শেখ হাসিনা ইস্যুতে ঢাকা-দিল্লি টানাপোড়েন
- সর্বশেষ আপডেট ০২:১৩:৫৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬
- / 10
দুই বছর ধরে টানাপোড়েনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত মিলছিল। উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বৃদ্ধি, ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর উদ্যোগ এবং বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় সংলাপের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে আস্থা ফেরার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল। তবে নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, এটি কি সাময়িক রাজনৈতিক অস্বস্তি, নাকি দুই দেশের সম্পর্কে নতুন দীর্ঘমেয়াদি টানাপোড়েনের সূচনা?
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং শেখ হাসিনার ভারত গমনের পর থেকেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিলে তার প্রত্যর্পণ প্রশ্ন, সীমান্ত পরিস্থিতি ও ভিসা কার্যক্রমকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে।
তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ জোরদার হয়। ভারত নতুন হাইকমিশনার নিয়োগ দেয়, উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বিভিন্ন ধরনের ভিসা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগ নিয়েও আলোচনা এগোচ্ছিল।
এই প্রেক্ষাপটে গত বুধবার নয়াদিল্লিতে সাউথ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানান এবং আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি তোলেন। তার এই অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করেই নতুন করে কূটনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়।
এর পরপরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলে, আগাম উদ্বেগ জানানোর পরও ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একই সঙ্গে এটিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অসম্মান হিসেবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানোর দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের সুসম্পর্ক দুই দেশের জনগণই চায়। তবে ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগের নেতাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলতে থাকলে তা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করবে।
সরকারের পাশাপাশি বিএনপির শীর্ষ নেতারাও ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া ভারতের বিষয় হলেও সেখান থেকে তাকে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দাবি করেন, সংবাদ সম্মেলনটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সেখানে দেওয়া বক্তব্যও ভারত সরকারের অবস্থান নয়।
তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ ভারতের এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তাদের মতে, দিল্লির নীরব সম্মতি ছাড়া এমন একটি আয়োজন সম্ভব ছিল না। আবার অন্য বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক অস্বস্তি বাড়লেও সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি, ট্রানজিট ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো কৌশলগত স্বার্থের কারণে সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম।
বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী কয়েক সপ্তাহের কূটনৈতিক তৎপরতাই নির্ধারণ করবে বর্তমান উত্তেজনা সাময়িক থাকবে, নাকি এটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটে রূপ নেবে। তবে শেখ হাসিনাকে ঘিরে নতুন কোনো রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক ঘটনা ঘটলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক আবারও কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।




































