প্রবেশগম্যতা বৃদ্ধিতে উদ্ভাবনী ও ডিজিটাল উদ্যোগ-২
প্রযুক্তিতে সহজ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জীবন
- সর্বশেষ আপডেট ০৮:৩৬:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৫
- / 167
বর্তমান বিশ্বায়নে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা যেমন অনেকটাই সহজ। পাশাপাশি ডিজিটাল উদ্ভাবনীর মাধ্যমে তাদের জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করাও সম্ভব। কয়েকজন উদ্ভাবক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য স্মার্ট স্টিক, শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য উদ্ভাবন করেছেন স্মার্ট হুইল চেয়ার।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য স্মার্ট স্টিক
সিরাজগঞ্জের একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী লিটন। স্মার্ট স্টিকটির সহযোগিতায় হাঁটছিলেন। তিনি খুলনার খালিশপুরের দক্ষিণ কাশিপুর অন্ধ হাফিজিয়া মাদ্রাসা লিল্লাহ বোডিং এতিমখানার একজন বোর্ডার ছিলেন।
স্মার্ট স্টিকটি ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি হাতে নিয়ে চলাচলের সময় চারপাশে কি আছে তা অনুভব করতে পারি। তবে এটি ভাঁজ করার সুবিধা থাকলে ভালো হতো। যখন গন্তব্যে পৌঁছে যাবো ভাঁজ করে রাখা যেতো।
এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে হাফেজ পাশ করা আরেক শিক্ষার্থী মাহফুজও স্মার্ট স্টিকটি বিনামূল্যে পেয়েছেন। তিনিও এটি ব্যবহার করছেন।
তার মতে, এটি ব্যবহারের কারণে আমার চলাচলে প্রতিবন্ধকতা দূর হয়েছে।
আইডিয়ার ( ইনোভেশন ডিজাইন এন্ড এন্টারপ্রেনেরশিপ একাডেমি) আর্থিক সহায়তায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য কম খরচে এই অ্যাসিস্টিং ডিভাইস (স্মার্ট স্টিক) তৈরি করা হয়েছে।
এই স্মার্ট স্টিক খুলনার খালিশপুরের দক্ষিণ কাশিপুর অন্ধ হাফিজিয়া মাদ্রাসা লিল্লাহ বোডিং এতিমখানার ৫ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে প্রদান করেছে খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়।
দক্ষিণ কাশিপুর অন্ধ হাফিজিয়া মাদ্রাসা লিল্লাহ বোডিং এতিমখানার প্রধান শিক্ষক আব্দুর রশিদ মিনা বলেন, স্মার্ট স্টিক পেয়ে পাঁচ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী অনেক উপকৃত হয়েছে। তাদের চলাফেরা সহজতর হয়েছে। তারা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে হাফেজ পাশ করেছেন।
এ ব্যাপারে খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর শেখ সাদী জানালেন, অ্যাসিস্টিং ডিভাইস (স্মার্ট স্টিক) উদ্ভাবন করলেও বিক্রির জন্য এখনো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্মার্ট স্টিকটি তৈরি করে একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ব্যবহার করতে পারেন সেই পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়াটাই ছিল আমাদের কাজ। কিন্তু এটি বিক্রি বা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা আমাদের নেই।
শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য স্মার্ট হুইল চেয়ার
শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছে স্মার্ট হুইল চেয়ার । শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এটি মাথা ও হাতের ইশারায় চালাতে পারবেন। তবে ৬ ঘণ্টা চার্জ দিতে হবে।
খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর শেখ সাদী বলেন, স্মার্ট হুইল চেয়ার তৈরি অনেক ব্যয় সাক্ষেপ হওয়ায় কাউকে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়নি। কোনো কোম্পানি এটি বিক্রি করতে চাইলে কমপক্ষে ৭০ হাজার টাকা বিক্রি করতে পারবে। আমরা নিজেরা তৈরি করায় এর চেয়ে কম খরচ পড়েছে। পুরোটাই স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে।
তবে আশার আলো দেখালেন তিনি।
তিনি বললেন, কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে (কোলাবেরশনে) যৌথভাবে এলে আমরা প্রযুক্তিগতভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য যে জিনিসগুলো দরকার আমরা সমস্ত (গবেষণা পদ্ধতি, উন্নয়নের ধারা, কিভাবে বানাতে হবে, তৈরি এবং পূণ বিকশিত করা ইত্যাদি) দিতে পারবো।
প্রফেসর শেখ সাদী আরো বলেন, এই ধাপটা আমাদের বাকি রয়েছে। কোনো ডেভেলপ, মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানি এগিয়ে এলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে এগুব। এছাড়াও যদি কোনো কোম্পানি বাংলাদেশি এই পণ্য গুলো ব্যবহার আকারে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পারে তাহলে হুইল চেয়ারের একটি বাজার তৈরি হবে। তবে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে কোলাবেরশনে বাজার তৈরি করতে হবে।
