ঢাকা ১১:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিবিরের আধিপত্য মানতে নারাজ ছাত্রদল

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:০৮:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬
  • / 85

ছাত্রদল-শিবির

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত কয়েক দিনে অন্তত পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুই সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে হামলা, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনায় একে অপরকে দায়ী করেছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির।

শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্যাম্পাসে দুই সংগঠনের মধ্যে সহাবস্থান ও সহিষ্ণুতার ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিরোধ তীব্র হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব জায়গায় ছাত্রশিবিরের প্রভাব বেশি ছিল, সেখানে এখন নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে ছাত্রদল। এর ফলে দুই সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা।

ডাকসুতে শিবিরের বড় জয়, ক্ষুব্ধ ছাত্রদল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদে ছাত্রশিবির-সমর্থিতদের আধিপত্যকে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে ছাত্রদল। সংগঠনটির অভিযোগ, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, হলের ক্লাব ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মেও শিবির নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে। এতে অন্য ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে বলে দাবি তাদের।

২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতেই জয় পায় শিবির-সমর্থিত প্যানেল। ভিপি, জিএস ও এজিএসসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোও তাদের দখলে যায়। অন্যদিকে ছাত্রদল কোনো পদে জয় পায়নি। ১৮টি হলের ৫৪টি প্রধান পদের মধ্যে ছাত্রদলের প্রার্থীরা জয় পান মাত্র একটিতে।

ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগকে হল থেকে বিতাড়নের পর খুব দ্রুত হলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয় ছাত্রশিবির। ফলে পরবর্তী সময়ে ছাত্রদল ক্যাম্পাসে সংগঠন শক্ত করার পর্যাপ্ত সুযোগ পায়নি।

আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ ছিল না। ছাত্রদলেরও ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ সীমিত ছিল। হল ও ক্যাম্পাসে কার্যত একক নিয়ন্ত্রণ ছিল ছাত্রলীগের।

২০২৪ সালের ১৭ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীরা হলের বিভিন্ন কক্ষ ভাঙচুর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বের করে দেন এবং হলগুলো ছাত্রলীগমুক্ত ঘোষণা করেন। এরপর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করে।

ছাত্রদলের নেতাদের ভাষ্য, ওই সময় শিবিরের অনেক নেতাকর্মী আগে থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থীর পরিচয়ে হলগুলোতে অবস্থান করছিলেন। ফলে ছাত্রলীগের পতনের পর দ্রুতই তারা সাংগঠনিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সক্ষম হন।

পরিচয় গোপনের অভিযোগ ছাত্রদলের

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের নেতাদের অভিযোগ, ছাত্রশিবিরের অনেক নেতাকর্মী নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ না করে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, পাঠচক্র এবং হলভিত্তিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন। বিপরীতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের পরিচয় প্রকাশ্য হওয়ায় বিভিন্ন সংগঠনে তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক আপত্তি তোলা হয়।

তাদের আরও অভিযোগ, বড় ধরনের মিছিল বা প্রকাশ্য শোডাউনের পরিবর্তে পাঠচক্র, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে শিবির ক্যাম্পাসে নিজেদের আদর্শিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রেও সংগঠনটির আর্থিক সক্ষমতা কাজে লাগানো হচ্ছে বলে দাবি ছাত্রদলের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, তারা দীর্ঘ সময় ধরে ছাত্রলীগের নির্যাতন ও একাধিপত্যের বিরুদ্ধে রাজনীতি করেছেন। তার অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর ছাত্রশিবির হলগুলোতে ছদ্মবেশে প্রভাব বিস্তার করেছে এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতেও রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে।

তার ভাষ্য, শিবির ভিন্নমত সহ্য করতে চায় না। সংগঠনটি নিজেদের আচরণ পরিবর্তন না করলে এবং ছাত্রলীগের মতো সংঘাতের রাজনীতি থেকে সরে না এলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অন্যান্য ছাত্র সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও বলেন তিনি।

ছাত্রদলের বিরুদ্ধে শিবিরের পাল্টা অভিযোগ

ছাত্রদলের অভিযোগের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি কাজী আশিকও ছাত্রদলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, ছাত্রদল ক্যাম্পাসে গঠনমূলক ছাত্র রাজনীতির পরিবর্তে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হল দখল ও পেশিশক্তিনির্ভর কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

কাজী আশিকের অভিযোগ, প্রতিপক্ষের ওপর হামলা ও রক্তাক্ত করার মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ছাত্রদল এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, যা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

তিনি বলেন, ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডকে ছাত্রদল আবারও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কোনোভাবেই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব ও ত্রাসের রাজনীতি ফিরে আসতে দেওয়া হবে না।

নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বে অস্থির ক্যাম্পাস

শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। দুই পক্ষই এসব ঘটনায় নিজেদের দায় অস্বীকার করে প্রতিপক্ষকে দায়ী করছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দীর্ঘদিনের একক নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটেছে। এরপর নতুন করে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কোথাও ছাত্রশিবির আগে অবস্থান তৈরি করেছে, আবার কোথাও ছাত্রদল নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আবাসিক হল, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সংগঠন ও সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই প্রতিযোগিতা অনেক ক্ষেত্রেই সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।

শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের এই প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকলে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ আরও ব্যাহত হতে পারে। তাদের মতে, ক্যাম্পাসে সহাবস্থান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও পারস্পরিক সহিষ্ণুতা নিশ্চিত না হলে এক সংগঠনের আধিপত্যের জায়গায় আরেক সংগঠনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

