ঢাকা ০৮:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ডিজিটাল শৈশবের প্রহরী

প্রযুক্তির অন্ধকার থেকে শিশুদের রক্ষা করবে কে?

খান এ মামুন
  • সর্বশেষ আপডেট ০৭:০৫:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬
  • / 68

খান এ মামুন

এক সময় ছিল, সন্ধ্যা নামলেই মায়ের কণ্ঠে ভেসে আসত পরিচিত ডাক “বাড়ি ফিরে আয়।” মাঠের খেলা শেষ করে ধুলোমাখা পায়ে শিশুরা ফিরত উঠোনে। গল্পের বই, লাটিম, ঘুড়ি কিংবা বৃষ্টিভেজা বিকেলের স্মৃতি তখন শৈশবের সবচেয়ে উজ্জ্বল রঙ। এখন সেই শৈশবের বড় একটি অংশ আটকে গেছে পাঁচ-ছয় ইঞ্চির একটি পর্দায়। শিশুর প্রথম খেলনা অনেক সময় আর কাঠের গাড়ি নয়, একটি স্মার্টফোন। প্রথম গল্পকার দাদি-নানিও নন, বরং একটি ভিডিও অ্যালগরিদম।

প্রযুক্তি আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। এটি পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। দূরের মানুষকে কাছে এনেছে, জ্ঞানের দুয়ার উন্মুক্ত করেছে, শিক্ষাকে সহজ করেছে। কিন্তু প্রতিটি আলোরই একটি ছায়া থাকে। প্রযুক্তিরও আছে। আর সেই ছায়া সবচেয়ে বেশি পড়ছে আমাদের শিশুদের ওপরÑযারা কৌতূহলী, বিশ্বাসপ্রবণ এবং এখনো জীবনকে প্রশ্ন করার চেয়ে গ্রহণ করতেই বেশি অভ্যস্ত।

সমাজের পরিবর্তনকে কাছ থেকে দেখার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে একটি বিষয় বারবার উপলব্ধি করেছি সময়ের সঙ্গে ঝুঁকির রূপ বদলায়, কিন্তু শিশুদের অসহায়ত্ব বদলায় না। একসময় অভিভাবকেরা সন্তানকে বলতেন, “অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলবে না।” আজ সেই অপরিচিত মানুষটি দরজায় কড়া নাড়ে না; সে প্রবেশ করে একটি স্ক্রিনের ভেতর দিয়ে। শিশুর হাতে থাকা ছোট্ট ডিভাইসটি কখন যে তার সামনে জ্ঞানের জানালা খুলে দেয়, আবার কখন বিপদের দরজাও খুলে দেয়Ñতা বোঝা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

একসময় সন্ধ্যা নামলেই মায়ের ডাকে মাঠের খেলা ফেলে ঘরে ফেরার দিন ছিল। আজ সেই শৈশবের বড় একটি অংশ বন্দি পাঁচ-ছির ইঞ্চির স্ক্রিনে। ছবিটি এআই নির্মিত
একসময় সন্ধ্যা নামলেই মায়ের ডাকে মাঠের খেলা ফেলে ঘরে ফেরার দিন ছিল। আজ সেই শৈশবের বড় একটি অংশ বন্দি পাঁচ-ছির ইঞ্চির স্ক্রিনে। ছবিটি এআই নির্মিত

অদৃশ্য বিপদের নতুন ভূগোল:

