ঢাকা ০১:৫৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘ভাত চুরির’ অপবাদে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা
  • সর্বশেষ আপডেট ১০:০৩:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 60

‘ভাত চুরির’ অপবাদে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা

খুলনা নগরের একটি ছাত্রাবাসে ‘ভাত চুরি করে খাওয়ার’ অপবাদ দিয়ে আজমুল হোসেন (২১) নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে ইসলাম নগর রোডের একটি চারতলা ছাত্রাবাসে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত আজমুল হোসেন চুয়াডাঙ্গার দর্শনার বড় শলুয়া গ্রামের কুতুব উদ্দিনের ছেলে। তিনি খুলনার বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের ছাত্র ছিলেন।

খুলনা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির জানান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলাম নগর রোডের ওই ছাত্রাবাসে শুক্রবার রাতে ঘটনাটি ঘটে। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, চারতলা ভবনটি পুরোপুরি ছাত্রদের মেস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন ছাত্র থাকেন। প্রায় এক বছর আগে আজমুল ভবনের চারতলার ডি-৮ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন। ওই তলায় মোট আটটি কক্ষ রয়েছে। ডি-২ নম্বর কক্ষে থাকেন মেসের ম্যানেজার ও গোপালগঞ্জ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র মেহেদী।

মেসের কয়েকজন ছাত্রের কাছ থেকে স্থানীয়রা জানতে পারেন, শুক্রবার রাতে মেহেদীর রান্না করা ভাত আজমুল খেয়ে ফেলেন। এরপর ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগ তুলে মেহেদীসহ মেসের কয়েকজন ছাত্র এবং কয়েকজন বহিরাগত আজমুলকে ছাদে নিয়ে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরে আশপাশের বাসিন্দারা ছাদ থেকে কিছু পড়ে যাওয়ার মতো জোরে শব্দ শুনতে পান। কিছুক্ষণ পর তারা গলিতে আজমুলকে পড়ে থাকতে দেখেন। মেসের অন্য ছাত্ররা তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর মেসের ছাত্ররা জরুরি বিভাগের সামনে থেকে দ্রুত চলে যান। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসক বলেন, আজমুলের সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাঁর দুই পা-ও ভাঙা ছিল।

মেসের বুয়া ফাতেমা বলেন, এর আগেও আজমুলের বিরুদ্ধে টাকা ও জামাকাপড় চুরির অভিযোগ উঠেছিল। শুক্রবার রাতে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে মেসের কয়েকজন ছাত্র ও বহিরাগত তাকে মারধর করেন। তিনি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তারা তাঁর কথা শোনেননি।

মেসের পেছনের একটি ভবনের এক নারী বাসিন্দা বলেন, রাত পৌনে ১টার দিকে তিনি জোরে একটি শব্দ শুনতে পান। পরে দরজা খুলে বাইরে এসে গলিতে এক যুবককে পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর মেসের কয়েকজন ছাত্র তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

নিহতের বাবা কুতুব উদ্দিন বলেন, তাঁর দুই ছেলের মধ্যে আজমুল বড়। প্রায় এক বছর আগে লেখাপড়ার জন্য সে খুলনায় আসে। ২০২৫ সালে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেনি। মাত্র ১০ দিন আগে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বাড়িতে গিয়েছিল।

কুতুব উদ্দিন বলেন, শুক্রবার দুপুরে বাড়ি থেকে বের হয়ে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আজমুল খুলনায় পৌঁছায়। রাত ৯টার দিকে ফোনে পরিবারের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তখন আজমুল বলেছিল, ‘আমি ভালো আছি। তোমরা আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না।’

তিনি বলেন, রাত ১২টার পর আজমুলের মোবাইল ফোন থেকে অন্য এক যুবক ফোন করেন। ওই যুবক জানান, তাঁর ছেলে ঝামেলা করেছে এবং তাকে পেতে হলে দ্রুত এক লাখ টাকা নিয়ে আসতে হবে। টাকা না দিলে ছেলেকে পাওয়া যাবে না বলেও জানানো হয়।

কুতুব উদ্দিন বলেন, তিনি ওই যুবককে নিজেদের আর্থিক অসচ্ছলতার কথা জানিয়ে এত টাকা কোথায় পাবেন জানতে চান। তখন তাঁকে দ্রুত খুলনায় আসতে বলা হয়। তিনি ট্রেনে আসার কথা জানালে ওই যুবক বলেন, তিনি ট্রেনে, বাসে না বিমানে আসবেন, সেটা তাঁর ব্যাপার। পরে সকালে খুলনায় এসে তিনি জানতে পারেন, তাঁর ছেলে আর বেঁচে নেই।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘আমি কার কাছে এ বিচার দেব? আমরা গরিব মানুষ। বাড়ি অনেক দূরে। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম।’

নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কানাই লাল সরকার বলেন, ১০ সেপ্টেম্বর আজমুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তাঁর সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ খুব বেশি তথ্য জানত না। আজমুলের মা-বাবার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে এবং তাঁদের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

হরিণটানা থানার ওসি মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। আজমুলের বাবা মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।

মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে আইনগতভাবে যা যা করা যায়, আমরা তাই করব।’

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক মো. সালাউদ্দিন বলেন, ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে ঘটেছে। তাই সেখানে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো এখতিয়ার নেই। তবে বিষয়টি জানার পর থেকে পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

