ঢাকা ১০:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আল-কায়েদার সেল, ঝুঁকি কতটা, নেপথ্যে কারা?

উৎপল দাস, বিশেষ প্রতিনিধি
  • সর্বশেষ আপডেট ০৯:৩৩:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
  • / 48

আল-কায়েদার সেল, ঝুঁকি কতটা, নেপথ্যে কারা?

রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা (একিউআইএস) গোপন সেল গঠনের চেষ্টা করছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ‘নব্য জেএমবি’র সদস্য গ্রেপ্তার ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাও সামনে এসেছে।

তবে এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে কি না; এ প্রশ্নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে কিছুটা ভিন্নমত রয়েছে। পুলিশ বলছে, আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই; বরং গোয়েন্দা নজরদারি ও তদন্ত আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উদ্বেগ

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিমের ১০ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে আল-কায়েদার আঞ্চলিক কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একিউআইএস বড় আকারের ইউনিটের পরিবর্তে ছোট ছোট গোপন সেলের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার দিকে ঝুঁকছে। একই সঙ্গে সংগঠনটি বিভিন্ন দেশে লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে আলোচিত তথ্য হলো, একিউআইএস বাংলাদেশে নিজেদের গোপন সেল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এতে আরও বলা হয়, সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশ আফগানিস্তানের কাবুলে অবস্থান করছে এবং তাদের তালেবানের দেওয়া বিশেষ পরিচয়পত্র রয়েছে।

তবে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জাতিসংঘের এই দাবির বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সিটিটিসি প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বলেছেন, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে বড় ধরনের জঙ্গি তৎপরতা বা নাশকতার আশঙ্কা তারা দেখছেন না। প্রতিটি ঘটনাই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ধারাবাহিক বোমা উদ্ধারে উদ্বেগ

জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ১৬ আগস্ট রাজধানীর ডেমরার পশ্চিম বক্সনগর নিঝুমবাগ-সানারপাড়া এলাকার একটি বাসা থেকে বোমাসদৃশ দুটি বস্তু উদ্ধার করে পুলিশ। সিটিটিসির বোম ডিসপোজাল ইউনিট সেগুলো নিষ্ক্রিয় করে।

এর আগে যাত্রাবাড়ীর জনপদ মোড়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে ‘ওস্তাদ জুয়েল’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকেই উদ্ধার হওয়া বোমাসদৃশ বস্তুগুলোর বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এ ছাড়া ১২ আগস্ট সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে নয়টি বিস্ফোরক ও বিপুল পরিমাণ গানপাউডার উদ্ধার করে সিটিটিসি। এ ঘটনায় নব্য জেএমবিতে যুক্ত থাকার অভিযোগে মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তকারীদের ভাষ্য, ইমরানের সঙ্গে নব্য জেএমবির বোমা বিশেষজ্ঞ নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’-এর যোগাযোগ ছিল।

এর আগে ৩০ জুলাই আশুলিয়ার একটি দোকানে ফেলে যাওয়া ব্যাগ থেকে বোমা উদ্ধার করা হয়। ২৪ জুলাই মতিঝিলের মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকেও শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যানবাহনে হামলার আশঙ্কায় দেশজুড়ে সতর্কতাও জারি করা হয়।

আতঙ্ক নয়, নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ

সাবেক আইজিপি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক নুরুল হুদার মতে, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট তথ্যের কিছু ঘাটতি থাকলেও সেটিকে অমূলক ধরে বসে থাকার সুযোগ নেই। তার মতে, উগ্রবাদ দমনে ধারাবাহিক নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি মনে করেন, বিশেষায়িত জঙ্গিবাদবিরোধী ইউনিটগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতাও জোরদার করা প্রয়োজন। তার ভাষায়, বড় ধরনের হামলা না ঘটলেও উগ্রবাদী তৎপরতার সম্ভাব্য উৎসগুলোকে নজরদারির বাইরে রাখা যাবে না।

