মেট্রোরেলের ‘ট্র্যাপে’ ঢাকা: আইপিডি
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:০১:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 27
ঢাকার মতো শহরে গণপরিবহনের জন্য মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এটিকে একমাত্র পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা না করার আহ্বান জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সংস্থাটি বলেছে, মেট্রোরেল প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণের চাপ কমাতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি প্রকল্প অনুমোদনের আগে এর প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্যতা, লাভ-ক্ষতি এবং বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে যথাযথ বিশ্লেষণের দাবি জানিয়েছে তারা।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) আইপিডি আয়োজিত অনলাইন আলোচনা ‘মেট্রোরেলের ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিকল্পনায় ন্যায্যতা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলা হয়।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, মেট্রোরেলের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ এবং মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় ঢাকাকে ‘মেট্রোরেল ট্র্যাপে’ ফেলেছে। এতে গণপরিবহনের অন্যান্য সম্ভাবনাগুলোও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, ২০০৫ সালে ঢাকার জন্য প্রণীত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) বাস যোগাযোগ, বিআরটি ও পথচারীবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তী সরকারগুলো এসব খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করেনি। ওই পরিকল্পনায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ তিনটি মেট্রোরেলের প্রস্তাব থাকলেও সংশোধিত পরিকল্পনায় ছয়টি মেট্রোরেলের জন্য ১৪০ কিলোমিটারের বেশি নেটওয়ার্কের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মেট্রোরেলের মতো মেগা প্রকল্পে সরকারের আগ্রহ থাকলেও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এত বড় প্রকল্প অনুমোদনের আগে রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে পর্যাপ্ত মতবিনিময়ও হয়নি। অথচ এসব প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ ও ভর্তুকির চাপ শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়বে।
আইপিডির তথ্য অনুযায়ী, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে এমআরটি-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে জাইকার অর্থায়নে এমআরটি-১-এর প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ৩ হাজার ৬৬১ কোটি এবং এমআরটি-৫ (উত্তর) প্রকল্পে ৪ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা। সংস্থাটির মতে, প্রকল্পগুলোর ব্যয়ে এ ধরনের বড় পার্থক্য উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
একই সঙ্গে একনেকের কার্যতালিকায় না থাকা সত্ত্বেও এমআরটি-১ ও এমআরটি-৫ (উত্তর) দ্রুত অনুমোদনের বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইপিডি। সংস্থাটি বলেছে, কমলাপুর-এয়ারপোর্ট-জয়দেবপুর রেলপথে দ্রুতগতির কমিউটার ট্রেন চালুর সম্ভাবনা থাকলেও বিদ্যমান রেলপথটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়নি। অথচ এর সমান্তরালে বিপুল অর্থ ব্যয়ে পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। কুড়িল-পূর্বাচল করিডোরে তুলনামূলক কম ব্যয়ের বিআরটি চালুর সম্ভাবনাও যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
আইপিডির মতে, মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিআরটি, লাইট রেল ট্রানজিট, মনোরেল, কমিউটার রেল, বাস রুট রেশনালাইজেশন ও উন্নত বাস সার্ভিসের মতো বিকল্পগুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনায় ভারসাম্যহীনতা আরও বাড়বে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, দেশে বিপুল অর্থের মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হলেও লোকোমোটিভ সংকটের কারণে একের পর এক লোকাল ও মেইল ট্রেন বন্ধ হচ্ছে। এমনকি ইঞ্জিনের অভাবে মালবাহী ট্রেনও নিয়মিত পরিচালনা করা যাচ্ছে না। তাদের মতে, রেলভিত্তিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এই বৈষম্য ও ভারসাম্যহীনতা দূর করা জরুরি।
অনুষ্ঠানে পরিবহন পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ মুনতাসীর মামুন বলেন, কোথায়, কখন এবং কতদূর পর্যন্ত মেট্রোরেল সম্প্রসারণ করা হবে; এসব বিষয় ২০০৫ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনাতেই উল্লেখ ছিল। তবে মেট্রোর পাশাপাশি কার্যকর বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা ও এর ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন জরুরি।
তিনি বলেন, বর্তমানে মোট ট্রিপের মাত্র প্রায় ১ শতাংশ মেট্রোর মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। অথচ এর অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ভবিষ্যতে পরিকল্পিত সব মেট্রোরেল চালু হলেও সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ট্রিপ এর মাধ্যমে বহন করা সম্ভব হতে পারে। ফলে বাকি যাত্রীদের জন্য কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ড. মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বড় প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র বা কম্পিটিটিভ বিডিং নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, কোনো প্রকল্পে যে ব্যয় অনুমোদন করা হচ্ছে, তা বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক কি না, সেটিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ঢাকায় মেগা প্রকল্প ও বিনিয়োগ বাড়লে শহরের প্রতি মানুষের আকর্ষণও বাড়তে পারে। এতে কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগের জন্য মানুষ ও প্রতিষ্ঠান আরও বেশি ঢাকামুখী হতে পারে। এ ধরনের বিনিয়োগ দেশের অন্যান্য শহরের বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আইপিডির রিসার্চ ফেলো ও স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষক কে এম আসিফ ইকবাল আকাশ বলেন, মেট্রোরেলের মতো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যাপক ব্যয় বৃদ্ধি শুধু আর্থিক সমন্বয়ের বিষয় নয়; এটি প্রকল্প পরিকল্পনা, ব্যয় প্রাক্কলন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে। জনগণের অর্থ ও বৈদেশিক ঋণে পরিচালিত প্রকল্পে বারবার ব্যয় সংশোধনকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা উচিত নয়।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক কনসালট্যান্ট স্থপতি শোয়েব হাসান শ্রাবণ বলেন, এমআরটি-১-এর পরিকল্পনার পাশাপাশি বিদ্যমান পরিবহন অবকাঠামো ব্যবহারের বিকল্পগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। কমলাপুর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত বিদ্যমান রেলপথকে কার্যকর ও দ্রুতগতির গণপরিবহন নেটওয়ার্ক হিসেবে গড়ে তোলা গেলে এমআরটি-১-এর প্রয়োজনীয়তা ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হতো।
মেগা প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। স্টেশনগুলো একসঙ্গে নির্মাণ ও চালু না করে প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে নির্মাণ ও চালুর মাধ্যমে ব্যয় কমানো এবং কার্যকারিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আইপিডির রিসার্চ ফেলো ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরহাদুর রেজা বলেন, দেশের পরিবহননীতিতে বাস, রেল, ফুটপাত, অ-মোটরচালিত যান ও সাইকেলপথকে সমন্বিত করার কথা বলা হলেও বাস্তবে ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনায় মেট্রোরেল সম্প্রসারণই বড় জায়গা দখল করছে।
তিনি বলেন, শহরের ধারণক্ষমতা ও পরিবহন চাহিদা ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। এর ফলে একদিকে যানজট ও নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যা থেকে যাচ্ছে, অন্যদিকে বড় প্রকল্পের ঋণের চাপও বাড়ছে।
আইপিডির সদস্য পরিকল্পনাবিদ ফাহিম আহমেদ মণ্ডল বলেন, বড় প্রকল্প অনুমোদনের সময় এর সামাজিক ও পরিবেশগত ব্যয় যথাযথভাবে হিসাব করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে এসব ‘হিডেন কস্ট’ প্রকল্প মূল্যায়নে দুর্বলভাবে উপস্থাপিত হয়। অন্যদিকে প্রকল্পের আর্থিক লাভ বা সম্ভাব্য মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পরিকল্পনাবিদ মো. সাজিদ ইকবাল বলেন, মেট্রোরেলের কার্যকারিতা শুধু মূল অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে ফিডার সার্ভিস, পথচারীবান্ধব ব্যবস্থা এবং অন্যান্য গণপরিবহনের সমন্বয় জরুরি। এককভাবে মেগা প্রকল্পনির্ভর পরিবহন পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ সজীব বলেন, পরিবহন অবকাঠামোর সঙ্গে ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনার সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। মেট্রোরেলকে কেন্দ্র করে কোনো কোনো এলাকায় অতিরিক্ত উন্নয়ন চাপ তৈরি হচ্ছে। তাই ভবিষ্যৎ প্রকল্পে গ্রোথ কন্ট্রোল, ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আলোচনা শেষে আইপিডির পক্ষ থেকে মেট্রোরেল প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং ব্যয় কমাতে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র নিশ্চিত করা, দরপত্রের যোগ্যতার অপ্রয়োজনীয় শর্ত শিথিল করা, দেশীয় প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং প্রকল্প ব্যয়ের স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের যাচাই।
এ ছাড়া প্রকল্প অনুমোদনের সময় শুধু নির্মাণ ব্যয় নয়, ২০ থেকে ৩০ বছরের পরিচালন ব্যয়, ঋণের কিস্তি, ভর্তুকি ও সম্ভাব্য ভাড়ার হিসাব প্রকাশের দাবি জানানো হয়। প্রকল্পের প্রতিটি প্যাকেজের দরপত্র, চুক্তি, ব্যয়, সময়সীমা ও বাজেট সংশোধনের কারণ জনসম্মুখে প্রকাশের জন্য উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার তৈরিরও সুপারিশ করা হয়েছে।
আইপিডি বলেছে, নতুন কোনো পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণের আগে মেট্রোরেল, বিআরটি, লাইট রেল, কমিউটার রেল বা উন্নত বাসব্যবস্থার মধ্যে স্বাধীন ব্যয়-সুফল বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাস রুট রেশনালাইজেশন, বিদ্যমান রেলপথের সর্বোচ্চ ব্যবহার, মাল্টিমোডাল হাব, পথচারী ও সাইকেলবান্ধব অবকাঠামো এবং ঢাকার বাইরে উপকেন্দ্র গড়ে তুলে বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সংস্থাটি আরও মনে করে, ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে (ডিটিসিএ) আরও কার্যকর ভূমিকা দিতে হবে। নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে কেবল ব্যয়বহুল প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার না দিয়ে স্থানীয় বাস্তবতা, আর্থিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

