ডিজিটাল পৃথিবীতে বিপদ কখনো শব্দ করে আসে না। এখানে কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস থাকে না, কোনো সাইরেন বাজে না। একটি ক্লিক, একটি লিংক, একটি বন্ধুত্বের অনুরোধ কিংবা একটি ভিডিও এভাবেই অনেক সময় শুরু হয় দীর্ঘ এক বিপদের গল্প। অনলাইন গ্রুমিং, সাইবার বুলিং, পরিচয় চুরি, ভুয়া তথ্য, অশ্লীল বা সহিংস কনটেন্ট, ডিজিটাল প্রতারণা- এসব এখন আর কল্পকাহিনি নয়; এগুলো আমাদের সময়ের বাস্তবতা।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিপদের অধিকাংশই ঘটে নীরবে। শিশুটি হয়তো পাশের ঘরেই বসে আছে। বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে সে পড়াশোনা করছে কিংবা কার্টুন দেখছে। অথচ একই সময়ে সে হয়তো এমন একটি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা তার কোমল মনকে দীর্ঘদিনের জন্য ক্ষতবিক্ষত করে দিতে পারে। এই নীরবতাই ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে বড় বিপদ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: আয়না, না মরীচিকা?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। এটি মানুষকে যুক্ত করেছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে, প্রতিভা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। অসংখ্য তরুণ এখান থেকেই শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সৃজনশীলতার নতুন পথ খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি এমন এক পৃথিবী তৈরি করেছে, যেখানে বাস্তবের চেয়ে প্রদর্শনই বড় হয়ে উঠছে। একটি শিশুর মনে যখন প্রতিনিয়ত দেখানো হয় অন্যের নিখুঁত জীবন, নিখুঁত মুখ, নিখুঁত সাফল্য- তখন সে নিজের বাস্তব জীবনকে ছোট করে দেখতে শেখে। সে বুঝতে পারে না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অধিকাংশ জীবনই সম্পাদিত, সাজানো এবং বেছে নেওয়া মুহূর্তের প্রদর্শনী। ধীরে ধীরে তার আত্মবিশ্বাস ক্ষয়ে যায়। লাইক ও অনুসারীর সংখ্যা আত্মমর্যাদার মানদণ্ড হয়ে ওঠে। বাস্তব বন্ধুত্বের জায়গা দখল করে নেয় ভার্চুয়াল পরিচয়। অথচ মানুষ কখনো পর্দার আলোয় নয়, মানুষের চোখের উষ্ণতায় বড় হয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সহকারী, কিন্তু অভিভাবক নয়:

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবসভ্যতার এক অসাধারণ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি। এটি শেখায়, উত্তর দেয়, বিশ্লেষণ করে, নতুন ধারণা তৈরি করতে সাহায্য করে। শিশুদের জন্যও এটি শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। কিন্তু এখানেই একটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন উঠে আসে- শিশুরা কি প্রযুক্তির সঙ্গে কথা বলতে শিখছে, নাকি মানুষের সঙ্গে কথা বলা ভুলে যাচ্ছে? একটি যন্ত্র কখনো মায়ের উদ্বেগ বুঝতে পারে না, বাবার নীরব স্নেহ অনুভব করতে পারে না, শিক্ষকের উৎসাহ কিংবা বন্ধুর কাঁধে মাথা রাখার স্বস্তির বিকল্প হতে পারে না। এআই তথ্য দিতে পারে, কিন্তু মূল্যবোধ শেখাতে পারে না। উত্তর দিতে পারে, কিন্তু বিবেক গড়ে তুলতে পারে না। যুক্তি দিতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার ভাষা জানে না। তাই প্রযুক্তিকে গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু মানুষের স্থান প্রযুক্তিকে দেওয়া যাবে না।

নিরাপত্তার প্রথম বিদ্যালয় পরিবার:
শিশুদের নিরাপত্তা কোনো সফটওয়্যার নিশ্চিত করতে পারে না, যদি পরিবারে বিশ্বাসের সম্পর্ক না থাকে। যে সন্তান ভুল করলে ভয় পায় না, বরং বাবা-মায়ের কাছে এসে বলতে পারে “আজ আমার সঙ্গে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে” সেই সন্তানই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। অভিভাবকদের প্রযুক্তির শত্রু হওয়ার দরকার নেই; বরং সন্তানদের ডিজিটাল পথপ্রদর্শক হতে হবে। নিষেধাজ্ঞা নয়, দরকার সংলাপ। নজরদারি নয়, দরকার আস্থা। নিয়ন্ত্রণ নয়, দরকার সচেতনতা। একটি পরিবারের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হতে পারে- রাতের খাবারের টেবিলে সবাই কিছু সময়ের জন্য মোবাইল ফোন দূরে রেখে একে অন্যের গল্প শোনে।

