ইরানের বিলিয়ন ডলার ছাড়তে সম্মত আমিরাত
- সর্বশেষ আপডেট ১২:৫৪:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
- / 18
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক অগ্রগতির খবর সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থা ‘রয়টার্স’-এর বরাতে জানা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ইরানের জন্য কয়েক বিলিয়ন বা কয়েকশ কোটি ডলারের বিশাল অর্থ ছাড়ের বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের পক্ষ থেকে চালানো বিভিন্ন হামলার পরিপ্রেক্ষিতেই আমিরাত তাদের পূর্ববর্তী কঠোর অবস্থানে পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে তেহরানের চলমান সংঘাতের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতকে লক্ষ্য করে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এই অঞ্চলের পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ নতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রা দেয়।
রয়টার্সের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আমিরাত সরকার ইরানের মোট ১০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের অর্থ ছাড় করতে রাজি হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ সরাসরি হস্তান্তরও করা হয়েছে, যা চলতি সপ্তাহে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ‘কেএএন নিউজ’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনেও প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে আরও কিছু আঞ্চলিক সূত্র দাবি করেছে, এই পুরো আর্থিক প্যাকেজটির পরিমাণ শেষ পর্যন্ত ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত উন্নীত হতে পারে। একাধিক আঞ্চলিক সূত্রের দাবি, এই বিশাল আর্থিক সমঝোতাটি পর্দার আড়ালে কার্যকর হয়েছে একটি বিশেষ শর্তের ভিত্তিতে—আর তা হলো, ইরান আর কখনো আমিরাতের ওপর কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালাবে না।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের মতে, চলমান এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অধীনে বিশ্বের বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে জব্দ বা আটকে থাকা ইরানের তেল বিক্রির কয়েক শত কোটি ডলার ছাড় করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এই অগ্রগতি এমন একটি সময়ে সামনে এলো যখন তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে অবসানের লক্ষ্যে একটি বৃহত্তর ও দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার চূড়ান্ত পর্যায় চলছে।
কূটনৈতিক মহলের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা ইরানের তেল বিক্রির অর্থের কয়েক দশক বিলিয়ন ডলার ছাড়ের বিষয়টিও এই শান্তি আলোচনার মূল টেবিলে রয়েছে। একজন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাও দাবি করেছেন যে, মার্কিন প্রশাসন ইরানের জব্দ করা এই বিপুল সম্পদের একটি অংশ ছাড় করতে গোপনে সম্মত হয়েছে—যদিও ট্রাম্প প্রশাসন আগে প্রকাশ্যে এ ধরনের কোনো চুক্তির অস্তিত্বের কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেছিল।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম নিউজ এজেন্সি’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ মোজতাবা খামেনির প্রধান সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের জব্দ করা সম্পদের একটি বড় অংশ ছাড় করতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছেন। তবে কৌশলগত কারণে তিনি এখনই এটি আন্তর্জাতিক মহলে প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে চান না।’
অন্যদিকে, এই গোপন চুক্তি ও অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রতিবেদনের পর মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে কিছু ‘ভুয়া তথ্য’ ছড়ানো হচ্ছে। তিনি কড়া ভাষায় জানান, ইরান কেবল তখনই বিশ্বমঞ্চে অর্থনৈতিক বা আর্থিক সুবিধা পাবে, যখন তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেওয়া তাদের যাবতীয় দায়বদ্ধতা ও শর্তগুলো অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করবে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নাটকীয় অর্থনৈতিক পদক্ষেপ শুধু ইরান-গালফ (উপসাগরীয় দেশ) সম্পর্কের বরফ গলাবেই না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি বিশাল ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই স্পর্শকাতর বিষয়ে এখনও পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা ইরান সরকারের পক্ষ থেকে অফিশিয়াল বা আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত যৌথ বিবৃতি জারি করা হয়নি। ফলে এই সমঝোতার স্থায়িত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে এখনও কিছু ধোঁয়াশা, অনিশ্চয়তা ও গভীর পর্যবেক্ষণ রয়ে গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান এই বহুপাক্ষিক আলোচনার চূড়ান্ত ফলাফল আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পুরোপুরি স্পষ্ট হতে পারে, যা সামগ্রিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ভবিষ্যৎ গতিপথ এবং মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।





































