ঢাকা ০৮:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উপকূলীয় নারী কৃষকরা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিতে উপেক্ষিত

রীতা ভৌমিক, বরগুনা, পাথরঘাটা থেকে ফিরে
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:৩৭:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
  • / 142

ছবি :  বরগুনার হোগলাপাশার বিশ্বখালের নোনা পানিতে নষ্ট হয়েছে ফসল

বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকা বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা । এপ্রিল-মে মাসে এখানকার বাতাসে মিষ্টি আলু, চীনাবাদাম, মুগ ডাল, সূর্যমুখী ফুলের গন্ধের সুবাস ভেসে বেড়ায়। কিন্তু চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল অতি জোয়ারে  নোনা পানিতে তলিয়ে  যাওয়া ফসলের পচা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এভাবে প্রতি বছর নোনা পানি প্রবেশের কারণে ক্ষতি হচ্ছে পাথরঘাটা সদর, ৩ নং চরদুয়ানি, কাঁঠালতলী,  ৩ নং চরদুয়ানি ও ৬ নং কাকচিড়া চার ইউনিয়নের কয়েক হাজার হেক্টর জমির ফসল। নারী কৃষকরা ঋণ নিয়ে জমিতে ফসল লাগিয়ে নোনা পানির কারণে তা ঘরে তুলতে পারেননি। একদিকে বাড়ছে তাদের ঋণের বোঝা। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা উপেক্ষিত।

নোনা পানির সাথে চিরন্তন লড়াই নারীদের

বৈশাখে বিশ্ব খাল দিয়ে সাগরের নোনা পানি  জমিতে  প্রবেশ করায় ৩ নং চরদুয়ানির হোগলাপাশা গ্রামের কৃষকরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

এই খাল পাড়ের এক কানি জমিতে মিষ্টি আলু, চীনাবাদাম, সূর্যমুখী ফুলের চাষ করেছেন রুমি আক্তার। কৃষি অফিস থেকে পেয়েছিলেন চীনাবাদাম, সূর্যমুখীর আটি । পৌষ, মাঘ মাসে ১০ হাজার টাকায় মানের ৭/৮ কাঠা জমিতে  সেই আটি লাগিয়েছেন।  শ্রমিক খরচ কমাতে ভোরে জমিতে কাজে  লেগে যেতেন। আকস্মিক জোয়ারের নোনা পানিতে ফসল তলিয়ে গেছে তার। তলিয়ে যাওয়া ফসল তুলতে কয়েকজন নারী শ্রমিক নিয়েছেন তিনি।

মিষ্টি আলুর গাছ তুলে দেখিয়ে রুমি আক্তার (৩৫) বললেন, এই দেহেন,  নোনা পানি লাগনে মিঠা আলু নষ্ট হইয়া গেছে। একহান মিঠা আলু পাই নাই। চীনাবাদামের খোসা ভেঙ্গে বললেন, দেহেন বাদাম নাই। বাদাম হইলে নিজের হাতে তো কিছু টাকা আইতো। ভূট্টা হইলে তো কয়টা খাইতে পারতাম। পুষ্টি হইতো। সূর্যমুখী হওয়ায় তেলটা তো আর কিনতে হইত না। কিন্তু সব শেষ, ফসল তোলার আগে নোনা পানি ঠেলা দিলে সব তলাইয়া গেছে। পানি সইর‌্যা গেলে দেহি ফসল পইচ্যা  গেছে। নোনা পানির চাপে বাদাম, সূর্যমুখী ফুল, মিঠা আলু নষ্ট হইয়া গেছে। নোনা পানির কারণে ধরা খাইয়া গেছি।

তিনি আরো বলেন, নোনা পানি যাতে মাঠে যাইতে না পারে বাঁন্ধ দিয়া উঁচু কইর‌্যা দিছিলিাম। যখন পানি চাপ  দেয় বাইন্ধ্যা দিলেও কুলায় না। খালের পাড়ে মাঠ, রাইতে মাঠে নোনা পানি উইঠ্যা গেছে। রাইত বারোটায় মানুষ নিয়া আইস্যা বাঁন্ধ  কাইট্যা পানি সরাইছি। পানির চাপ পড়বে , দেখা দিলে কড়া থাকলেও ফসল উঠাইয়্যায় ফালাই ভয়েতে। এইবার হেই সুযোগটাও পাই নাই। কিন্তু ফসল ঘরে তুলতে না পারায় শ্রমের মজুরি, নিজের শ্রম, চাষের খরচ সবই পানিতে গেছে ।

মিষ্টি আলু, চীনাবাদাম তুলছেন নারী কৃষকরা
ছবি : মিষ্টি আলু, চীনাবাদাম তুলছেন নারী কৃষকরা

আকস্মিক এই জোয়ারে নোনা পানি ঢুকে জমির ফসল নষ্ট হয়েছে হোগলাপাশার আরেক কৃষক মাহমুদা আক্তার লিজার। মুগ ডাল, মিষ্টি আলু, ভুট্টার চাষ করেছিলেন তিনি। কড়া রোদে বাড়ির ছাদে মুগ ডাল শুকাচ্ছিলেন তিনি।  সেখানে কথা হয় তার সাথে। মাহমুদা আক্তার লিজার (৩৩) মতে, রোজা রাইখ্যা মিঠা আলু জমিতে নিড়ানি দিছি। বীজ লাগাইছি। আগাছা পরিষ্কার করছি। এক জমিতে এক মণ আলু হইতো। সব নোনা পানিতে পইচ্যা গেলো। একবার মুগ ডাইল লাগাইলে তিনবার তুলতে পারতাম। সেইট্যা একবার তুলতে পারছি।

তিনি আরো বললেন, এক মণ মুগ ডাইল তুলতে ১২/১৪ দিন লাগে। রোইদে পুইড়া একটা একটা কইর‌্যা ডাইল তুলছি। আবার রোইদে তা শুকাইয়া পিটাইয়া বাইর করতাছি। এত কষ্ট কইর‌্যা ফলাইয়াও আমরা খাইতে পারি না। অভাবের কারণে বিক্রি কইর‌্যা দিতে হইবো। এক মণ ডাইল বিক্রি হইব ৪ হাজার টাকা ! এই টাকা দিয়া কি হইব!

রোদে ছাদে মুগ ডাল শুকাচ্ছেন মাহমুদা আক্তার লিজা
ছবি :  রোদে ছাদে মুগ ডাল শুকাচ্ছেন মাহমুদা আক্তার লিজা

উপকূলের নারী কৃষকরা নোনা পানির সাথে এভাবেই লড়াই করছি।  জমিতে নোনা পানি  ঢোকা বন্ধে সরকারি কোনো উদ্যোগ নাই আক্ষেপের সুরে বললেন মাহমুদা আক্তার লিজা। রুমি আক্তার, মাহমুদা আক্তার লিজা, সবিতা, লিপিকা, বেবি আক্তার, সুরমা, তাজিনুর বেগমের মতো গ্রামের অন্য  নারী কৃষকদের সাথেও কথা হলো। তারা সবাই  একই পরিস্থিতির শিকার। একই আর্তি জানালেন তারা। তাদের অনেকেই সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে ফসল লাগিয়েছিলেন। কীভাবে তারা এই ক্ষতি সামলাবেন, সেই দুশ্চিন্তায় ঘুম হয় না তাদের। আজানের সাথে সাথে নামাজ পড়ে ঘরসংসারের কাজ সেরে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই জমিতে কাজে নামেন। রাত বারোটা পর্যন্ত এই ফসল, সংসারের কাজে সময় দেন। এত কষ্টের  ফসল ঘরে তুলতে পারেননি তারা।

অন্যদিকে দু-একজনের সামান্য  জমি থাকলেও ফসল উৎপাদন, বিক্রি বা আয়ের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না। আবার জমির দলিল না থাকায় কৃষিঋণ ও বিনা মূল্যের কৃষি উপকরণও পান না তারা। কেউ কেউ পারিবারিক জমিতে নিয়মিত খাটেন, অথচ লাভের অর্থ পান না। তাদের একটাই দাবি,  জমিতে লবণাক্ততার কারণে ফসল মারা যায়। সরকার যেন মিঠা পানির ব্যবস্থা করে।

