পাচারকারী শাস্তি না পেলে একই অপরাধ করবে
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:৩৭:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
- / 48
অল্প বয়সের একটা ভুলে রোজিনা বেগমের জীবনে অন্ধকার নেমে এসেছিল। সকলের সহায়তায় পাল্টে গেছে জীবন। স্বামী সন্তান নিয়ে রোজিনার এখন সুখের সংসার।
২০১৮ সাল। এ বছরে রোজিনা পিরোজপুরের নেসারিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ছিলেন। তেরো বছরের এক কিশোরী ।
একই গ্রামের বেলাল নামে এক যুবক তার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে রোজিনাকে দেখতে আসে। বিয়ের প্রস্তাব দেয়। বেলাল রোজিনার ছবি তার বাবা-মাকে দেখালে তারা জানান, রোজিনাকে তাদের পছন্দ হয়নি । এই বিয়েতে তাদের সম্মতি নেই।
এর কিছুদিন পর রোজিনা তার মায়ের সঙ্গে ঢাকায় আসেন । একটি বাসায় তিন মাস গৃহকর্মীর কাজ করেন। মাকে খালার বাসায় যাওয়ার কথা বলে, একদিন বাসা থেকে বের হন। সেই সুযোগে বেলাল দেখা করে তাকে বিয়ের প্রলোভন দেখায়। তার সঙ্গে যেতে বলে। সরল মনে বেলালের সাথে যেতে রাজি হয়। বেলাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে তাকে ভারতের আগরতলায় নিয়ে যায়।
রোজিনা বেগম (আসল নাম নয়, ২১) বলেন, একদিকে অল্প বয়স। অন্যদিকে ভিন্ন দেশ, অচেনা জায়গা । কিন্তু যাকে বিশ্বাস করে হাত ধরেছিলাম, সে পাশে থাকায় মনে কোনো ভয় কাজ করেনি। কারণ সে বলেছিল, আমাকে বিয়ে করবে। সেখানে প্রায় এক মাস একসঙ্গে বসবাস করি। আনন্দেই দিনগুলো কাটছিল। হঠাৎ জীবনে অন্ধকার নেমে এলো। যেটা আমি কল্পনাও করতে পারি নাই। ত্রিপুরায় বেলাল আমাকে বিক্রি করে গোপনে বাংলাদেশে ফিরে আসে। যাকে বিশ্বাস করে ঘর ছাড়লাম, সে আমার সাথে এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করলো! ত্রিপুরার পুলিশ আমাকে উদ্ধার করে । আমার জায়গা হয় সেখানের একটি সরকারি সহায়তা কেন্দ্র ‘স্বাধার হোমস’ নামে একটি শেল্টার হোমে। সেখানে প্রায় এক বছর তিন মাস থাকি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে আমার মা এবং সমিতির একজন প্রতিনিধি আখাউড়া সীমান্তে যান । প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আমাকে নিয়ে তারা দেশে ফিরেন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির এড. ফেরদৌস নিগার জানান, রোজিনার মা ২০১৮ সালে পল্লবী থানায় বেলালের বিরুদ্ধে অপহরণের একটি মামলা দায়ের করেছিলেন। ভারতের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা তাদের শেল্টার হোমে আমাদের দেশের পাচার হওয়া কয়েকজন নারীর অবস্থানের কথা জানায়। সেখানেই রোজিনার সংবাদ পাই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে বিষয়টি অবগত করি। দুই দেশের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কিছুটা সময় কেটে যায়। ২০১৯ সালের মার্চে ভারতের ত্রিপুরার আগরতলা হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে রোজিনাকে দেশে আনা হয়। বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির সহায়তায় রোজিনাকে একটি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় তিন বছর রাখা হয়।
পূর্ব মামলার পরিপ্রেক্ষিতে অভিযুক্ত বেলালকে গ্রেপ্তার করা হয়। রিমান্ডে নেওয়া হয় এবং পরে কারাগারে পাঠানো হয়।
আসামিপক্ষের লোকজন ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে মামলা তুলে নিতে চাপ সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে রোজিনার পরিবার আপোষ করতে বাধ্য হয়।
মানবপাচারের ঘটনাগুলো প্রায় একইরকম। কখনো বিয়ে, কখনো বেড়ানো, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কিশোরী, নারীদের ভিন্ন দেশে পাচার করা। এমনি আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল ফরিদপুরের কানাইপুরের করিম মিয়ার জুট মিলের কলি নামে একজন কর্মীর সাথে। তার জায়গা হয়েছিল ভারতের কলকাতার পতিতালয়ে।