রাষ্ট্র, বিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব:
ডিজিটাল নিরাপত্তা কেবল পারিবারিক বিষয় নয়; এটি এখন জনস্বার্থের প্রশ্ন। বিদ্যালয়ে ডিজিটাল সাক্ষরতা শিক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। শিশুদের শেখাতে হবে কীভাবে ভুয়া তথ্য শনাক্ত করতে হয়, কীভাবে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখতে হয় এবং কীভাবে অনলাইনে সম্মানজনক আচরণ করতে হয়।

রাষ্ট্রকে শিশুদের তথ্য সুরক্ষায় আরও কার্যকর আইন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও মুনাফার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি তাদের অধিকার।

প্রতিটি শিশুই পৃথিবীতে আসে সীমাহীন সম্ভাবনা নিয়ে। তাদের হাতে আমরা বই তুলে দিই, কলম তুলে দিই, স্বপ্ন তুলে দিই। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিও। কিন্তু প্রযুক্তির সঙ্গে যদি প্রজ্ঞা, মানবিকতা ও নৈতিকতার শিক্ষা না দিই, তবে আমরা হয়তো দক্ষ ব্যবহারকারী তৈরি করব, কিন্তু সচেতন মানুষ গড়তে পারব না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “শিশুরে তারে আপন মনে হতে দিও বড়।” আজকের সময়ে সেই বড় হয়ে ওঠার অর্থ কেবল প্রযুক্তি শেখা নয়; প্রযুক্তির ভেতর থেকেও মানুষ হয়ে ওঠা।
আমাদের সন্তানদের এমন একটি পৃথিবী উপহার দিতে হবে, যেখানে ইন্টারনেট হবে জ্ঞানের সেতু, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হবে সৃজনশীলতার ক্ষেত্র, আর প্রযুক্তি হবে মানবিকতার সহযাত্রী- প্রভু নয়। কারণ, সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি প্রযুক্তির গতিতে নয়; পরিমাপ হয় আমরা আমাদের শিশুদের কতটা নিরাপদ, কতটা মানবিক এবং কতটা আলোকিত ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পারলাম- সেই সক্ষমতায়।

লেখক: খান এ মামুন
আহবায়ক, চাইল্ড গার্ডিয়ান নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (সিজিএনবি)

Ishan1987.khan@gmail.com

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

ডিজিটাল শৈশবের প্রহরী

প্রযুক্তির অন্ধকার থেকে শিশুদের রক্ষা করবে কে?

সর্বশেষ আপডেট ০৭:০৫:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

এক সময় ছিল, সন্ধ্যা নামলেই মায়ের কণ্ঠে ভেসে আসত পরিচিত ডাক “বাড়ি ফিরে আয়।” মাঠের খেলা শেষ করে ধুলোমাখা পায়ে শিশুরা ফিরত উঠোনে। গল্পের বই, লাটিম, ঘুড়ি কিংবা বৃষ্টিভেজা বিকেলের স্মৃতি তখন শৈশবের সবচেয়ে উজ্জ্বল রঙ। এখন সেই শৈশবের বড় একটি অংশ আটকে গেছে পাঁচ-ছয় ইঞ্চির একটি পর্দায়। শিশুর প্রথম খেলনা অনেক সময় আর কাঠের গাড়ি নয়, একটি স্মার্টফোন। প্রথম গল্পকার দাদি-নানিও নন, বরং একটি ভিডিও অ্যালগরিদম।

প্রযুক্তি আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। এটি পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। দূরের মানুষকে কাছে এনেছে, জ্ঞানের দুয়ার উন্মুক্ত করেছে, শিক্ষাকে সহজ করেছে। কিন্তু প্রতিটি আলোরই একটি ছায়া থাকে। প্রযুক্তিরও আছে। আর সেই ছায়া সবচেয়ে বেশি পড়ছে আমাদের শিশুদের ওপরÑযারা কৌতূহলী, বিশ্বাসপ্রবণ এবং এখনো জীবনকে প্রশ্ন করার চেয়ে গ্রহণ করতেই বেশি অভ্যস্ত।

সমাজের পরিবর্তনকে কাছ থেকে দেখার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে একটি বিষয় বারবার উপলব্ধি করেছি সময়ের সঙ্গে ঝুঁকির রূপ বদলায়, কিন্তু শিশুদের অসহায়ত্ব বদলায় না। একসময় অভিভাবকেরা সন্তানকে বলতেন, “অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলবে না।” আজ সেই অপরিচিত মানুষটি দরজায় কড়া নাড়ে না; সে প্রবেশ করে একটি স্ক্রিনের ভেতর দিয়ে। শিশুর হাতে থাকা ছোট্ট ডিভাইসটি কখন যে তার সামনে জ্ঞানের জানালা খুলে দেয়, আবার কখন বিপদের দরজাও খুলে দেয়Ñতা বোঝা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

একসময় সন্ধ্যা নামলেই মায়ের ডাকে মাঠের খেলা ফেলে ঘরে ফেরার দিন ছিল। আজ সেই শৈশবের বড় একটি অংশ বন্দি পাঁচ-ছির ইঞ্চির স্ক্রিনে। ছবিটি এআই নির্মিত
একসময় সন্ধ্যা নামলেই মায়ের ডাকে মাঠের খেলা ফেলে ঘরে ফেরার দিন ছিল। আজ সেই শৈশবের বড় একটি অংশ বন্দি পাঁচ-ছির ইঞ্চির স্ক্রিনে। ছবিটি এআই নির্মিত

অদৃশ্য বিপদের নতুন ভূগোল:

ডিজিটাল পৃথিবীতে বিপদ কখনো শব্দ করে আসে না। এখানে কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস থাকে না, কোনো সাইরেন বাজে না। একটি ক্লিক, একটি লিংক, একটি বন্ধুত্বের অনুরোধ কিংবা একটি ভিডিও এভাবেই অনেক সময় শুরু হয় দীর্ঘ এক বিপদের গল্প। অনলাইন গ্রুমিং, সাইবার বুলিং, পরিচয় চুরি, ভুয়া তথ্য, অশ্লীল বা সহিংস কনটেন্ট, ডিজিটাল প্রতারণা- এসব এখন আর কল্পকাহিনি নয়; এগুলো আমাদের সময়ের বাস্তবতা।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিপদের অধিকাংশই ঘটে নীরবে। শিশুটি হয়তো পাশের ঘরেই বসে আছে। বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে সে পড়াশোনা করছে কিংবা কার্টুন দেখছে। অথচ একই সময়ে সে হয়তো এমন একটি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা তার কোমল মনকে দীর্ঘদিনের জন্য ক্ষতবিক্ষত করে দিতে পারে। এই নীরবতাই ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে বড় বিপদ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: আয়না, না মরীচিকা?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। এটি মানুষকে যুক্ত করেছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে, প্রতিভা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। অসংখ্য তরুণ এখান থেকেই শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সৃজনশীলতার নতুন পথ খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি এমন এক পৃথিবী তৈরি করেছে, যেখানে বাস্তবের চেয়ে প্রদর্শনই বড় হয়ে উঠছে। একটি শিশুর মনে যখন প্রতিনিয়ত দেখানো হয় অন্যের নিখুঁত জীবন, নিখুঁত মুখ, নিখুঁত সাফল্য- তখন সে নিজের বাস্তব জীবনকে ছোট করে দেখতে শেখে। সে বুঝতে পারে না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অধিকাংশ জীবনই সম্পাদিত, সাজানো এবং বেছে নেওয়া মুহূর্তের প্রদর্শনী। ধীরে ধীরে তার আত্মবিশ্বাস ক্ষয়ে যায়। লাইক ও অনুসারীর সংখ্যা আত্মমর্যাদার মানদণ্ড হয়ে ওঠে। বাস্তব বন্ধুত্বের জায়গা দখল করে নেয় ভার্চুয়াল পরিচয়। অথচ মানুষ কখনো পর্দার আলোয় নয়, মানুষের চোখের উষ্ণতায় বড় হয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সহকারী, কিন্তু অভিভাবক নয়:

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবসভ্যতার এক অসাধারণ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি। এটি শেখায়, উত্তর দেয়, বিশ্লেষণ করে, নতুন ধারণা তৈরি করতে সাহায্য করে। শিশুদের জন্যও এটি শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। কিন্তু এখানেই একটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন উঠে আসে- শিশুরা কি প্রযুক্তির সঙ্গে কথা বলতে শিখছে, নাকি মানুষের সঙ্গে কথা বলা ভুলে যাচ্ছে? একটি যন্ত্র কখনো মায়ের উদ্বেগ বুঝতে পারে না, বাবার নীরব স্নেহ অনুভব করতে পারে না, শিক্ষকের উৎসাহ কিংবা বন্ধুর কাঁধে মাথা রাখার স্বস্তির বিকল্প হতে পারে না। এআই তথ্য দিতে পারে, কিন্তু মূল্যবোধ শেখাতে পারে না। উত্তর দিতে পারে, কিন্তু বিবেক গড়ে তুলতে পারে না। যুক্তি দিতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার ভাষা জানে না। তাই প্রযুক্তিকে গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু মানুষের স্থান প্রযুক্তিকে দেওয়া যাবে না।

নিরাপত্তার প্রথম বিদ্যালয় পরিবার:
শিশুদের নিরাপত্তা কোনো সফটওয়্যার নিশ্চিত করতে পারে না, যদি পরিবারে বিশ্বাসের সম্পর্ক না থাকে। যে সন্তান ভুল করলে ভয় পায় না, বরং বাবা-মায়ের কাছে এসে বলতে পারে “আজ আমার সঙ্গে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে” সেই সন্তানই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। অভিভাবকদের প্রযুক্তির শত্রু হওয়ার দরকার নেই; বরং সন্তানদের ডিজিটাল পথপ্রদর্শক হতে হবে। নিষেধাজ্ঞা নয়, দরকার সংলাপ। নজরদারি নয়, দরকার আস্থা। নিয়ন্ত্রণ নয়, দরকার সচেতনতা। একটি পরিবারের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হতে পারে- রাতের খাবারের টেবিলে সবাই কিছু সময়ের জন্য মোবাইল ফোন দূরে রেখে একে অন্যের গল্প শোনে।

রাষ্ট্র, বিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব:
ডিজিটাল নিরাপত্তা কেবল পারিবারিক বিষয় নয়; এটি এখন জনস্বার্থের প্রশ্ন। বিদ্যালয়ে ডিজিটাল সাক্ষরতা শিক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। শিশুদের শেখাতে হবে কীভাবে ভুয়া তথ্য শনাক্ত করতে হয়, কীভাবে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখতে হয় এবং কীভাবে অনলাইনে সম্মানজনক আচরণ করতে হয়।

রাষ্ট্রকে শিশুদের তথ্য সুরক্ষায় আরও কার্যকর আইন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও মুনাফার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি তাদের অধিকার।

প্রতিটি শিশুই পৃথিবীতে আসে সীমাহীন সম্ভাবনা নিয়ে। তাদের হাতে আমরা বই তুলে দিই, কলম তুলে দিই, স্বপ্ন তুলে দিই। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিও। কিন্তু প্রযুক্তির সঙ্গে যদি প্রজ্ঞা, মানবিকতা ও নৈতিকতার শিক্ষা না দিই, তবে আমরা হয়তো দক্ষ ব্যবহারকারী তৈরি করব, কিন্তু সচেতন মানুষ গড়তে পারব না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “শিশুরে তারে আপন মনে হতে দিও বড়।” আজকের সময়ে সেই বড় হয়ে ওঠার অর্থ কেবল প্রযুক্তি শেখা নয়; প্রযুক্তির ভেতর থেকেও মানুষ হয়ে ওঠা।
আমাদের সন্তানদের এমন একটি পৃথিবী উপহার দিতে হবে, যেখানে ইন্টারনেট হবে জ্ঞানের সেতু, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হবে সৃজনশীলতার ক্ষেত্র, আর প্রযুক্তি হবে মানবিকতার সহযাত্রী- প্রভু নয়। কারণ, সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি প্রযুক্তির গতিতে নয়; পরিমাপ হয় আমরা আমাদের শিশুদের কতটা নিরাপদ, কতটা মানবিক এবং কতটা আলোকিত ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পারলাম- সেই সক্ষমতায়।

লেখক: খান এ মামুন
আহবায়ক, চাইল্ড গার্ডিয়ান নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (সিজিএনবি)

Ishan1987.khan@gmail.com