কৃষিখাতে মজুরি বৈষম্য

২৮ এপ্রিল রাতে বাঁধ ভেঙ্গে জমিতে নোনা পানি ঢুকলে বাঁধ কেটে তা সরিয়েছিলেন নারী কৃষক-শ্রমিকরাই। জমি নিড়ানি, চারা রোপন, নোনা পানিতে  ফসল তোলার কাজটিও করেছিলেন তারা। এই কাজে পুরুষ শ্রমিকদের সংখ্যা ছিল নগন্য। পাথরঘাটার গীতা রানী রায়, সন্ধ্যা রানী মালাকার, সেলিনা জমি নিড়ানি, চারা রোপন, এই বাঁধ কাটা, ফসল তোলার কাজ করেছিলেন অর্ধেক মজুরিতে। কারণ তাদের নিজের জমি নেই। অন্যের জমিতে বৈশাখ থেকে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন ।

গীতা রানী রায়ের (৪৫) মতে, পুরুষ কৃষি শ্রমিকের তুলনায় নারী কৃষি শ্রমিকের মজুরি অনেক কম। কম মজুরিতেই কাজ করি। তারমধ্যে বৈশাখে সাগরের  নোনা পানি বিশ্ব খাল দিয়ে জমিতে ঢুকে। ফসলে পচন ধরায় এখন আর কম মজুরিতেও কাজ নাই। কিভাবে দিন যাইব জানি না! একই কথা বললেন সন্ধ্যা রানী মালাকার, সেলিনাও ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর শ্রমশক্তি জরিপ (এলএফএস) ২০২৪-এর ফলাফলে দেখা যায়, দেশব্যাপী কৃষি শ্রমে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি। কিন্তু তারা কম মজুরিতে কাজ করে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

কৃষিখাতে  নারী কৃষি শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য সম্পর্কে বরগুনার খামারবাড়ির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, আগের থেকে কৃষিখাতে নারী-পুরুষের মজুরিতেও পরিবর্তন হয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে নারীর কাজটাই বেশি। পুরুষ শুধু মাঠের কাজটাই করেন। নারী কৃষকরা মাঠ ও হারভেস্ট এর পুরো কাজটাই করেন। নারীরা মাঠে ধান লাগাচ্ছেন। যে কোনো ফসল মাঠ থেকে তুলে বাড়ি পর্যন্ত আনা ঝাড়াই-মাড়াই, পরিষ্কার , প্যাকিং সবই নারী কৃষকরা করেন। একটা সময় নারীদের কাজকে মূল্যায়ন করা হতো না। এখন কিছুটা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এজন্য দরকার গ্রুপ ভিত্তিক সচেতনতা।

বঞ্চনার শিকার নারী কৃষকরা

কৃষিতে এতো শ্রম দেওয়ার পরও নারী কৃষকরা শুধু শ্রম মজুরি থেকেই নয়, কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ ও সরকারি ভর্তুকি-প্রণোদনা পাওয়ার সুযোগ সহ বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি থেকেও বাদ পড়েন।

শ্রমশক্তি জরিপ (এলএফএস) ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী,  দেশে ৩০.১ লক্ষ নারী অবৈতনিক পারিবারিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। শ্রম আর অধিকার না পাওয়ার পরও প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কৃষিতে নারীর উপস্থিতি বাড়ছে, বিপরীতে কমছে পুরুষের সংখ্যা। কৃষিতে এতো শ্রম দেবার পরও নারীদের কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারে কোনো পুরুষ সদস্য না থাকলে নারীদের কৃষক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস জানান, কৃষকরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, মহাজনদের কাছ থেকে সুদে ঋণ নিয়ে ফসল লাগায়। সেই ফসলটা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের কষ্টের শেষ থাকে না। এই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা ও ক্ষতির পরিমাণ হেড অফিসে পাঠানো হয়েছে। ভবিষ্যতে সরকার যদি কোনো প্রনোদনা কর্মসূচী দেয় তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত নারী কৃষকদের মাঝে বিতরণের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

নেই জমি, ঋণ, কৃষক কার্ড

একই ইউনিয়নের দক্ষিণ জ্ঞানপাড়া গ্রামের তাজিনুর বেগম (৪৮) ।

বাড়ির পাশের আঙ্গিনায় ১২ কাঠা জমিতে বেড, কান্দি, ড্রাম পদ্ধতিতে ঢেঁড়শ, চিচিঙ্গা, বেগুন, কাঁচামরিচ, পুঁই শাক ইত্যাদি সবজি চাষ করছেন । পুকুরে ধরে রাখা বৃষ্টির পানি চারা গাছে দিচ্ছিলেন । পুকুরের পানি শুকিয়ে গেলে চাষাবাদে বিপত্তি শুরু হয়। দূর থেকে পানি আনেন। জমিতে পানি দিবেন মোটর কেনার সামর্থ্য নেই তার স্বামীর।

বাড়ির আঙিনায় লাগানো শাকসবজির পরিচর্যা করছেন তাজিনুর বেগম
ছবি : বাড়ির আঙিনায় লাগানো শাকসবজির পরিচর্যা করছেন তাজিনুর বেগম

শুধু গাছে পানি দেওয়ায়ই নয়, বীজ সংরক্ষণ, চারা রোপন, আগাছা পরিষ্কার, প্রক্রিয়াজাতসহ সব কাজ এতো কষ্ট করেও ফসল বিক্রির টাকা তিনি পান না। কারণ জমি তার স্বামীর। তিনি বললেন, ‘শ্বশুরের জমি । এখন স্বামীর নামে। স্বামী, ছেলেমেয়ে তো আমারই। তাই সংসারের জন্য চাষাবাদ করি। নিজের নামে জমি না থাকায়, নারী কৃষকরা সম্পত্তির অধিকার থেকে যেমন বঞ্চিত হন।  তেমনি সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়েমা হক বিদিশা বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী কৃষকদের একটি বড় অংশ কৃষি খাতে বেতনহীন কাজ করেন। তাদের অংশগ্রহণের কারণে পরিবারে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ছে । কিন্তু এই কাজের জন্য তাদের পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না।

হোগলাপাশায়  বোরো জমিতে আগাছা বাছাই করছিলেন নারী-পুরুষ উভয় কৃষক। তাদেরই একজন মো. জাকির হোসেন (৫৫)। তিনি বলেন, পুরুষ কৃষকদের সাথে নারীরাও ধান রোপন করে, বীজ বপন করে। ধান বাছাই করে। আমরা নারী-পুরুষ সমানে সমানে কাজ করি। অথচ তারা টাকা পয়সা পায় না। আমাগো নারীরা যেভাবে কৃষিকাজ করে তাদের কৃষক কার্ড পাওয়া উচিত।

বোরো জমিতে আগাছা বাছাই করছেন নারী-পুরুষ কৃষক একসাথে
ছবি : বোরো জমিতে আগাছা বাছাই করছেন নারী-পুরুষ কৃষক একসাথে

পড়ন্ত বিকেলে সড়কের পাশে স্ত্রীসহ বালতিতে মুগ ডাল তুলছিলেন ষাটর্ধ্বো ইসলাম খান ।  সংসারের কাজ সামলিয়ে স্ত্রী তাকে মুগ ডাল তুলে সহযোগিতা করছিলেন। কিন্তু  ফসল বিক্রির অর্থে তার ভাগ নেই।

মুগ ডাল তুলছেন নারী-পুরুষ কৃষক
ছবি : মুগ ডাল তুলছেন নারী-পুরুষ কৃষক

তার স্ত্রীর নামে কৃষক কার্ড হওয়া উচিত কিনা জিজ্ঞেস করতেই তিনি জানালেন, কৃষক কার্ড আমার নামে হইব। স্ত্রীর নামে কেন! কৃষি তথ্য পরিষেবা (এআইএস)-এর তথ্যে দেখা যায়, কর্মসূচিটির প্রাক-পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ‘কৃষক কার্ড’-এর অধিকাংশ প্রাপকই পুরুষ। কারণ ১০টি জেলার ১১টি উপজেলায় জরিপকৃত ২২ হাজার ৬১ জন কৃষকের মধ্যে নারীদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫.০৫ শতাংশ।

নারী কৃষকদের কার্ড প্রদান প্রসঙ্গে কৃষিবিদ রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস জানান, কৃষক কার্ড আমাদের এখানে এখনো চালু হয়নি। প্রকৃত যে কৃষক তিনি কৃষক কার্ড পাবেন। পরিবারের প্রধান পুরুষ না থাকলে, নারী কৃষক থাকলে অগ্রাধিকার পাবেন। তবে নারী কৃষকদের কার্ড দেওয়াকে পুরুষ কৃষক, সাধারণ জনগণ কিভাবে নিবে এটা নিয়েও ভাবনার বিষয় আছে!

একটু সহায়তায় আসতে পারে পরিবর্তন

উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই সমস্যা আরও তীব্রতর হচ্ছে। ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল থেকে ৩ মে অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে ৩ হাজার ১৭৭.৮৭ হেক্টর  অর্থাৎ ৪.৫০২ শতাংশ । আর্থিকভাবে ফসলের ক্ষতি হয়েছে ২ হাজার ৬ ৭৬ লক্ষ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ৪৩ হাজার ৬৪০ জন। এই সমস্যা নিরসনে দরকার সরকারি সহযোগিতা।

এ ব্যাপারে কৃষিবিদ রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, ২৮ এপ্রিলের অতিবৃষ্টিতে এই এলাকার মুগ ডাল,  চীনাবাদাম, কাঁচামরিচ, মিষ্টি আলু ও বোরো ধানের  ক্ষতি হয়েছে। এবার ৪৮ হাজার ৭৬০ হাজার হেক্টর জমিতে মুগ ডাল চাষ হয়েছে।  ৩ হাজার ৬০ হেক্টর জমির মুগ ডালের ক্ষতি হয়েছে। ৩৫ হাজার ২১৪ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ৬৮০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। কোথাও কোথাও একবার মুগ অর্থাৎ ফসল তুলতে পারলেও অধিকাংশ জায়গায় তুলতেই পারেননি কৃষকরা। নারী কৃষকরা মাঠে জমা  নোনা পানিতে নেমে মুগ ডাল তুলেছেন। বাড়িতে নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করছেন। তারা অনেক পরিশ্রম ও কষ্ট করছেন।

পাশাপাশি লবন সহনশীল জাতের চাষাবাদের প্রতিও জোর দেন তিনি। তিনি বলেন, বিভিন্ন  ফসলের লবন সহনশীল জাত আছে।  ধান, সবজির জাতগুলো কৃষকদের মাঝে বিভিন্ন মৌসুমে বিতরণ করা হয়। এছাড়াও  নোনা পানি  ক্ষেতে ঢোকার আগে যদি ফসলটা হারভেস্ট করা যায়, সেই ভ্যারাইটিস চাষাবাদ করতে হবে। এটা সময়সাপেক্ষ। একবার বললেই কৃষকের মধ্যে সচেতনতা আসবে না। কিছু কৃষক নিয়ে পরীক্ষা করেন। যদি দেখে  আর্থিক লাভবান হচ্ছেন, দ্বিতীয় বছর থেকে ওরা সেই প্রযুক্তি গ্রহণ করেন।

এরপরও নোনা পানিতে ফসলের ক্ষতি , মানুষের ক্ষতি -শারীরিক-মানসিক যেভাবেই হোক সমন্বয় কিভাবে রাখতে পারবো সেটা নিয়েই কাজ করছি। উপকূলীয় নারী কৃষকদের লবণাক্ততার প্রভাব থেকে মুক্ত করতে সরকার কি ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে এ ব্যাপারে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, উপকূলীয় নারী কৃষকদের উন্নয়নে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার আওতায় সাতক্ষীরা ও খুলনার প্রকল্পটি বাড়িয়ে বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া, মহেশখালী ইত্যাদি জেলাগুলোকে যুক্ত করার চিন্তাভাবনা করছি। এই এলাকাগুলোতেও বাঁধ ভাঙ্গন, লবণাক্ততা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে নারী কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নারী কৃষকদের ক্ষতি পূরণে এই বিষয়গুলোকে তুলে ধরে ফান্ড বাড়ানো যায় কিনা সেটা নিয়েও ভাবছি।

তিনি আরো বলেন, পাশাপাশি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্রোগামের মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকার খাবার পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ,  প্রয়োজনে ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এটা ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে।

নারী কৃষকদের স্বীকৃতি প্রদানে সরকারের ভূমিকা প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, মাঠ থেকে ঘর পর্যন্ত কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ ৭০ শতাংশ। পুরুষের ৩০ শতাংশ। পরিবারের কথা ভেবেই নারী কৃষিকাজের প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করেন। যে পরিবারে পুরুষ কৃষক মারা যায়, সেখানে জমির মালিকানা হয় তার পুত্র সন্তান। অন্যত্র স্বামী বিদেশে থাকলে স্ত্রী কৃষিকাজ করলেও শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তি হওয়ার কারণে তার অংশীদারিত্ব নেই। নারী কৃষকের নামে জমি বা বাড়ি খুব কমই রয়েছে। তবে মূল্যবোধের দিক থেকে নারী কৃষকের স্বীকৃতি বাড়ছে। এক্ষেত্রে তিনি বলেন, নারী উদ্যোক্তা, কৃষককে প্রাধান্য দিতে সরকার প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সুবিধা প্রাপ্তিতে গুরুত্ব দিয়েছে। বিভিন্ন জেলায় ১৫ শতাংশ নারীকে কৃষক কার্ড প্রদান করা হয়েছে।  মে’র শেষ সপ্তাহের বিবিএসে’র (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো) তথ্য অনুযায়ী ১৮ শতাংশ নারী কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে । ভবিষ্যতেও এর সংখ্যা আরো বাড়বে।

পরিবেশবান্ধব কৃষিব্যবস্থা জরুরি

পরিবেশবান্ধব কৃষিব্যবস্থা জরুরি, বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নের কাঁঠালতলী গ্রামের রঞ্জিতা রানী সমাদ্দার। বলেশ্বর নদীর সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা। মাঘ থেকে চৈত্র তিন মাস জমিতে লবনের পরিমাণ বেশি থাকায় পুকুরে জমানো বৃষ্টির পানি চাষাবাদে ব্যবহার করেন। পুকুরের পানি শেষ হলে গেলে, পান করা,  রান্নবান্না, নিত্য ব্যবহার্য, চাষাবাদের পানি সবকিছু নিয়েই সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। নোনা পানিতে যাতে ফসলের ক্ষতি না হয় এজন্য মালচিং পদ্ধতিতে বীজ রোপন করেছেন তিনি।

এ ব্যাপারে রঞ্জিতা রানী সমাদ্দার (৪০) বলেন, জোয়ারের সময় সমুদ্রের নোনা পানি বলেশ্বর নদী হয়ে হলদা খাল দিয়ে জমিতে প্রবেশ করলে ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এবার দেড় একর জমিতে ঘের করে রুই. কাতলা, তেলাপিয়া, পাঙ্গাশ মাছ চাষ করছি।  মে মাসের প্রথম দিকে ঘেরের উঁচু জমিতে ধূসর রঙের মালচিং পেপার বিছিয়ে মাটি চাপা দিয়ে শসা, করলা, কাঁচামরিচ, বেগুনের বীজ তৈরি করছি। যাতে নোনা পানি বীজ জমির কোনো ক্ষতি করতে না পারে।

ঘেরের উঁচু জমিতে বীজ তৈরি করছেন রঞ্জিতা রানী সমাদ্দার
ছবি :  ঘেরের উঁচু জমিতে বীজ তৈরি করছেন রঞ্জিতা রানী সমাদ্দার

ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করে চাষাবাদ করছেন কাঁঠালতলী ইউনিয়নের ঠাকুরবাড়ীর কাকুতী রানী। কাকুতী রানী মাচা পদ্ধতিতে পুঁই শাক, খুঁটি বা স্ট্যাকিং পদ্ধতিতে  ঢেঁড়শ, উঁচু সারজন পদ্ধতিতে ফুলকপি ইত্যাদি শাকসবজি পরিবেশ-বান্ধবভাবে চাষবাদ করছেন।

কাকুতী জানায়, জমিতে লবনের পরিমাণ বেশি। এরিমধ্যে কিভাবে চাষাবাদ করা যায়, সেই পদ্ধতিগুলো  কমিউনিটি ভিত্তিক জলবায়ু সহনশীলতা ও নারীর ক্ষমতায়ন কর্মসূচী (সিআরইএ) ’র মাধ্যমে জানতে পেরেছি।

ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করে চাষাবাদ করছেন কাকুতী রানী
ছবি : ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করে চাষাবাদ করছেন কাকুতী রানী

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগাম ম্যানেজার (জলবায়ু পরিবর্তন) মোঃ আহসানুল ওয়াহেদ জানালেন, জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। সি লেবেল আস্তে আস্তে বাড়ছে। আমাদের বাঁধের আকার, উচ্চতা নিয়ে গবেষণা দরকার। কারণ এর উচ্চতা আরো বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। আগামী ১০০ বছরে আমাদের জনগোষ্ঠীকে কিভাবে রক্ষা করা যাবে। সরকারকে এই গবেষণা করার প্রতি গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, এই ফসলগুলো নোনা পানি সহ্য  করার ক্ষমতা রয়েছে। তবে এর বাইরে গেলে নোনা পানি সহ্য করার ক্ষমতা হারায়। মুগ ডাল ৮ ডিএস পার মিটার পর্যন্ত নোনা পানি সহ্য করতে পারে। তবে জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। জমিতে ড্রেনেজ পদ্ধতি না থাকায় নোনা পানি  ঢুকে জমা হয়ে লবনের পরিমাণ বেড়ে ফসল নষ্ট করে। ৮ এর উপর উঠে গেলে ফসলের ক্ষতি হয়।

এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নীতিগত এবং সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ দরকার। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো তাদেরকে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে পারে। রক্ষণাবেক্ষণের

জায়গা থেকে সরকারের সাথে কথা বলা, চাপ দেওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।  এছাড়াও সেখানে বিকল্প কৃষি, জীবিকায়ন কি হতে পারে সে বিষয়ে ভাবা দরকার। বিকল্প জীবিকায়নের উপর তাদের ইউনিয়ন, ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।

নোনা পানির সমস্যা নিরসনে পরিবেশবান্ধব কৃষিব্যবস্থার জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বললেন  বরগুনার কৃষিবিদ রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস। তিনি বলেন, জাতীয় কৃষি সম্প্রসারণ নীতিমালায় পুরুষদের পাশাপাশি নারী কৃষকদের প্রশিক্ষণে উৎসাহিত করার কথা বলা আছে। সরকার থেকেও নির্দেশ রয়েছে, ৩০ শতাংশ নারী কৃষকের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক। আপাতত ৩০ শতাংশ নারীকে কৃষক প্রশিক্ষণে আমরা বাধ্যতামূলকভাবে নিচ্ছি। জলবায়ু পরিবর্তনে তাদের আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞান, চাষাবাদের জন্য ধারণা দেওয়া হচ্ছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগ

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগ, নারী কৃষকদের সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) সুইডেন দূতাবাসের সহায়তায় “কমিউনিটি ভিত্তিক জলবায়ু সহনশীলতা ও নারীর ক্ষমতায়ন কর্মসূচী (সিআরইএ)” শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। যা বরগুনাসহ ১৩টি জেলার হাওর, চর, উপকূলীয় এবং পার্বত্য অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করে।

২০২২ সাল থেকে প্রকল্পটি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায় প্রকল্পের সাথে সম্পৃক্ত   নারী কৃষকদেরকে স্বল্পমেয়াদী ধানের জাত, জলবায়ু-সহনশীল সমন্বিত বাড়ির আঙিনায় বাগান, সম্মিলিত দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং আবহাওয়া-ভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনার মাধ্যমে আকস্মিক বন্যার মতো জলবায়ুগত ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা করে আসছে।

চাই নারী কৃষকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি

চাই নারী কৃষকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, চাল উৎপাদনে ২২টি কাজের মধ্যে ১৭টি করেন নারী । তারপরেও একজন পুরুষ কৃষক বলেন,  কি বা করে! এমন তো কিছুই করে না। এটার আবার স্বীকৃতি দিতে হবে! এই জায়গা থেকে আমাদের সরতে হবে জানালেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম।

তিনি বলেন, নারীর গৃহস্থালির কাজ, অস্বীকৃত কাজের স্বীকৃতি নাই।  এই কাজকে উৎপাদনশীল কাজ বলে মনে করা হয় না। উৎপাদনশীল কাজে পারিশ্রমিক পাবে, নাহলে পণ্য নিয়ে বাজারে বিক্রি করবে। এটা ছাড়া নারী যাই করে, এটাকে উৎপাদনশীল বলা হয় না। তাই তার কাজের কোনো সম্মান নাই, মর্যাদা নাই, মূল্যায়ন নাই।

আমাদের এডভোকেসির কারণে নারীর অস্বীকৃত কাজের একটা মূল্য ধরা হয়েছে। কাজের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি  পেলেই নারী পরিবার, সমাজে স্বীকৃতি পাবেন। নারী কৃষকদের স্বীকৃতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য সেবা পাওয়া নিয়েও সচেতনতা তৈরিতে জোর দেন তিনি।

শাহীন আনাম আরো বলেন, সরকারের সহযোগিতা না থাকায় পরিবার, সমাজ ও ব্যক্তিগত জীবনে নারীর কোনো পরিবর্তন আসেনি। সুপেয় এক কলসি পানির জন্য একজন নারীকে দুই কিলোমিটার হাঁটতে হয়। কমিউনিটি পর্যায়ে সুপেয় পানির ব্যবস্থা থাকলে, পানি আনতে তাকে এতো সময় ব্যয় করতে হতো না। পানি আনতে গিয়ে সে নানা রকম সহিংসতার শিকার হয়।  সমাজের রীতি রেওয়াজের মধ্যে যদি পরিবর্তন না আসে, তাহলে নারীর এই অবস্থা থেকে উত্তরণ হওয়া খুবই দুরূহ।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়েমা হক বিদিশা বলেন,  এই সামাজিক কাঠামোর মধ্য থেকে যে নারীরা কৃষিখাতে অংশগ্রহণ করছেন, কৃষিখাতে তাদের এই অংশগ্রহণটা আমরা কিভাবে মূলধারায় আনতে পারি সেটা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারা যে কাজটি করছেন সেটি মূল্যায়ন  করে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নারী কৃষক কৃষিখাতের প্রতিটি কাজ করে থাকেন। সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়াতে, আমরা যত বেশি প্রযুক্তি নির্ভর, আধুনিক কৃষি নির্ভরতার দিকে যাবো, তত কৃষিকাজের সময়টা তাদের কমে আসবে।

নারী কৃষকের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের  প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে আনা, কৃষিখাতটাকে আধুনিকীকরণ করা, বাজার ভিত্তিক পদ্ধতির সাথে যুক্ত করা, যত বেশি বিপনন প্রক্রিয়ায় নারী কৃষকদের আনা যাবে, তাদের মূলধারায় আসার কাজটা ততটা সহজ হবে।

উপকূলীয় নারীদের প্রধান সমস্যা হিসেবে জলবায়ু অভিবাসনকে চিহ্নিত করেছেন অধ্যাপক ড. সায়েমা হক বিদিশা। তিনি বলেন, এখানে যে জেন্ডার প্রত্যাশা রয়েছে। সেই প্রত্যাশাটা আমাদের জলাবায়ুর অর্থায়ন, তহবিল এই জায়গাগুলোতে  সঠিকভাবে সংহত করতে হবে।

উপকূলীয় যে নারীর জলবায়ু অভিবাসন করতে হচ্ছে বা কাজে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, সেই নারী কৃষককে সহযোগিতা করা। যাতে তিনি কাজ না হারান। একদিকে যেমন তাদের কাজের দিকটা দেখা, অন্যদিকে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে নারী কৃষকদের জন্য কিছু সুযোগ তৈরি, ফোকাস করা যেতে পারে। অর্থায়নের সহায়তার কিছু পরিমাণ বাজেট রাখা। যেমন পরিশোধন স্কিম, মেয়েরা স্বাস্থ্য সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্বাস্থ্য সেবায় সহযোগিতা করা ।

এছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে কেন্দ্র করে বিশেষ সহায়তা পদ্ধতি চালুর আহ্বান জানান তিনি।  সেসঙ্গে ইউএনএফপিসহ বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সহায়ক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতি গুরুত্ব দেন ।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

উপকূলীয় নারী কৃষকরা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিতে উপেক্ষিত

সর্বশেষ আপডেট ১১:৩৭:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬

বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকা বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা । এপ্রিল-মে মাসে এখানকার বাতাসে মিষ্টি আলু, চীনাবাদাম, মুগ ডাল, সূর্যমুখী ফুলের গন্ধের সুবাস ভেসে বেড়ায়। কিন্তু চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল অতি জোয়ারে  নোনা পানিতে তলিয়ে  যাওয়া ফসলের পচা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এভাবে প্রতি বছর নোনা পানি প্রবেশের কারণে ক্ষতি হচ্ছে পাথরঘাটা সদর, ৩ নং চরদুয়ানি, কাঁঠালতলী,  ৩ নং চরদুয়ানি ও ৬ নং কাকচিড়া চার ইউনিয়নের কয়েক হাজার হেক্টর জমির ফসল। নারী কৃষকরা ঋণ নিয়ে জমিতে ফসল লাগিয়ে নোনা পানির কারণে তা ঘরে তুলতে পারেননি। একদিকে বাড়ছে তাদের ঋণের বোঝা। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা উপেক্ষিত।

নোনা পানির সাথে চিরন্তন লড়াই নারীদের

বৈশাখে বিশ্ব খাল দিয়ে সাগরের নোনা পানি  জমিতে  প্রবেশ করায় ৩ নং চরদুয়ানির হোগলাপাশা গ্রামের কৃষকরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

এই খাল পাড়ের এক কানি জমিতে মিষ্টি আলু, চীনাবাদাম, সূর্যমুখী ফুলের চাষ করেছেন রুমি আক্তার। কৃষি অফিস থেকে পেয়েছিলেন চীনাবাদাম, সূর্যমুখীর আটি । পৌষ, মাঘ মাসে ১০ হাজার টাকায় মানের ৭/৮ কাঠা জমিতে  সেই আটি লাগিয়েছেন।  শ্রমিক খরচ কমাতে ভোরে জমিতে কাজে  লেগে যেতেন। আকস্মিক জোয়ারের নোনা পানিতে ফসল তলিয়ে গেছে তার। তলিয়ে যাওয়া ফসল তুলতে কয়েকজন নারী শ্রমিক নিয়েছেন তিনি।

মিষ্টি আলুর গাছ তুলে দেখিয়ে রুমি আক্তার (৩৫) বললেন, এই দেহেন,  নোনা পানি লাগনে মিঠা আলু নষ্ট হইয়া গেছে। একহান মিঠা আলু পাই নাই। চীনাবাদামের খোসা ভেঙ্গে বললেন, দেহেন বাদাম নাই। বাদাম হইলে নিজের হাতে তো কিছু টাকা আইতো। ভূট্টা হইলে তো কয়টা খাইতে পারতাম। পুষ্টি হইতো। সূর্যমুখী হওয়ায় তেলটা তো আর কিনতে হইত না। কিন্তু সব শেষ, ফসল তোলার আগে নোনা পানি ঠেলা দিলে সব তলাইয়া গেছে। পানি সইর‌্যা গেলে দেহি ফসল পইচ্যা  গেছে। নোনা পানির চাপে বাদাম, সূর্যমুখী ফুল, মিঠা আলু নষ্ট হইয়া গেছে। নোনা পানির কারণে ধরা খাইয়া গেছি।

তিনি আরো বলেন, নোনা পানি যাতে মাঠে যাইতে না পারে বাঁন্ধ দিয়া উঁচু কইর‌্যা দিছিলিাম। যখন পানি চাপ  দেয় বাইন্ধ্যা দিলেও কুলায় না। খালের পাড়ে মাঠ, রাইতে মাঠে নোনা পানি উইঠ্যা গেছে। রাইত বারোটায় মানুষ নিয়া আইস্যা বাঁন্ধ  কাইট্যা পানি সরাইছি। পানির চাপ পড়বে , দেখা দিলে কড়া থাকলেও ফসল উঠাইয়্যায় ফালাই ভয়েতে। এইবার হেই সুযোগটাও পাই নাই। কিন্তু ফসল ঘরে তুলতে না পারায় শ্রমের মজুরি, নিজের শ্রম, চাষের খরচ সবই পানিতে গেছে ।

মিষ্টি আলু, চীনাবাদাম তুলছেন নারী কৃষকরা
ছবি : মিষ্টি আলু, চীনাবাদাম তুলছেন নারী কৃষকরা

আকস্মিক এই জোয়ারে নোনা পানি ঢুকে জমির ফসল নষ্ট হয়েছে হোগলাপাশার আরেক কৃষক মাহমুদা আক্তার লিজার। মুগ ডাল, মিষ্টি আলু, ভুট্টার চাষ করেছিলেন তিনি। কড়া রোদে বাড়ির ছাদে মুগ ডাল শুকাচ্ছিলেন তিনি।  সেখানে কথা হয় তার সাথে। মাহমুদা আক্তার লিজার (৩৩) মতে, রোজা রাইখ্যা মিঠা আলু জমিতে নিড়ানি দিছি। বীজ লাগাইছি। আগাছা পরিষ্কার করছি। এক জমিতে এক মণ আলু হইতো। সব নোনা পানিতে পইচ্যা গেলো। একবার মুগ ডাইল লাগাইলে তিনবার তুলতে পারতাম। সেইট্যা একবার তুলতে পারছি।

তিনি আরো বললেন, এক মণ মুগ ডাইল তুলতে ১২/১৪ দিন লাগে। রোইদে পুইড়া একটা একটা কইর‌্যা ডাইল তুলছি। আবার রোইদে তা শুকাইয়া পিটাইয়া বাইর করতাছি। এত কষ্ট কইর‌্যা ফলাইয়াও আমরা খাইতে পারি না। অভাবের কারণে বিক্রি কইর‌্যা দিতে হইবো। এক মণ ডাইল বিক্রি হইব ৪ হাজার টাকা ! এই টাকা দিয়া কি হইব!

রোদে ছাদে মুগ ডাল শুকাচ্ছেন মাহমুদা আক্তার লিজা
ছবি :  রোদে ছাদে মুগ ডাল শুকাচ্ছেন মাহমুদা আক্তার লিজা

উপকূলের নারী কৃষকরা নোনা পানির সাথে এভাবেই লড়াই করছি।  জমিতে নোনা পানি  ঢোকা বন্ধে সরকারি কোনো উদ্যোগ নাই আক্ষেপের সুরে বললেন মাহমুদা আক্তার লিজা। রুমি আক্তার, মাহমুদা আক্তার লিজা, সবিতা, লিপিকা, বেবি আক্তার, সুরমা, তাজিনুর বেগমের মতো গ্রামের অন্য  নারী কৃষকদের সাথেও কথা হলো। তারা সবাই  একই পরিস্থিতির শিকার। একই আর্তি জানালেন তারা। তাদের অনেকেই সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে ফসল লাগিয়েছিলেন। কীভাবে তারা এই ক্ষতি সামলাবেন, সেই দুশ্চিন্তায় ঘুম হয় না তাদের। আজানের সাথে সাথে নামাজ পড়ে ঘরসংসারের কাজ সেরে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই জমিতে কাজে নামেন। রাত বারোটা পর্যন্ত এই ফসল, সংসারের কাজে সময় দেন। এত কষ্টের  ফসল ঘরে তুলতে পারেননি তারা।

অন্যদিকে দু-একজনের সামান্য  জমি থাকলেও ফসল উৎপাদন, বিক্রি বা আয়ের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না। আবার জমির দলিল না থাকায় কৃষিঋণ ও বিনা মূল্যের কৃষি উপকরণও পান না তারা। কেউ কেউ পারিবারিক জমিতে নিয়মিত খাটেন, অথচ লাভের অর্থ পান না। তাদের একটাই দাবি,  জমিতে লবণাক্ততার কারণে ফসল মারা যায়। সরকার যেন মিঠা পানির ব্যবস্থা করে।

কৃষিখাতে মজুরি বৈষম্য

২৮ এপ্রিল রাতে বাঁধ ভেঙ্গে জমিতে নোনা পানি ঢুকলে বাঁধ কেটে তা সরিয়েছিলেন নারী কৃষক-শ্রমিকরাই। জমি নিড়ানি, চারা রোপন, নোনা পানিতে  ফসল তোলার কাজটিও করেছিলেন তারা। এই কাজে পুরুষ শ্রমিকদের সংখ্যা ছিল নগন্য। পাথরঘাটার গীতা রানী রায়, সন্ধ্যা রানী মালাকার, সেলিনা জমি নিড়ানি, চারা রোপন, এই বাঁধ কাটা, ফসল তোলার কাজ করেছিলেন অর্ধেক মজুরিতে। কারণ তাদের নিজের জমি নেই। অন্যের জমিতে বৈশাখ থেকে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন ।

গীতা রানী রায়ের (৪৫) মতে, পুরুষ কৃষি শ্রমিকের তুলনায় নারী কৃষি শ্রমিকের মজুরি অনেক কম। কম মজুরিতেই কাজ করি। তারমধ্যে বৈশাখে সাগরের  নোনা পানি বিশ্ব খাল দিয়ে জমিতে ঢুকে। ফসলে পচন ধরায় এখন আর কম মজুরিতেও কাজ নাই। কিভাবে দিন যাইব জানি না! একই কথা বললেন সন্ধ্যা রানী মালাকার, সেলিনাও ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর শ্রমশক্তি জরিপ (এলএফএস) ২০২৪-এর ফলাফলে দেখা যায়, দেশব্যাপী কৃষি শ্রমে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি। কিন্তু তারা কম মজুরিতে কাজ করে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

কৃষিখাতে  নারী কৃষি শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য সম্পর্কে বরগুনার খামারবাড়ির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, আগের থেকে কৃষিখাতে নারী-পুরুষের মজুরিতেও পরিবর্তন হয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে নারীর কাজটাই বেশি। পুরুষ শুধু মাঠের কাজটাই করেন। নারী কৃষকরা মাঠ ও হারভেস্ট এর পুরো কাজটাই করেন। নারীরা মাঠে ধান লাগাচ্ছেন। যে কোনো ফসল মাঠ থেকে তুলে বাড়ি পর্যন্ত আনা ঝাড়াই-মাড়াই, পরিষ্কার , প্যাকিং সবই নারী কৃষকরা করেন। একটা সময় নারীদের কাজকে মূল্যায়ন করা হতো না। এখন কিছুটা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এজন্য দরকার গ্রুপ ভিত্তিক সচেতনতা।

বঞ্চনার শিকার নারী কৃষকরা

কৃষিতে এতো শ্রম দেওয়ার পরও নারী কৃষকরা শুধু শ্রম মজুরি থেকেই নয়, কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ ও সরকারি ভর্তুকি-প্রণোদনা পাওয়ার সুযোগ সহ বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি থেকেও বাদ পড়েন।

শ্রমশক্তি জরিপ (এলএফএস) ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী,  দেশে ৩০.১ লক্ষ নারী অবৈতনিক পারিবারিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। শ্রম আর অধিকার না পাওয়ার পরও প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কৃষিতে নারীর উপস্থিতি বাড়ছে, বিপরীতে কমছে পুরুষের সংখ্যা। কৃষিতে এতো শ্রম দেবার পরও নারীদের কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারে কোনো পুরুষ সদস্য না থাকলে নারীদের কৃষক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস জানান, কৃষকরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, মহাজনদের কাছ থেকে সুদে ঋণ নিয়ে ফসল লাগায়। সেই ফসলটা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের কষ্টের শেষ থাকে না। এই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা ও ক্ষতির পরিমাণ হেড অফিসে পাঠানো হয়েছে। ভবিষ্যতে সরকার যদি কোনো প্রনোদনা কর্মসূচী দেয় তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত নারী কৃষকদের মাঝে বিতরণের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

নেই জমি, ঋণ, কৃষক কার্ড

একই ইউনিয়নের দক্ষিণ জ্ঞানপাড়া গ্রামের তাজিনুর বেগম (৪৮) ।

বাড়ির পাশের আঙ্গিনায় ১২ কাঠা জমিতে বেড, কান্দি, ড্রাম পদ্ধতিতে ঢেঁড়শ, চিচিঙ্গা, বেগুন, কাঁচামরিচ, পুঁই শাক ইত্যাদি সবজি চাষ করছেন । পুকুরে ধরে রাখা বৃষ্টির পানি চারা গাছে দিচ্ছিলেন । পুকুরের পানি শুকিয়ে গেলে চাষাবাদে বিপত্তি শুরু হয়। দূর থেকে পানি আনেন। জমিতে পানি দিবেন মোটর কেনার সামর্থ্য নেই তার স্বামীর।

বাড়ির আঙিনায় লাগানো শাকসবজির পরিচর্যা করছেন তাজিনুর বেগম
ছবি : বাড়ির আঙিনায় লাগানো শাকসবজির পরিচর্যা করছেন তাজিনুর বেগম

শুধু গাছে পানি দেওয়ায়ই নয়, বীজ সংরক্ষণ, চারা রোপন, আগাছা পরিষ্কার, প্রক্রিয়াজাতসহ সব কাজ এতো কষ্ট করেও ফসল বিক্রির টাকা তিনি পান না। কারণ জমি তার স্বামীর। তিনি বললেন, ‘শ্বশুরের জমি । এখন স্বামীর নামে। স্বামী, ছেলেমেয়ে তো আমারই। তাই সংসারের জন্য চাষাবাদ করি। নিজের নামে জমি না থাকায়, নারী কৃষকরা সম্পত্তির অধিকার থেকে যেমন বঞ্চিত হন।  তেমনি সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়েমা হক বিদিশা বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী কৃষকদের একটি বড় অংশ কৃষি খাতে বেতনহীন কাজ করেন। তাদের অংশগ্রহণের কারণে পরিবারে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ছে । কিন্তু এই কাজের জন্য তাদের পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না।

হোগলাপাশায়  বোরো জমিতে আগাছা বাছাই করছিলেন নারী-পুরুষ উভয় কৃষক। তাদেরই একজন মো. জাকির হোসেন (৫৫)। তিনি বলেন, পুরুষ কৃষকদের সাথে নারীরাও ধান রোপন করে, বীজ বপন করে। ধান বাছাই করে। আমরা নারী-পুরুষ সমানে সমানে কাজ করি। অথচ তারা টাকা পয়সা পায় না। আমাগো নারীরা যেভাবে কৃষিকাজ করে তাদের কৃষক কার্ড পাওয়া উচিত।

বোরো জমিতে আগাছা বাছাই করছেন নারী-পুরুষ কৃষক একসাথে
ছবি : বোরো জমিতে আগাছা বাছাই করছেন নারী-পুরুষ কৃষক একসাথে

পড়ন্ত বিকেলে সড়কের পাশে স্ত্রীসহ বালতিতে মুগ ডাল তুলছিলেন ষাটর্ধ্বো ইসলাম খান ।  সংসারের কাজ সামলিয়ে স্ত্রী তাকে মুগ ডাল তুলে সহযোগিতা করছিলেন। কিন্তু  ফসল বিক্রির অর্থে তার ভাগ নেই।

মুগ ডাল তুলছেন নারী-পুরুষ কৃষক
ছবি : মুগ ডাল তুলছেন নারী-পুরুষ কৃষক

তার স্ত্রীর নামে কৃষক কার্ড হওয়া উচিত কিনা জিজ্ঞেস করতেই তিনি জানালেন, কৃষক কার্ড আমার নামে হইব। স্ত্রীর নামে কেন! কৃষি তথ্য পরিষেবা (এআইএস)-এর তথ্যে দেখা যায়, কর্মসূচিটির প্রাক-পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ‘কৃষক কার্ড’-এর অধিকাংশ প্রাপকই পুরুষ। কারণ ১০টি জেলার ১১টি উপজেলায় জরিপকৃত ২২ হাজার ৬১ জন কৃষকের মধ্যে নারীদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫.০৫ শতাংশ।

নারী কৃষকদের কার্ড প্রদান প্রসঙ্গে কৃষিবিদ রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস জানান, কৃষক কার্ড আমাদের এখানে এখনো চালু হয়নি। প্রকৃত যে কৃষক তিনি কৃষক কার্ড পাবেন। পরিবারের প্রধান পুরুষ না থাকলে, নারী কৃষক থাকলে অগ্রাধিকার পাবেন। তবে নারী কৃষকদের কার্ড দেওয়াকে পুরুষ কৃষক, সাধারণ জনগণ কিভাবে নিবে এটা নিয়েও ভাবনার বিষয় আছে!