শিবিরের আধিপত্য মানতে নারাজ ছাত্রদল

সর্বশেষ আপডেট ১১:০৮:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত কয়েক দিনে অন্তত পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুই সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে হামলা, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনায় একে অপরকে দায়ী করেছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির।

শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্যাম্পাসে দুই সংগঠনের মধ্যে সহাবস্থান ও সহিষ্ণুতার ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে আবাসিক হল ও ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিরোধ তীব্র হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব জায়গায় ছাত্রশিবিরের প্রভাব বেশি ছিল, সেখানে এখন নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে ছাত্রদল। এর ফলে দুই সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা।

ডাকসুতে শিবিরের বড় জয়, ক্ষুব্ধ ছাত্রদল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদে ছাত্রশিবির-সমর্থিতদের আধিপত্যকে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে ছাত্রদল। সংগঠনটির অভিযোগ, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, হলের ক্লাব ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মেও শিবির নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে। এতে অন্য ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে বলে দাবি তাদের।

২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতেই জয় পায় শিবির-সমর্থিত প্যানেল। ভিপি, জিএস ও এজিএসসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোও তাদের দখলে যায়। অন্যদিকে ছাত্রদল কোনো পদে জয় পায়নি। ১৮টি হলের ৫৪টি প্রধান পদের মধ্যে ছাত্রদলের প্রার্থীরা জয় পান মাত্র একটিতে।

ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগকে হল থেকে বিতাড়নের পর খুব দ্রুত হলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয় ছাত্রশিবির। ফলে পরবর্তী সময়ে ছাত্রদল ক্যাম্পাসে সংগঠন শক্ত করার পর্যাপ্ত সুযোগ পায়নি।

আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ ছিল না। ছাত্রদলেরও ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ সীমিত ছিল। হল ও ক্যাম্পাসে কার্যত একক নিয়ন্ত্রণ ছিল ছাত্রলীগের।

২০২৪ সালের ১৭ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীরা হলের বিভিন্ন কক্ষ ভাঙচুর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বের করে দেন এবং হলগুলো ছাত্রলীগমুক্ত ঘোষণা করেন। এরপর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করে।

ছাত্রদলের নেতাদের ভাষ্য, ওই সময় শিবিরের অনেক নেতাকর্মী আগে থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থীর পরিচয়ে হলগুলোতে অবস্থান করছিলেন। ফলে ছাত্রলীগের পতনের পর দ্রুতই তারা সাংগঠনিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সক্ষম হন।

পরিচয় গোপনের অভিযোগ ছাত্রদলের

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের নেতাদের অভিযোগ, ছাত্রশিবিরের অনেক নেতাকর্মী নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ না করে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, পাঠচক্র এবং হলভিত্তিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন। বিপরীতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের পরিচয় প্রকাশ্য হওয়ায় বিভিন্ন সংগঠনে তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক আপত্তি তোলা হয়।

তাদের আরও অভিযোগ, বড় ধরনের মিছিল বা প্রকাশ্য শোডাউনের পরিবর্তে পাঠচক্র, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে শিবির ক্যাম্পাসে নিজেদের আদর্শিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রেও সংগঠনটির আর্থিক সক্ষমতা কাজে লাগানো হচ্ছে বলে দাবি ছাত্রদলের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, তারা দীর্ঘ সময় ধরে ছাত্রলীগের নির্যাতন ও একাধিপত্যের বিরুদ্ধে রাজনীতি করেছেন। তার অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর ছাত্রশিবির হলগুলোতে ছদ্মবেশে প্রভাব বিস্তার করেছে এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতেও রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে।

তার ভাষ্য, শিবির ভিন্নমত সহ্য করতে চায় না। সংগঠনটি নিজেদের আচরণ পরিবর্তন না করলে এবং ছাত্রলীগের মতো সংঘাতের রাজনীতি থেকে সরে না এলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অন্যান্য ছাত্র সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও বলেন তিনি।

ছাত্রদলের বিরুদ্ধে শিবিরের পাল্টা অভিযোগ

ছাত্রদলের অভিযোগের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি কাজী আশিকও ছাত্রদলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, ছাত্রদল ক্যাম্পাসে গঠনমূলক ছাত্র রাজনীতির পরিবর্তে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হল দখল ও পেশিশক্তিনির্ভর কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

কাজী আশিকের অভিযোগ, প্রতিপক্ষের ওপর হামলা ও রক্তাক্ত করার মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ছাত্রদল এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, যা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

তিনি বলেন, ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডকে ছাত্রদল আবারও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কোনোভাবেই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব ও ত্রাসের রাজনীতি ফিরে আসতে দেওয়া হবে না।

নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বে অস্থির ক্যাম্পাস

শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। দুই পক্ষই এসব ঘটনায় নিজেদের দায় অস্বীকার করে প্রতিপক্ষকে দায়ী করছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দীর্ঘদিনের একক নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটেছে। এরপর নতুন করে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কোথাও ছাত্রশিবির আগে অবস্থান তৈরি করেছে, আবার কোথাও ছাত্রদল নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আবাসিক হল, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সংগঠন ও সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই প্রতিযোগিতা অনেক ক্ষেত্রেই সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।

শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের এই প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকলে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ আরও ব্যাহত হতে পারে। তাদের মতে, ক্যাম্পাসে সহাবস্থান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও পারস্পরিক সহিষ্ণুতা নিশ্চিত না হলে এক সংগঠনের আধিপত্যের জায়গায় আরেক সংগঠনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।