কারের মাধ্যমে এমন ধারণা এখন আরও শক্ত ভিত্তি পেল।

গবেষণার আরেকটি দিক বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে

সাধারণ ধারণা ছিল, মহাশূন্যে অণুগুলো ধীরে ধীরে একটি করে কার্বন পরমাণু যুক্ত করে বড় হয়। সে ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত সহজ, তিন-কার্বনের শর্করা আগে পাওয়া যাওয়ার কথা। কিন্তু গবেষকেরা দেখলেন উল্টো ঘটনা, তিন-কার্বনের শর্করার কোনো প্রমাণই মেলেনি, বরং আরও জটিল চার-কার্বনের এরিথ্রুলোজই পাওয়া গেছে।

গবেষণার প্রধান লেখক ইজাসকুন জিমেনেজ সেরা বলেন, এই ফলাফল প্রচলিত ধারণাকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। অর্থাৎ মহাশূন্যে জটিল জৈব অণু তৈরির প্রক্রিয়া হয়তো আমাদের কল্পনার চেয়েও ভিন্ন।

চারশ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে কী ঘটেছিল
পৃথিবীর ইতিহাসে প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে একটি সময়কে বলা হয় লেট হেভি বোম্বারডমেন্ট। তখন অসংখ্য গ্রহাণু ও ধূমকেতু পৃথিবীতে আছড়ে পড়েছিল। বিজ্ঞানীদের নতুন হিসাব বলছে, সেই সময় মহাকাশ থেকে প্রায় পাঁচ লাখ থেকে পাঁচ কোটি টন এরিথ্রুলোজ পৃথিবীতে আসতে পারে।

যদি সত্যিই এমন হয়ে থাকে, তবে সেই শর্করা হয়তো আদিম পৃথিবীর রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলোকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছিল। কোটি কোটি বছর পরে যার ফল হিসেবে জন্ম নিয়েছে প্রাণের প্রথম রূপ। অবশ্য এটি এখনো একটি বৈজ্ঞানিক অনুমান।

ভিনগ্রহে প্রাণের খোঁজেও নতুন আশা
এই গবেষণার গুরুত্ব শুধু পৃথিবীর অতীত বোঝার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যদি মহাশূন্যে স্বাভাবিকভাবে এমন জটিল শর্করা তৈরি হতে পারে, তবে অন্য নক্ষত্রের চারপাশে গড়ে ওঠা গ্রহেও জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান পৌঁছে যেতে পারে।
অর্থাৎ, মহাবিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব হয়তো আমাদের ধারণার চেয়েও স্বাভাবিক কোনো বিষয় হতে পারে।

সূত্র: ন্যাচার অ্যাস্ট্রোনমি, দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

মহাকাশে চিনির সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা!

সর্বশেষ আপডেট ০২:২৬:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

বিজ্ঞানীরা বহু দশক ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। সেই দীর্ঘ অনুসন্ধানে এবার যোগ হলো এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। পৃথিবী থেকে হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরের মহাশূন্যে প্রথমবারের মতো পাওয়া গেছে একটি প্রাকৃতিক শর্করা (চিনি), যার নাম এরিথ্রুলোজ। গবেষকদের ধারণা, এই ছোট্ট অণুই হয়তো বহন করে এনেছে পৃথিবীতে জীবনের সূচনার এক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।

এরিথ্রুলোজ আমাদের কাছে একেবারে অপরিচিত কোনো পদার্থ নয়। এটি পৃথিবীতে রাস্পবেরি ফলের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায়। এমনকি কৃত্রিম ট্যানিং (ফেক ট্যান) প্রসাধনীতেও এটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু একই শর্করা যে পৃথিবীর বাইরেও, নক্ষত্রের মাঝের বিশাল মহাশূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছে এমন ধারণা কয়েক বছর আগেও বিজ্ঞানীদের কাছে অকল্পনীয় ছিল।

সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ের কেন্দ্রের কাছে অবস্থিত জি+০.৬৯৩−০.০২৭ নামের একটি বিশাল আণবিক মেঘে এই শর্করার উপস্থিতি শনাক্ত করেন। অত্যন্ত সংবেদনশীল দুটি রেডিও টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করে তারা এর রাসায়নিক উপস্থিতি খুঁজে পান। পরে পরীক্ষাগারের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি সত্যিই এরিথ্রুলোজ।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার
জীবনের মৌলিক উপাদানগুলোর মধ্যে শর্করার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেহের প্রতিটি কোষে থাকা ডিএনএ ও আরএনএর গঠন এবং বিভিন্ন জৈব প্রক্রিয়ায় শর্করার অবদান অপরিহার্য। সহজভাবে বললে, জীবন গঠনে যেসব উপাদান প্রয়োজন, শর্করা তাদের অন্যতম ভিত্তি।

তবে একটি প্রশ্ন বহুদিন ধরে বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে, এই শর্করাগুলো প্রথম তৈরি হলো কীভাবে?