‘ভাত চুরির’ অপবাদে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা

সর্বশেষ আপডেট ১০:০৩:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খুলনা নগরের একটি ছাত্রাবাসে ‘ভাত চুরি করে খাওয়ার’ অপবাদ দিয়ে আজমুল হোসেন (২১) নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে ইসলাম নগর রোডের একটি চারতলা ছাত্রাবাসে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত আজমুল হোসেন চুয়াডাঙ্গার দর্শনার বড় শলুয়া গ্রামের কুতুব উদ্দিনের ছেলে। তিনি খুলনার বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের ছাত্র ছিলেন।

খুলনা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির জানান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলাম নগর রোডের ওই ছাত্রাবাসে শুক্রবার রাতে ঘটনাটি ঘটে। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, চারতলা ভবনটি পুরোপুরি ছাত্রদের মেস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন ছাত্র থাকেন। প্রায় এক বছর আগে আজমুল ভবনের চারতলার ডি-৮ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন। ওই তলায় মোট আটটি কক্ষ রয়েছে। ডি-২ নম্বর কক্ষে থাকেন মেসের ম্যানেজার ও গোপালগঞ্জ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র মেহেদী।

মেসের কয়েকজন ছাত্রের কাছ থেকে স্থানীয়রা জানতে পারেন, শুক্রবার রাতে মেহেদীর রান্না করা ভাত আজমুল খেয়ে ফেলেন। এরপর ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগ তুলে মেহেদীসহ মেসের কয়েকজন ছাত্র এবং কয়েকজন বহিরাগত আজমুলকে ছাদে নিয়ে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরে আশপাশের বাসিন্দারা ছাদ থেকে কিছু পড়ে যাওয়ার মতো জোরে শব্দ শুনতে পান। কিছুক্ষণ পর তারা গলিতে আজমুলকে পড়ে থাকতে দেখেন। মেসের অন্য ছাত্ররা তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর মেসের ছাত্ররা জরুরি বিভাগের সামনে থেকে দ্রুত চলে যান। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসক বলেন, আজমুলের সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাঁর দুই পা-ও ভাঙা ছিল।

মেসের বুয়া ফাতেমা বলেন, এর আগেও আজমুলের বিরুদ্ধে টাকা ও জামাকাপড় চুরির অভিযোগ উঠেছিল। শুক্রবার রাতে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে মেসের কয়েকজন ছাত্র ও বহিরাগত তাকে মারধর করেন। তিনি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তারা তাঁর কথা শোনেননি।

মেসের পেছনের একটি ভবনের এক নারী বাসিন্দা বলেন, রাত পৌনে ১টার দিকে তিনি জোরে একটি শব্দ শুনতে পান। পরে দরজা খুলে বাইরে এসে গলিতে এক যুবককে পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর মেসের কয়েকজন ছাত্র তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

নিহতের বাবা কুতুব উদ্দিন বলেন, তাঁর দুই ছেলের মধ্যে আজমুল বড়। প্রায় এক বছর আগে লেখাপড়ার জন্য সে খুলনায় আসে। ২০২৫ সালে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেনি। মাত্র ১০ দিন আগে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বাড়িতে গিয়েছিল।

কুতুব উদ্দিন বলেন, শুক্রবার দুপুরে বাড়ি থেকে বের হয়ে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আজমুল খুলনায় পৌঁছায়। রাত ৯টার দিকে ফোনে পরিবারের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তখন আজমুল বলেছিল, ‘আমি ভালো আছি। তোমরা আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না।’

তিনি বলেন, রাত ১২টার পর আজমুলের মোবাইল ফোন থেকে অন্য এক যুবক ফোন করেন। ওই যুবক জানান, তাঁর ছেলে ঝামেলা করেছে এবং তাকে পেতে হলে দ্রুত এক লাখ টাকা নিয়ে আসতে হবে। টাকা না দিলে ছেলেকে পাওয়া যাবে না বলেও জানানো হয়।

কুতুব উদ্দিন বলেন, তিনি ওই যুবককে নিজেদের আর্থিক অসচ্ছলতার কথা জানিয়ে এত টাকা কোথায় পাবেন জানতে চান। তখন তাঁকে দ্রুত খুলনায় আসতে বলা হয়। তিনি ট্রেনে আসার কথা জানালে ওই যুবক বলেন, তিনি ট্রেনে, বাসে না বিমানে আসবেন, সেটা তাঁর ব্যাপার। পরে সকালে খুলনায় এসে তিনি জানতে পারেন, তাঁর ছেলে আর বেঁচে নেই।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘আমি কার কাছে এ বিচার দেব? আমরা গরিব মানুষ। বাড়ি অনেক দূরে। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম।’

নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কানাই লাল সরকার বলেন, ১০ সেপ্টেম্বর আজমুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তাঁর সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ খুব বেশি তথ্য জানত না। আজমুলের মা-বাবার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে এবং তাঁদের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

হরিণটানা থানার ওসি মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। আজমুলের বাবা মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।

মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে আইনগতভাবে যা যা করা যায়, আমরা তাই করব।’

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক মো. সালাউদ্দিন বলেন, ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে ঘটেছে। তাই সেখানে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো এখতিয়ার নেই। তবে বিষয়টি জানার পর থেকে পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।