ঢাকা ০৪:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিনে ২০ বার লোডশেডিং, দুর্ভোগে সাধারণ মানুষ

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ০১:১৫:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬
  • / 30

দিনে ২০ বার লোডশেডিং, দুর্ভোগে সাধারণ মানুষ

তীব্র গরমের মধ্যে দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে, আবার কোথাও টানা দুই থেকে তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে না। সবচেয়ে সংকটাপন্ন কিছু এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা।

বিভিন্ন জেলার তথ্য বলছে, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিশু, বয়স্ক, রোগী, শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অটোরিকশাচালক ও শিল্পকারখানার উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্প খাতে বাড়ছে লোকসান, আর পর্যটন এলাকাগুলোতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৭৩ মেগাওয়াট। সে সময় লোডশেডিং করতে হয়েছে ১ হাজার ৮২১ মেগাওয়াট। দুপুরে ঘাটতির পরিমাণ আরও বেশি ছিল ২ হাজার ৬৩৪ মেগাওয়াট। এর আগের রাতেও তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়াই বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ। আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুটে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের চিত্র পাওয়া গেছে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে। সেখানে ৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে মিলছে মাত্র ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ফলে ২৪ ঘণ্টায় গড়ে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন গ্রাহকরা।

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়াতেও একই অবস্থা। ১৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৪ মেগাওয়াট। ফলে দিনে ২০ থেকে ২৫ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা পল্লী বিদ্যুতের সাবস্টেশন ঘেরাও করে বিক্ষোভও করেছেন।

এ ছাড়া যশোরের অভয়নগর, রাজবাড়ী, গোয়ালন্দ, মুন্সীগঞ্জ, ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কুয়াকাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর এক ঘণ্টা লোডশেডিং, আবার কোথাও টানা কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই।

বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিল্প খাত। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্প মালিকরা জানান, অনেক কারখানায় অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। জেনারেটর ব্যবহার করেও স্বাভাবিক উৎপাদন ধরে রাখা যাচ্ছে না, ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।

পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার হোটেল-মোটেলগুলোও সংকটে পড়েছে। হোটেল মালিকদের দাবি, দিনে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অনেক পর্যটক বুকিং বাতিল করছেন।

বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে হাসপাতালগুলোতেও। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটর না থাকায় রোগীরা গরমে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জেনারেটর দীর্ঘদিন ধরে বিকল থাকায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। দিনাজপুরের হাকিমপুরেও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন রোগীরা।

এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে শিক্ষার্থীরাও বিপাকে পড়েছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাতের বেলা মোমবাতি বা চার্জলাইটের আলোয় পড়াশোনা করতে হচ্ছে। অন্যদিকে অটোরিকশা ও ইজিবাইক চালকেরা পর্যাপ্ত চার্জ দিতে না পারায় আয় হারাচ্ছেন।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো বলছে, জাতীয় গ্রিড থেকেই চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বা তারও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনাও আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

দিনে ২০ বার লোডশেডিং, দুর্ভোগে সাধারণ মানুষ

সর্বশেষ আপডেট ০১:১৫:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

তীব্র গরমের মধ্যে দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে, আবার কোথাও টানা দুই থেকে তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে না। সবচেয়ে সংকটাপন্ন কিছু এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা।

বিভিন্ন জেলার তথ্য বলছে, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিশু, বয়স্ক, রোগী, শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অটোরিকশাচালক ও শিল্পকারখানার উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্প খাতে বাড়ছে লোকসান, আর পর্যটন এলাকাগুলোতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৭৩ মেগাওয়াট। সে সময় লোডশেডিং করতে হয়েছে ১ হাজার ৮২১ মেগাওয়াট। দুপুরে ঘাটতির পরিমাণ আরও বেশি ছিল ২ হাজার ৬৩৪ মেগাওয়াট। এর আগের রাতেও তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়াই বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ। আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুটে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের চিত্র পাওয়া গেছে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে। সেখানে ৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে মিলছে মাত্র ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ফলে ২৪ ঘণ্টায় গড়ে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন গ্রাহকরা।

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়াতেও একই অবস্থা। ১৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৪ মেগাওয়াট। ফলে দিনে ২০ থেকে ২৫ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা পল্লী বিদ্যুতের সাবস্টেশন ঘেরাও করে বিক্ষোভও করেছেন।

এ ছাড়া যশোরের অভয়নগর, রাজবাড়ী, গোয়ালন্দ, মুন্সীগঞ্জ, ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কুয়াকাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর এক ঘণ্টা লোডশেডিং, আবার কোথাও টানা কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই।

বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিল্প খাত। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্প মালিকরা জানান, অনেক কারখানায় অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। জেনারেটর ব্যবহার করেও স্বাভাবিক উৎপাদন ধরে রাখা যাচ্ছে না, ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।

পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার হোটেল-মোটেলগুলোও সংকটে পড়েছে। হোটেল মালিকদের দাবি, দিনে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অনেক পর্যটক বুকিং বাতিল করছেন।

বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে হাসপাতালগুলোতেও। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটর না থাকায় রোগীরা গরমে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জেনারেটর দীর্ঘদিন ধরে বিকল থাকায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। দিনাজপুরের হাকিমপুরেও একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন রোগীরা।

এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে শিক্ষার্থীরাও বিপাকে পড়েছেন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাতের বেলা মোমবাতি বা চার্জলাইটের আলোয় পড়াশোনা করতে হচ্ছে। অন্যদিকে অটোরিকশা ও ইজিবাইক চালকেরা পর্যাপ্ত চার্জ দিতে না পারায় আয় হারাচ্ছেন।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো বলছে, জাতীয় গ্রিড থেকেই চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বা তারও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনাও আপাতত দেখা যাচ্ছে না।