পৃথিবীতে প্রাণের জন্মের আগের পরিবেশ অনুকরণ করে গবেষণাগারে নানা পরীক্ষা চালানো হয়েছে। কিন্তু সেই পরীক্ষাগুলোতে স্বাভাবিকভাবে এমন জটিল শর্করা তৈরি করা যায়নি। ফলে জীবনের কিছু প্রয়োজনীয় উপাদান পৃথিবীতে তৈরি হয়নি, এসেছে মহাশূন্য থেকেই এমন ধারণা আরও জোরালো হতে থাকে।

মহাকাশ থেকে এসেছিল প্রাণের উপাদান?
এর আগে উল্কাপিণ্ড ও গ্রহাণুর নমুনায় বিভিন্ন ধরনের শর্করার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এসব পদার্থ সৌরজগত গঠনের সময়কার আদিম আণবিক মেঘ থেকেই এসেছে। কিন্তু নক্ষত্রগুলোর মাঝখানের বিশাল আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যে সরাসরি এমন কোনো শর্করার অস্তিত্ব আগে শনাক্ত করা যায়নি।

নতুন এই আবিষ্কার সেই শূন্যস্থান পূরণ করল। অর্থাৎ, জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় জটিল অণু নক্ষত্রের জন্মের আগেই মহাশূন্যে তৈরি হতে পারে, এই আবিষ্কারের মাধ্যমে এমন ধারণা এখন আরও শক্ত ভিত্তি পেল।

গবেষণার আরেকটি দিক বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে

সাধারণ ধারণা ছিল, মহাশূন্যে অণুগুলো ধীরে ধীরে একটি করে কার্বন পরমাণু যুক্ত করে বড় হয়। সে ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত সহজ, তিন-কার্বনের শর্করা আগে পাওয়া যাওয়ার কথা। কিন্তু গবেষকেরা দেখলেন উল্টো ঘটনা, তিন-কার্বনের শর্করার কোনো প্রমাণই মেলেনি, বরং আরও জটিল চার-কার্বনের এরিথ্রুলোজই পাওয়া গেছে।

গবেষণার প্রধান লেখক ইজাসকুন জিমেনেজ সেরা বলেন, এই ফলাফল প্রচলিত ধারণাকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। অর্থাৎ মহাশূন্যে জটিল জৈব অণু তৈরির প্রক্রিয়া হয়তো আমাদের কল্পনার চেয়েও ভিন্ন।

চারশ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে কী ঘটেছিল
পৃথিবীর ইতিহাসে প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে একটি সময়কে বলা হয় লেট হেভি বোম্বারডমেন্ট। তখন অসংখ্য গ্রহাণু ও ধূমকেতু পৃথিবীতে আছড়ে পড়েছিল। বিজ্ঞানীদের নতুন হিসাব বলছে, সেই সময় মহাকাশ থেকে প্রায় পাঁচ লাখ থেকে পাঁচ কোটি টন এরিথ্রুলোজ পৃথিবীতে আসতে পারে।

যদি সত্যিই এমন হয়ে থাকে, তবে সেই শর্করা হয়তো আদিম পৃথিবীর রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলোকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছিল। কোটি কোটি বছর পরে যার ফল হিসেবে জন্ম নিয়েছে প্রাণের প্রথম রূপ। অবশ্য এটি এখনো একটি বৈজ্ঞানিক অনুমান।

ভিনগ্রহে প্রাণের খোঁজেও নতুন আশা
এই গবেষণার গুরুত্ব শুধু পৃথিবীর অতীত বোঝার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যদি মহাশূন্যে স্বাভাবিকভাবে এমন জটিল শর্করা তৈরি হতে পারে, তবে অন্য নক্ষত্রের চারপাশে গড়ে ওঠা গ্রহেও জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান পৌঁছে যেতে পারে।
অর্থাৎ, মহাবিশ্বে প্রাণের অস্তিত্ব হয়তো আমাদের ধারণার চেয়েও স্বাভাবিক কোনো বিষয় হতে পারে।

সূত্র: ন্যাচার অ্যাস্ট্রোনমি, দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট