ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আবার কেন যুদ্ধ শুরু করেছে?
- সর্বশেষ আপডেট ০৬:৪৭:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬
- / 18
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও বড় সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। শান্তি আলোচনার মধ্যেই হামলা-পাল্টা হামলা শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ককেই ভেঙে দেয়নি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, কূটনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেও নতুন অনিশ্চয়তায় ফেলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকট কেবল একটি সামরিক সংঘর্ষ নয়; এটি এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতিটি পদক্ষেপ সরাসরি কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ৬০ দিনের একটি শান্তি প্রক্রিয়ার অধীনে আলোচনায় ছিল। সেই প্রক্রিয়া চলমান অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক বিমান হামলা কার্যত আলোচনার ভিত্তিই নড়বড়ে করে দিয়েছে।
ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাব দিতেই ইরানের সামরিক স্থাপনা, উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নৌ সক্ষমতার ওপর আঘাত হানা হয়েছে। অন্যদিকে তেহরান বলছে, এটি শান্তি সমঝোতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আস্থার সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ। ফলে দুই পক্ষই এখন নিজেদের অবস্থানকে আত্মরক্ষামূলক হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে উত্তেজনার মাত্রা দ্রুত বেড়েছে।
এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের বড় একটি অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যায়। ফলে সেখানে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, শেয়ারবাজারে চাপ তৈরি হয়েছে এবং নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকেছেন বিনিয়োগকারীরা। অর্থাৎ যুদ্ধ এখন আর কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সীমায় আটকে নেই; এর অর্থনৈতিক অভিঘাত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে।
সংকট আরও জটিল হয়েছে রাজনৈতিক বার্তার কারণে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা কার্যত শেষ হয়ে গেছে এবং শান্তি আলোচনা সময়ের অপচয়। এই অবস্থান কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকে আরও দুর্বল করেছে। কারণ, সামরিক অভিযান যতটা গুরুত্বপূর্ণ, অনেক সময় রাজনৈতিক ভাষ্য তার চেয়েও বড় সংকেত বহন করে।
অন্যদিকে ইরানও পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে। এতে সংঘাত এখন আর দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাও সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যে কোনো ভুল হিসাব বা অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া পুরো অঞ্চলকে বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও বিভক্ত। ন্যাটো যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে সমর্থন করলেও উপসাগরীয় দেশগুলো সংযমের আহ্বান জানিয়েছে। তারা বুঝতে পারছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে এই অঞ্চলকেই। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে এর প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন শান্তি প্রক্রিয়া টিকবে কি না। সামরিক উত্তেজনা যত বাড়বে, আলোচনায় ফিরে যাওয়ার রাজনৈতিক পরিবেশ তত সংকুচিত হবে। তবে ইতিহাস বলছে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের খরচ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই পক্ষের জন্যই অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সে কারণে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও শেষ পর্যন্ত কূটনীতির পথেই ফিরে আসার চাপ উভয় পক্ষের ওপর বাড়বে।
এ মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এক অস্বস্তিকর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যুদ্ধ ও আলোচনার মধ্যে যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক হামলা সেটিকে ভেঙে দিয়েছে। এখন পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে অঞ্চলটি নতুন এক দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়াবে, নাকি আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরে আসবে।





