একটু সহায়তায় আসতে পারে পরিবর্তন

উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই সমস্যা আরও তীব্রতর হচ্ছে। ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল থেকে ৩ মে অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে ৩ হাজার ১৭৭.৮৭ হেক্টর  অর্থাৎ ৪.৫০২ শতাংশ । আর্থিকভাবে ফসলের ক্ষতি হয়েছে ২ হাজার ৬ ৭৬ লক্ষ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ৪৩ হাজার ৬৪০ জন। এই সমস্যা নিরসনে দরকার সরকারি সহযোগিতা।

এ ব্যাপারে কৃষিবিদ রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, ২৮ এপ্রিলের অতিবৃষ্টিতে এই এলাকার মুগ ডাল,  চীনাবাদাম, কাঁচামরিচ, মিষ্টি আলু ও বোরো ধানের  ক্ষতি হয়েছে। এবার ৪৮ হাজার ৭৬০ হাজার হেক্টর জমিতে মুগ ডাল চাষ হয়েছে।  ৩ হাজার ৬০ হেক্টর জমির মুগ ডালের ক্ষতি হয়েছে। ৩৫ হাজার ২১৪ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ৬৮০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। কোথাও কোথাও একবার মুগ অর্থাৎ ফসল তুলতে পারলেও অধিকাংশ জায়গায় তুলতেই পারেননি কৃষকরা। নারী কৃষকরা মাঠে জমা  নোনা পানিতে নেমে মুগ ডাল তুলেছেন। বাড়িতে নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করছেন। তারা অনেক পরিশ্রম ও কষ্ট করছেন।

পাশাপাশি লবন সহনশীল জাতের চাষাবাদের প্রতিও জোর দেন তিনি। তিনি বলেন, বিভিন্ন  ফসলের লবন সহনশীল জাত আছে।  ধান, সবজির জাতগুলো কৃষকদের মাঝে বিভিন্ন মৌসুমে বিতরণ করা হয়। এছাড়াও  নোনা পানি  ক্ষেতে ঢোকার আগে যদি ফসলটা হারভেস্ট করা যায়, সেই ভ্যারাইটিস চাষাবাদ করতে হবে। এটা সময়সাপেক্ষ। একবার বললেই কৃষকের মধ্যে সচেতনতা আসবে না। কিছু কৃষক নিয়ে পরীক্ষা করেন। যদি দেখে  আর্থিক লাভবান হচ্ছেন, দ্বিতীয় বছর থেকে ওরা সেই প্রযুক্তি গ্রহণ করেন।

এরপরও নোনা পানিতে ফসলের ক্ষতি , মানুষের ক্ষতি -শারীরিক-মানসিক যেভাবেই হোক সমন্বয় কিভাবে রাখতে পারবো সেটা নিয়েই কাজ করছি। উপকূলীয় নারী কৃষকদের লবণাক্ততার প্রভাব থেকে মুক্ত করতে সরকার কি ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে এ ব্যাপারে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, উপকূলীয় নারী কৃষকদের উন্নয়নে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার আওতায় সাতক্ষীরা ও খুলনার প্রকল্পটি বাড়িয়ে বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া, মহেশখালী ইত্যাদি জেলাগুলোকে যুক্ত করার চিন্তাভাবনা করছি। এই এলাকাগুলোতেও বাঁধ ভাঙ্গন, লবণাক্ততা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে নারী কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নারী কৃষকদের ক্ষতি পূরণে এই বিষয়গুলোকে তুলে ধরে ফান্ড বাড়ানো যায় কিনা সেটা নিয়েও ভাবছি।

তিনি আরো বলেন, পাশাপাশি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্রোগামের মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকার খাবার পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ,  প্রয়োজনে ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এটা ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে।

নারী কৃষকদের স্বীকৃতি প্রদানে সরকারের ভূমিকা প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, মাঠ থেকে ঘর পর্যন্ত কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ ৭০ শতাংশ। পুরুষের ৩০ শতাংশ। পরিবারের কথা ভেবেই নারী কৃষিকাজের প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করেন। যে পরিবারে পুরুষ কৃষক মারা যায়, সেখানে জমির মালিকানা হয় তার পুত্র সন্তান। অন্যত্র স্বামী বিদেশে থাকলে স্ত্রী কৃষিকাজ করলেও শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তি হওয়ার কারণে তার অংশীদারিত্ব নেই। নারী কৃষকের নামে জমি বা বাড়ি খুব কমই রয়েছে। তবে মূল্যবোধের দিক থেকে নারী কৃষকের স্বীকৃতি বাড়ছে। এক্ষেত্রে তিনি বলেন, নারী উদ্যোক্তা, কৃষককে প্রাধান্য দিতে সরকার প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সুবিধা প্রাপ্তিতে গুরুত্ব দিয়েছে। বিভিন্ন জেলায় ১৫ শতাংশ নারীকে কৃষক কার্ড প্রদান করা হয়েছে।  মে’র শেষ সপ্তাহের বিবিএসে’র (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো) তথ্য অনুযায়ী ১৮ শতাংশ নারী কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে । ভবিষ্যতেও এর সংখ্যা আরো বাড়বে।

পরিবেশবান্ধব কৃষিব্যবস্থা জরুরি

পরিবেশবান্ধব কৃষিব্যবস্থা জরুরি, বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নের কাঁঠালতলী গ্রামের রঞ্জিতা রানী সমাদ্দার। বলেশ্বর নদীর সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা। মাঘ থেকে চৈত্র তিন মাস জমিতে লবনের পরিমাণ বেশি থাকায় পুকুরে জমানো বৃষ্টির পানি চাষাবাদে ব্যবহার করেন। পুকুরের পানি শেষ হলে গেলে, পান করা,  রান্নবান্না, নিত্য ব্যবহার্য, চাষাবাদের পানি সবকিছু নিয়েই সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। নোনা পানিতে যাতে ফসলের ক্ষতি না হয় এজন্য মালচিং পদ্ধতিতে বীজ রোপন করেছেন তিনি।

এ ব্যাপারে রঞ্জিতা রানী সমাদ্দার (৪০) বলেন, জোয়ারের সময় সমুদ্রের নোনা পানি বলেশ্বর নদী হয়ে হলদা খাল দিয়ে জমিতে প্রবেশ করলে ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এবার দেড় একর জমিতে ঘের করে রুই. কাতলা, তেলাপিয়া, পাঙ্গাশ মাছ চাষ করছি।  মে মাসের প্রথম দিকে ঘেরের উঁচু জমিতে ধূসর রঙের মালচিং পেপার বিছিয়ে মাটি চাপা দিয়ে শসা, করলা, কাঁচামরিচ, বেগুনের বীজ তৈরি করছি। যাতে নোনা পানি বীজ জমির কোনো ক্ষতি করতে না পারে।

ঘেরের উঁচু জমিতে বীজ তৈরি করছেন রঞ্জিতা রানী সমাদ্দার
ছবি :  ঘেরের উঁচু জমিতে বীজ তৈরি করছেন রঞ্জিতা রানী সমাদ্দার

ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করে চাষাবাদ করছেন কাঁঠালতলী ইউনিয়নের ঠাকুরবাড়ীর কাকুতী রানী। কাকুতী রানী মাচা পদ্ধতিতে পুঁই শাক, খুঁটি বা স্ট্যাকিং পদ্ধতিতে  ঢেঁড়শ, উঁচু সারজন পদ্ধতিতে ফুলকপি ইত্যাদি শাকসবজি পরিবেশ-বান্ধবভাবে চাষবাদ করছেন।

কাকুতী জানায়, জমিতে লবনের পরিমাণ বেশি। এরিমধ্যে কিভাবে চাষাবাদ করা যায়, সেই পদ্ধতিগুলো  কমিউনিটি ভিত্তিক জলবায়ু সহনশীলতা ও নারীর ক্ষমতায়ন কর্মসূচী (সিআরইএ) ’র মাধ্যমে জানতে পেরেছি।

ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করে চাষাবাদ করছেন কাকুতী রানী
ছবি : ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করে চাষাবাদ করছেন কাকুতী রানী

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগাম ম্যানেজার (জলবায়ু পরিবর্তন) মোঃ আহসানুল ওয়াহেদ জানালেন, জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। সি লেবেল আস্তে আস্তে বাড়ছে। আমাদের বাঁধের আকার, উচ্চতা নিয়ে গবেষণা দরকার। কারণ এর উচ্চতা আরো বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। আগামী ১০০ বছরে আমাদের জনগোষ্ঠীকে কিভাবে রক্ষা করা যাবে। সরকারকে এই গবেষণা করার প্রতি গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, এই ফসলগুলো নোনা পানি সহ্য  করার ক্ষমতা রয়েছে। তবে এর বাইরে গেলে নোনা পানি সহ্য করার ক্ষমতা হারায়। মুগ ডাল ৮ ডিএস পার মিটার পর্যন্ত নোনা পানি সহ্য করতে পারে। তবে জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। জমিতে ড্রেনেজ পদ্ধতি না থাকায় নোনা পানি  ঢুকে জমা হয়ে লবনের পরিমাণ বেড়ে ফসল নষ্ট করে। ৮ এর উপর উঠে গেলে ফসলের ক্ষতি হয়।

এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নীতিগত এবং সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ দরকার। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো তাদেরকে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে পারে। রক্ষণাবেক্ষণের

জায়গা থেকে সরকারের সাথে কথা বলা, চাপ দেওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।  এছাড়াও সেখানে বিকল্প কৃষি, জীবিকায়ন কি হতে পারে সে বিষয়ে ভাবা দরকার। বিকল্প জীবিকায়নের উপর তাদের ইউনিয়ন, ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।

নোনা পানির সমস্যা নিরসনে পরিবেশবান্ধব কৃষিব্যবস্থার জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বললেন  বরগুনার কৃষিবিদ রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস। তিনি বলেন, জাতীয় কৃষি সম্প্রসারণ নীতিমালায় পুরুষদের পাশাপাশি নারী কৃষকদের প্রশিক্ষণে উৎসাহিত করার কথা বলা আছে। সরকার থেকেও নির্দেশ রয়েছে, ৩০ শতাংশ নারী কৃষকের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক। আপাতত ৩০ শতাংশ নারীকে কৃষক প্রশিক্ষণে আমরা বাধ্যতামূলকভাবে নিচ্ছি। জলবায়ু পরিবর্তনে তাদের আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞান, চাষাবাদের জন্য ধারণা দেওয়া হচ্ছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগ

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগ, নারী কৃষকদের সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) সুইডেন দূতাবাসের সহায়তায় “কমিউনিটি ভিত্তিক জলবায়ু সহনশীলতা ও নারীর ক্ষমতায়ন কর্মসূচী (সিআরইএ)” শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। যা বরগুনাসহ ১৩টি জেলার হাওর, চর, উপকূলীয় এবং পার্বত্য অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করে।

২০২২ সাল থেকে প্রকল্পটি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায় প্রকল্পের সাথে সম্পৃক্ত   নারী কৃষকদেরকে স্বল্পমেয়াদী ধানের জাত, জলবায়ু-সহনশীল সমন্বিত বাড়ির আঙিনায় বাগান, সম্মিলিত দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং আবহাওয়া-ভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনার মাধ্যমে আকস্মিক বন্যার মতো জলবায়ুগত ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা করে আসছে।

চাই নারী কৃষকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি

চাই নারী কৃষকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, চাল উৎপাদনে ২২টি কাজের মধ্যে ১৭টি করেন নারী । তারপরেও একজন পুরুষ কৃষক বলেন,  কি বা করে! এমন তো কিছুই করে না। এটার আবার স্বীকৃতি দিতে হবে! এই জায়গা থেকে আমাদের সরতে হবে জানালেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম।

তিনি বলেন, নারীর গৃহস্থালির কাজ, অস্বীকৃত কাজের স্বীকৃতি নাই।  এই কাজকে উৎপাদনশীল কাজ বলে মনে করা হয় না। উৎপাদনশীল কাজে পারিশ্রমিক পাবে, নাহলে পণ্য নিয়ে বাজারে বিক্রি করবে। এটা ছাড়া নারী যাই করে, এটাকে উৎপাদনশীল বলা হয় না। তাই তার কাজের কোনো সম্মান নাই, মর্যাদা নাই, মূল্যায়ন নাই।

আমাদের এডভোকেসির কারণে নারীর অস্বীকৃত কাজের একটা মূল্য ধরা হয়েছে। কাজের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি  পেলেই নারী পরিবার, সমাজে স্বীকৃতি পাবেন। নারী কৃষকদের স্বীকৃতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য সেবা পাওয়া নিয়েও সচেতনতা তৈরিতে জোর দেন তিনি।

শাহীন আনাম আরো বলেন, সরকারের সহযোগিতা না থাকায় পরিবার, সমাজ ও ব্যক্তিগত জীবনে নারীর কোনো পরিবর্তন আসেনি। সুপেয় এক কলসি পানির জন্য একজন নারীকে দুই কিলোমিটার হাঁটতে হয়। কমিউনিটি পর্যায়ে সুপেয় পানির ব্যবস্থা থাকলে, পানি আনতে তাকে এতো সময় ব্যয় করতে হতো না। পানি আনতে গিয়ে সে নানা রকম সহিংসতার শিকার হয়।  সমাজের রীতি রেওয়াজের মধ্যে যদি পরিবর্তন না আসে, তাহলে নারীর এই অবস্থা থেকে উত্তরণ হওয়া খুবই দুরূহ।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়েমা হক বিদিশা বলেন,  এই সামাজিক কাঠামোর মধ্য থেকে যে নারীরা কৃষিখাতে অংশগ্রহণ করছেন, কৃষিখাতে তাদের এই অংশগ্রহণটা আমরা কিভাবে মূলধারায় আনতে পারি সেটা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারা যে কাজটি করছেন সেটি মূল্যায়ন  করে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নারী কৃষক কৃষিখাতের প্রতিটি কাজ করে থাকেন। সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়াতে, আমরা যত বেশি প্রযুক্তি নির্ভর, আধুনিক কৃষি নির্ভরতার দিকে যাবো, তত কৃষিকাজের সময়টা তাদের কমে আসবে।

নারী কৃষকের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের  প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে আনা, কৃষিখাতটাকে আধুনিকীকরণ করা, বাজার ভিত্তিক পদ্ধতির সাথে যুক্ত করা, যত বেশি বিপনন প্রক্রিয়ায় নারী কৃষকদের আনা যাবে, তাদের মূলধারায় আসার কাজটা ততটা সহজ হবে।

উপকূলীয় নারীদের প্রধান সমস্যা হিসেবে জলবায়ু অভিবাসনকে চিহ্নিত করেছেন অধ্যাপক ড. সায়েমা হক বিদিশা। তিনি বলেন, এখানে যে জেন্ডার প্রত্যাশা রয়েছে। সেই প্রত্যাশাটা আমাদের জলাবায়ুর অর্থায়ন, তহবিল এই জায়গাগুলোতে  সঠিকভাবে সংহত করতে হবে।

উপকূলীয় যে নারীর জলবায়ু অভিবাসন করতে হচ্ছে বা কাজে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, সেই নারী কৃষককে সহযোগিতা করা। যাতে তিনি কাজ না হারান। একদিকে যেমন তাদের কাজের দিকটা দেখা, অন্যদিকে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে নারী কৃষকদের জন্য কিছু সুযোগ তৈরি, ফোকাস করা যেতে পারে। অর্থায়নের সহায়তার কিছু পরিমাণ বাজেট রাখা। যেমন পরিশোধন স্কিম, মেয়েরা স্বাস্থ্য সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্বাস্থ্য সেবায় সহযোগিতা করা ।

এছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে কেন্দ্র করে বিশেষ সহায়তা পদ্ধতি চালুর আহ্বান জানান তিনি।  সেসঙ্গে ইউএনএফপিসহ বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সহায়ক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতি গুরুত্ব দেন ।