জুট মিলে কাজের সূত্রে তার পরিচয় হয়েছিল মাকসুদা বেগম নামে আরেক কর্মীর সাথে। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে মাকসুদা তাকে নিজের বাড়িতে বেড়ানোর কথা বলে নিয়ে যায়। সেখান থেকে সুন্দরবনে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে। কিন্তু সুন্দরবনের পরিবর্তে তাকে সীমান্ত পার করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ভারতের কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি পতিতালয়ে বিক্রি করে দেয় তাকে।
কলির মা আর ছোট বোনও একই মিলে চাকরি করতেন। কলি বাড়ি না ফিরলে মাকসুদাকে ফোন করলে তা বন্ধ পায়। একটি অজ্ঞাত নাম্বার থেকে কলির ছোট বোনকে ফোন করে জানানো হয় কলিকে ভারতে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
কলির মতে, মাকসুদা বেগম ও সোনালি পরিকল্পিতভাবে প্রতারণার মাধ্যমে আমাকে ভারতে নিয়ে কলকাতার পতিতালয়ে বিক্রি করেছিল। শুরু হয়েছিল আমার এক নারকীয় জীবন। প্রায় ১০ দিন আমার উপর চলে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন। জোরপূর্বক আমাকে যৌন ব্যবসায় নামানোর চেষ্টা করা হয়। পরবর্তীতে কলকাতা পুলিশের একটি অভিযানে ওই পতিতালয় থেকে আমাকে উদ্ধার করা হয়। আমার জায়গা হয় কলকাতার অল উইমেন ভিকটিম সেফ হোমে । প্রায় এক বছর সেখানে থাকি।
বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির এড. ফেরদৌস নিগার জানান, সেফ হোমের কর্মকর্তারা আমাদের সংস্থার আইনজীবী এড. শামসুন্নাহারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এড. শামসুন্নাহার মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, এর ৬(২) ধারার আওতায় মামলা দায়ের করেন। বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় কলিকে দেশে ফিরিয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কলি জানান, সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত মানব পাচারের অপরাধে আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে।
মানব পাচারে প্রতারণা ও ভয়ংকর ফাঁদ! এই প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হচ্ছে এবারের বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস ২০২৬।
মানব পাচারের শিকার ভুক্তভোগী নারীরা কখনো বিয়ে বা বৈধ কাজ পাওয়ার আশায় অন্য দেশে গিয়ে বুঝতে পারেন, তারা আসলে অবৈধ ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন।
এভাবেই প্রতি বছর হাজার হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু মানব পাচারের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার ও ভয়ংকর ফাঁদে পড়ে জীবন বিপন্ন করছে। রোজিনা বেগমের মতো অনেক ভুক্তভোগী প্রভাবশালীর চাপে সমঝোতা করে ন্যায় বিচার পাওয়া থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। আবার কেউ কেউ সাক্ষ্য -তথ্য প্রমাণাদি আদালতে হাজির করায় ন্যায্য বিচারও পাচ্ছে।
‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ (২০২৬ সনের ৫৫ নং আইন)-এর ৬। মানব পাচারের অপরাধ ও উহার দন্ড এ উল্লেখ রয়েছে : (১) যদি কোনো ব্যক্তি মানব পাচার করেন, তাহা হইলে উহা হইবে অপরাধ।
(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক যাবজ্জীবন কারাদন্ডে কিন্তু অন্যূন ৫ (পাঁচ) বৎসর সশ্রম কারাদন্ডে এবং অন্যূন ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদন্ডে দন্ডনীয় হইবেন।
৭। সংঘবদ্ধ মানব পাচারের অপরাধ ও উহার দন্ড এ উল্লেখ রয়েছে : যদি কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সকল সদস্যের সাধারণ অভিপ্রায় সাধনের উদ্দেশ্যে উক্ত চক্রের একাধিক সদস্য কর্তৃক এই আইনের অধীন কোনো মানব পাচার অপরাধ সংঘটিত হয়, তাহা হইলে উক্ত চক্রের প্রত্যেক সদস্য উক্ত অপরাধ সংঘটনের দায়ে অভিযুক্ত হইবেন এবং অপরাধ সংঘটনকারী প্রত্যেক সদস্য মৃত্যুদন্ডে বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডে কিন্তু অন্যূন ৭ (সাত) বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে এবং অন্যূন ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দন্ডনীয় হইবেন।
এই মানবপাচার প্রতিরোধ ও অভিযুক্তদের শাস্তির আওতায় এনে ভুক্তভোগীদের ন্যায় বিচার প্রাপ্তিতে জাতিসংঘের ইউএনওডিসি ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ, তদন্ত এবং আইনি বিচার প্রক্রিয়া উন্নত করতে সহায়তা করছে। যার মধ্যে রয়েছে জোরপূর্বক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে পাচার, সাইবার-প্রতারণা এবং অর্থ পাচার। এর আওতায় রয়েছে উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান, বিশেষায়িত টাস্কফোর্স বা বিশেষ কার্যদলের জন্য সহায়তা এবং আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও শক্তিশালী করা।
সেসঙ্গে জাতিসংঘের ইউএনওডিসি ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং বিচার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে। এই সংস্থা মনে করছে, পাচার-সংশ্লিষ্ট প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে থাকা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত ও নির্মূল করতে এই প্রচেষ্টাগুলো অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৫ সালের মানব পাচারবিষয়ক প্রতিবেদনে (টিআইপি) মানবপাচার মোকাবিলায় বাংলাদেশকে দ্বিতীয় স্তরে স্থান দেওয়া হয়েছে। দেশের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এবং বিশ্বব্যাপী অভিবাসনের চাপ-সংশ্লিষ্ট চলমান চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও মানব পাচার মোকাবিলায় বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ও টেকসই অগ্রগতির স্বীকৃতি এটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার মানব পাচার নির্মূলের সর্বনিম্ন মান পুরোপুরি পূরণ না করলেও আগের তুলনায় এখন উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চলছে। সরকার পূর্ববর্তী প্রতিবেদনের সময়ের তুলনায় সামগ্রিকভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে বাংলাদেশের অবস্থান এ তালিকায় দ্বিতীয় স্তরে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার ১ হাজার ৪৬২ জন পাচারের শিকারকে শনাক্ত করেছে। তাঁদের মধ্যে ১৪৪ জন যৌনকর্মী হিসেবে পাচারের শিকার হয়েছেন। ২৮৫ জনকে জোরপূর্বক শ্রম দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এ ছাড়া ১ হাজার ৩৩ জন অন্যান্য ধরনের পাচারের শিকার হয়েছেন। পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে একই সময়ে ১ হাজার ২১০ জন ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করার পর সরকার তাঁদের সুরক্ষার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক, সমাজকল্যাণ, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় পরিচালিত কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে এই ভুক্তভোগীদের স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা ও আশ্রয়ের সুযোগও দেওয়া হচ্ছে।
এরপরও ভুক্তভোগী নারীরা সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন মামলা পরিচালনায় আর্থিক সামর্থ্য না থাকা, প্রভাবশালীর চাপ। এ ব্যাপারে সেন্টার ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ইশরাত শামীম জানান, সীমান্তে গার্ড থাকা সত্ত্বেও শিশু, কিশোরী, নারীরা পাচারের শিকার হচ্ছে। কারণ সীমান্তরক্ষীরা জানে, কে পার হচ্ছে। তাদের কোনো সাংকেতিক চিহ্ন দেখালে (যেমন গোলাপ ফুল, চকলেট) সীমান্ত পার হওয়া কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। আগেই টাকাপয়সার লেনদেন হওয়ায় তারাই ব্যবস্থা করে দেয়। এখানে সীমান্তরক্ষীদের কমিটমেন্ট না থাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটছে ।
তিনি আরো বলেন, পাচারকারী গ্রেফতার হওয়ার পরও মামলা পরিচালনার আর্থিক সামর্থ্য না থাকা, প্রভাবশালী অভিযুক্তদের চাপে অনেক ভুক্তভোগী মামলা পরিচালনা করতে ব্যর্থ হন। এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব লিগ্যাল এইড সার্ভিসের পাবলিক প্রসিকিউরের মাধ্যমে মামলা পরিচালনা করা। জনগণের স্বার্থে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ এ যে শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে তাই প্রদান করা। পাচারকারী যতই প্রভাবশালী হোক শাস্তি না পেলে একই অপরাধ বারবার করবে।
































