কে কতটুকু সার পাবেন, ঠিক করবে ‘সার কার্ড’
- সর্বশেষ আপডেট ০৬:৩২:৫৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
- / 51
ঝিনাইদহে সার বিতরণে অনিয়ম, সংকট ও কৃষকদের ভোগান্তি কমাতে চালু হচ্ছে ‘সার কার্ড’ ব্যবস্থা। এ কার্ডের মাধ্যমে একজন কৃষক তাঁর আবাদি জমির পরিমাণ ও ফসলের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত পরিমাণ সার কিনতে পারবেন। ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের সার কার্ড তৈরির কার্যক্রম শুরু করেছে কৃষি বিভাগ।
চলতি আমন মৌসুমের শুরু থেকেই ঝিনাইদহে সার সংকট নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন কৃষকরা। চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ডিলারদের বিক্রয়কেন্দ্রে বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটে। ছয় উপজেলার কৃষকদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে সার বিতরণে অসংগতি ও প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার অভিযোগ করা হচ্ছিল।
কৃষকদের এসব অভিযোগ বিবেচনায় নিয়ে সার বিতরণ ও বিপণন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে এ উদ্যোগ নিয়েছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এরই মধ্যে বিএডিসি ও বিসিআইসির আওতাধীন ডিলারদের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় সার কার্ড তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অনেক কৃষক ফসলের ধরন ও জমির পরিমাণ অনুযায়ী সারের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন নন। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করেন তাঁরা। এতে একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ে, অন্যদিকে মাটির উর্বরতা ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার সব বিএডিসি ও বিসিআইসি সার ডিলারকে কৃষকদের জন্য নির্ধারিত সার কার্ড তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কার্ডে কৃষকের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ছবি ও আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ উল্লেখ থাকবে। এ কার্ড দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট ডিলার ও সাব-ডিলারের বিক্রয়কেন্দ্র থেকে নির্ধারিত পরিমাণ সার কিনতে পারবেন কৃষকরা।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সার কার্ড চালু হলে একজন কৃষক কী পরিমাণ জমিতে কোন ফসল চাষ করছেন এবং সেখানে কতটুকু সার ব্যবহার করছেন, তার তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি একজন কৃষক যাতে নির্ধারিত প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার কিনতে না পারেন, সেটিও নজরদারির আওতায় আনা যাবে। অতিরিক্ত সার কিনে তামাক কিংবা অননুমোদিত ফসলের আবাদে ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণেও এ ব্যবস্থা সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইতোমধ্যে ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে জেলার সব উপজেলায় তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। ইউনিয়ন ও ব্লক পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ ও কার্ড তৈরির কাজ তদারকি করছেন।
কৃষি বিভাগের সুপারিশে প্রতিটি কার্ডে ধান, গম, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ফসলের জন্য প্রতি বিঘা জমিতে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের নির্ধারিত মাত্রা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবার সার কেনার সময় কার্ডে সারের পরিমাণ, ফসলের নাম ও বিতরণের তারিখ লিখে রাখা হবে। এতে একজন কৃষক নির্ধারিত মাত্রার বেশি সার সংগ্রহ করতে পারবেন না।
সদর উপজেলার বাদপুকুরিয়া গ্রামের কৃষক আরিফ হোসেন বলেন, তাঁদের এলাকায় ধান, কলা, ড্রাগন ফলসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হয়। এমনকি মাছ চাষের পুকুরের পানিও প্রস্তুত করতে সার প্রয়োজন হয়। ফলে কৃষকের চাহিদা সব সময় এক রকম থাকে না। অথচ কেউ বস্তা বস্তা সার পেলেও কেউ পাঁচ থেকে ১০ কেজির বেশি পান না। এতে কৃষকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
রাধাকান্তপুর গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত সার প্রয়োগে জমির উর্বরতা ও পরিবেশের ক্ষতি হয়, এটি ঠিক। তবে কৃষক সাধারণত প্রয়োজনের বেশি সার নিতে চান না। সার কার্ড চালু হলে সবাই প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাবেন বলে আশা করছেন তিনি। তবে এ ব্যবস্থা কার্যকর করতে সরকারি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোরও দাবি জানান তিনি।
শৈলকুপা উপজেলার ত্রিবেনী ইউনিয়নের সার ডিলার জাফর মোল্লা বলেন, সার কার্ড চালু হলে কৃষকদের জমির পরিমাণ ও সার ব্যবহারের তথ্য সংরক্ষণ করা যাবে। এতে কৃষকদের সুষম সার ব্যবহারে সচেতন করা সহজ হবে। পাশাপাশি সার বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকৃত কৃষকদের কাছে নির্ধারিত পরিমাণ সার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কৃষকরাও সার কার্ড তৈরিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. কামরুজ্জামান বলেন, সার বিতরণ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব অভিযোগ বিবেচনায় নিয়েই বিতরণ ও বিপণন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সার কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কার্যক্রমের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইউনিয়ন ও ব্লক পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করছেন।
তিনি আরও বলেন, ফসলভিত্তিক সুষম সার প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে এবং জমির উর্বরতা রক্ষা পাবে। না বুঝে অতিরিক্ত সার ব্যবহারের কারণে ফসলের মান ও জমির গুণাগুণ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সার কার্ডের মাধ্যমে এসব সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।





