অন্যদিকে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধার, গ্রেপ্তার এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদন; সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। কোনো ঘটনাকে তাড়াহুড়ো করে জঙ্গিবাদ হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রমাণ পাওয়ার আগেই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন বলেও উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।

তার মতে, পর্যাপ্ত তদন্ত ছাড়া কাউকে বা কোনো গোষ্ঠীকে দায়ী করলে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যেতে পারে। এমনকি ছোট পরিসরের ঘটনাগুলো ভবিষ্যতে বড় ধরনের নাশকতার প্রস্তুতি বা সক্ষমতা যাচাইয়ের অংশ কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে উগ্রবাদ ব্যবহারের আশঙ্কা

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর আরেকটি দিকও সামনে এসেছে; উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোকে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল রাজনৈতিক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে কি না।

নুরুল হুদার মতে, সব বোমা উদ্ধার বা বিস্ফোরণের ঘটনাকে জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসব ঘটনার পেছনে একাধিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তাই তদন্তে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা অন্য কোনো স্বার্থ জড়িত আছে কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকও নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, যথাযথ প্রমাণ ছাড়া কোনো পক্ষের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়া হলে প্রকৃত অপরাধীরা সুযোগ পেতে পারে। আবার এসব ছোট ঘটনা যদি ভবিষ্যৎ বড় নাশকতার প্রস্তুতি হয়, তাহলে শুরুতেই তা শনাক্ত করা জরুরি।

২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার স্মৃতি

সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের ঘটনায় ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার স্মৃতিও ফিরে এসেছে। ওই দিন মুন্সিগঞ্জ ছাড়া দেশের ৬৩ জেলায় প্রায় ৫০০টি স্থানে একযোগে বোমা হামলা চালায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবি। এতে দুজন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হন।

সেই ঘটনার পর দেশজুড়ে জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়। পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের নেটওয়ার্ক দুর্বল হলেও উগ্রবাদ পুরোপুরি নির্মূল হয়েছে; এমন দাবি করা কঠিন।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কারাগার থেকে সাজাপ্রাপ্ত কয়েকজন জঙ্গির পালিয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন মামলায় আটক ব্যক্তিদের জামিনে মুক্তির ঘটনাও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আলোচনায় এসেছে।

তাহলে শঙ্কা কতটা?

বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি বড় ধরনের জঙ্গি হামলার পূর্বাভাস হিসেবে দেখার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো প্রকাশ্যে নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বড় ধরনের নাশকতার আশঙ্কা নাকচ করছে। কিন্তু একই সময়ে একাধিক স্থানে বোমা উদ্ধার, বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম পাওয়া, নব্য জেএমবির সদস্য গ্রেপ্তার এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল-কায়েদার সেল গঠনের চেষ্টার কথা উঠে আসা; এসব ঘটনাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তাই আতঙ্ক ছড়ানোর চেয়ে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক তদন্ত ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো। উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরকগুলোর উৎস, ব্যবহারকারীদের যোগাযোগ, অর্থের জোগান, সাংগঠনিক সম্পর্ক এবং উদ্দেশ্য; সবকিছু খতিয়ে দেখা জরুরি।

একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বা অন্য স্বার্থে জঙ্গিবাদের অভিযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় থাকা দরকার। কারণ প্রকৃত নিরাপত্তা ঝুঁকি শনাক্ত করতে হলে যেমন উগ্রবাদী নেটওয়ার্ককে ছাড় দেওয়া যাবে না, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কাউকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করাও উচিত নয়।

সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘তাৎক্ষণিক বড় হামলার আতঙ্ক’ নয়, বরং ‘সতর্কতা বাড়ানোর মতো নিরাপত্তা সংকেত’ হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত। সময়মতো গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো গেলে সম্ভাব্য বড় ঝুঁকি আগেই মোকাবিলা করা সম্ভব।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

আল-কায়েদার সেল, ঝুঁকি কতটা, নেপথ্যে কারা?

