ধ্বংসস্তূপ থেকে দাঁড়িয়ে জয়ের মহাকাব্য লিখলেন মেসি
- সর্বশেষ আপডেট ১২:৪২:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬
- / 17
বিদায়ের জন্য কেউই কখনও প্রস্তুত থাকে না। আর লিওনেল মেসি তো আরও কম। ম্যাচ শেষে রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই মেসির চোখ বেয়ে যে অশ্রু গড়িয়ে পড়েছিল, সেটি পরাজয়ের কান্না ছিল না। সেটি ছিল দীর্ঘ চাপ, হতাশা আর আবেগের বিস্ফোরণ। সেই অশ্রু যেন হাজার মাইল দূরে থাকা আর্জেন্টাইন সমর্থকদের চোখেও ঝরেছিল। একসময় মনে হচ্ছিল, হয়তো এটাই তাঁর শেষ বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ। কিন্তু ফুটবল এমন এক খেলা, যার গল্প আগে থেকে লেখা যায় না। আর মেসি? তিনি তো আরও বেশি অবিশ্বাস্য।
৩৯ বছর বয়সেও তিনি আবার প্রমাণ করলেন, বড় মঞ্চে তাঁকে কখনোই হিসাবের বাইরে রাখা যায় না।
ম্যাচ শেষে মেসি বলেন, প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিস করার পর তিনি ভীষণ হতাশ ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস, সেই গোলটি হলে ম্যাচের গতিপথই বদলে যেত। তবে শেষ পর্যন্ত বাঁ পায়ের এক শটে দলকে সমতায় ফেরাতে পারায় তিনি স্বস্তি পেয়েছেন। দলের কঠিন সময়ে অবদান রাখতে পারার আনন্দই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে বড়।
যেমনটি তিনি আগেও বহুবার করেছেন, তেমনি দল যখন সবচেয়ে বেশি বিপদে, তখনই সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তাঁর নিখুঁত ক্রস থেকে আসে এক গোল, নিজের উপস্থিত বুদ্ধিতে আরেকটি গোলের সুযোগ তৈরি করেন, আবার দ্রুত পাল্টা আক্রমণে সতীর্থকে সঠিক নির্দেশনা দিয়ে আরেকটি আক্রমণের সূচনা করেন। সব মিলিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটেই ম্যাচের চিত্র পাল্টে দেন তিনি।

এ কারণেই তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা বলা হয়। কেউ বলেন তিনি মাঠে কম দৌড়ান। কিন্তু ফুটবলে জয়ী হয় সেই দল, যারা সবচেয়ে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে খেলে। আর সেই শিল্পে মেসির সমকক্ষ খুব কমই আছে।
মেসি বলেন, দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও দলের কেউ বিশ্বাস হারায়নি। সবাই জানত, শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। দ্রুত একটি গোল পাওয়ার পর পুরো দলই বিশ্বাস করতে শুরু করে, ম্যাচে ফেরা সম্ভব। সেই বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত জয় এনে দেয়।
এই বিশ্বাসই মেসিকে কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা বানিয়েছে। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের ঘোষণা দিয়েও তিনি ফিরে এসেছিলেন। কারণ তিনি কখনো হাল ছাড়তে শেখেননি।
পরিসংখ্যান একদিন হয়তো বদলে যাবে। গোলের রেকর্ড ভাঙবে, পেনাল্টি মিসের হিসাবও লেখা থাকবে ইতিহাসে। কিন্তু যেটি বদলাবে না, সেটি হলো সতীর্থদের ভালোবাসা। ম্যাচ শেষে সতীর্থরা তাঁকে কাঁধে তুলে উদযাপন করেছেন- যেন কোনো বিজয়ী নায়ককে সম্মান জানানো হচ্ছে।
মেসির মহত্ত্ব শুধু গোল বা অ্যাসিস্টে নয়। তাঁর আসল শক্তি হলো ম্যাচ পড়ার ক্ষমতা। প্রতিপক্ষের রক্ষণ যখন দুর্ভেদ্য হয়ে ওঠে, তখন তিনি খেলার ধরণ বদলে দেন। কখনও ডান প্রান্তে নেমে যান, কখনও ড্রিবলিংয়ে ভেঙে দেন রক্ষণ, কখনও এক মুহূর্তের সিদ্ধান্তেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। ২০ বছরের তরুণের মতো দৌড়াতে না পারলেও, ৩৯ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি পুরো ম্যাচকে নিয়ন্ত্রণ করেন।
মেসির ভাষায়, এই আর্জেন্টিনা দলের আলাদা একটি পরিচয় আছে। প্রতিপক্ষ যে-ই হোক, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা লড়াই করে। এই ম্যাচও সেই মানসিকতার আরেকটি প্রমাণ।
তিনি আরও বলেন, এই দলের অংশ হতে পারাটাই তাঁর কাছে গর্বের। সতীর্থরা শুধু কথায় নয়, কাজেও তাঁকে সম্মান ও ভালোবাসা দেখায়। দীর্ঘদিন একসঙ্গে খেলার ফলে তাদের মধ্যে যে বন্ধন তৈরি হয়েছে, সেটিই এই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি।
শেষ বাঁশির পর মেসির মুখে ছিল প্রশান্তির হাসি। সতীর্থদের আলিঙ্গন করে তিনি যেন অনুভব করছিলেন—আরেকটি অসম্ভবকে সম্ভব করা গেছে।
আর্জেন্টিনা আবারও বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। আর আটলান্টার সেই রাত যেন আরেকবার মনে করিয়ে দিল- মেসির গল্প এখনও শেষ হয়নি। তাঁর জন্য প্রতিটি বড় ম্যাচই যেন নতুন এক পুনর্জন্মের গল্প।





