অন্যদিকে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য স্মার্ট হুইল চেয়ার তৈরি করতে গিয়ে আর্থিক সমস্যার কারণে কাজটি সম্পন্ন করতে পারেননি। আইডিয়া প্রকল্পের আর্থিক সহায়তায় এটি তৈরিতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন আইওটি এনাবেল্ড গেমটার কন্ট্রোল হুইল চেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা মো. রিপন ইসলাম ।
মো. রিপন ইসলামের মতে, ২০২২ সালে কম খরচে এআই ভিত্তিক আঙ্গুলের ইশারা নিয়ন্ত্রিত স্মার্ট হুইল চেয়ার উদ্ভাবনের কাজটা শুরু করি। জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনাও হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কাছে হুইল চেয়ারটি নিয়ে যাওয়ার জন্য আরো কয়েকটি ফোল্ডার দরকার। আর্থিক সমস্যা ছাড়াও বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের কারণে কাজটি স্থগিত হয়ে রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, আমাদের ছাত্ররা এটি নিয়ে কাজ করছে। আরো আর্থিক সহায়তা পেলে এটি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বেসরকারি সংস্থাগুলোকে কমপক্ষে ৫০ থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হয় জানালেন জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের উপসচিব, পরিচালক ( পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ফজলে ছিদ্দীক মোঃ ইয়াহিয়া।
জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন অনুদানের পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাবও করেছে। অনলাইনে আবেদনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিভিন্ন ডিভাইস প্রদানের চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবন দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে উদ্ভাবনগুলোতে আর্থিক সহায়তা প্রদানে কোনো তহবিল নেই। প্রতিবন্ধিতার ১২ ধরনের ক্যাটাগরিতে শিক্ষা, সক্ষমতার ভিত্তিতে যারা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কমসংস্থানে অন্তর্ভূক্তির উল্লেখ রয়েছে।
তিনি বলেন, ইআরসিপিএইচতে ২০১৭ সাল থেকে শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কৃত্রিম পা সংযোজন ও প্রশিক্ষণ প্রদান করছে । কৃত্রিম হাত পাসহ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিভিন্ন সহায়ক উপকরণ প্রস্তুত করা হয়।
আইডিয়া প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও যুগ্মসচিব মুর্তুজা জুলকার নাঈন নোমান বলেন, স্টার্টআপদের কল্যাণে আইডিয়া প্রকল্প সবসময়ই কাজ করে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন খাতের প্রায় ৪ শতাধিক স্টার্টআপকে অনুদানের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের সহায়ক স্টার্টআপও রয়েছে। যেমন: স্মার্ট হুইলচেয়ার, স্মার্ট হোয়াইট কেন, দৃষ্টি, এআই ল্যাব বাংলাদেশ ও ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো উদ্ভাবন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে।
তিনি আরও বলেন যে, আইডিয়া প্রকল্প সবসময়ই এ ধরনের উদ্যোগকে উৎসাহিত করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তাদের পাশে থাকবে। এসব স্টার্টআপের পণ্য একদিন বিশ্বব্যাপী সমাধান হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের উদ্ভাবন ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হবে এবং দেশের গর্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। আইডিয়া প্রকল্প ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্টার্টআপদের প্রি-সীড স্টেজে অনুদান দিয়ে থাকে। তাই, সকল উদ্ভাবক ও স্টার্টআপকে আবেদনের জন্য উৎসাহিত করেন। আবেদন এর জন্য তিনি প্রকল্পের ওয়েব সাইট (idea.gov.bd) করার পরামর্শ প্রদান করেন।
মুর্তুজা জুলকার নাঈন নোমান বলেন, আমাদের লক্ষ্য ছিল, আমরা এমন কিছু উদ্ভাবনকে সহায়তা করবো, যা দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে। সরকারের একটি উদ্দেশ্য থাকে বেশির ভাগ জনগণকে সেবা দেওয়া। এর মধ্যেও আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে উদ্ভাবনী পণ্য গুলোর গবেষণার ক্ষেত্রে অনুদান দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
সমাজসেবা অধিদপ্তর অতিরিক্ত পরিচালক ( সামাজিক নিরাপত্তা -১) ফরিদ আহমেদ মোল্লার মতে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবন মানোন্নয়নে আমাদের উদ্ভাবনী বিষয়ক কোনো উদ্যোগ নেই।
