সর্বশেষ আপডেট ০৯:৩৩:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা (একিউআইএস) গোপন সেল গঠনের চেষ্টা করছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ‘নব্য জেএমবি’র সদস্য গ্রেপ্তার ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাও সামনে এসেছে।

তবে এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে বড় ধরনের জঙ্গি হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে কি না; এ প্রশ্নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে কিছুটা ভিন্নমত রয়েছে। পুলিশ বলছে, আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই; বরং গোয়েন্দা নজরদারি ও তদন্ত আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উদ্বেগ

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিমের ১০ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে আল-কায়েদার আঞ্চলিক কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একিউআইএস বড় আকারের ইউনিটের পরিবর্তে ছোট ছোট গোপন সেলের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার দিকে ঝুঁকছে। একই সঙ্গে সংগঠনটি বিভিন্ন দেশে লজিস্টিক ও আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে আলোচিত তথ্য হলো, একিউআইএস বাংলাদেশে নিজেদের গোপন সেল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এতে আরও বলা হয়, সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশ আফগানিস্তানের কাবুলে অবস্থান করছে এবং তাদের তালেবানের দেওয়া বিশেষ পরিচয়পত্র রয়েছে।

তবে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জাতিসংঘের এই দাবির বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সিটিটিসি প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক বলেছেন, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে বড় ধরনের জঙ্গি তৎপরতা বা নাশকতার আশঙ্কা তারা দেখছেন না। প্রতিটি ঘটনাই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ধারাবাহিক বোমা উদ্ধারে উদ্বেগ

জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ১৬ আগস্ট রাজধানীর ডেমরার পশ্চিম বক্সনগর নিঝুমবাগ-সানারপাড়া এলাকার একটি বাসা থেকে বোমাসদৃশ দুটি বস্তু উদ্ধার করে পুলিশ। সিটিটিসির বোম ডিসপোজাল ইউনিট সেগুলো নিষ্ক্রিয় করে।

এর আগে যাত্রাবাড়ীর জনপদ মোড়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে ‘ওস্তাদ জুয়েল’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকেই উদ্ধার হওয়া বোমাসদৃশ বস্তুগুলোর বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এ ছাড়া ১২ আগস্ট সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে নয়টি বিস্ফোরক ও বিপুল পরিমাণ গানপাউডার উদ্ধার করে সিটিটিসি। এ ঘটনায় নব্য জেএমবিতে যুক্ত থাকার অভিযোগে মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তকারীদের ভাষ্য, ইমরানের সঙ্গে নব্য জেএমবির বোমা বিশেষজ্ঞ নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’-এর যোগাযোগ ছিল।

এর আগে ৩০ জুলাই আশুলিয়ার একটি দোকানে ফেলে যাওয়া ব্যাগ থেকে বোমা উদ্ধার করা হয়। ২৪ জুলাই মতিঝিলের মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকেও শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যানবাহনে হামলার আশঙ্কায় দেশজুড়ে সতর্কতাও জারি করা হয়।

আতঙ্ক নয়, নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ

সাবেক আইজিপি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক নুরুল হুদার মতে, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট তথ্যের কিছু ঘাটতি থাকলেও সেটিকে অমূলক ধরে বসে থাকার সুযোগ নেই। তার মতে, উগ্রবাদ দমনে ধারাবাহিক নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি মনে করেন, বিশেষায়িত জঙ্গিবাদবিরোধী ইউনিটগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতাও জোরদার করা প্রয়োজন। তার ভাষায়, বড় ধরনের হামলা না ঘটলেও উগ্রবাদী তৎপরতার সম্ভাব্য উৎসগুলোকে নজরদারির বাইরে রাখা যাবে না।

অন্যদিকে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধার, গ্রেপ্তার এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদন; সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। কোনো ঘটনাকে তাড়াহুড়ো করে জঙ্গিবাদ হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রমাণ পাওয়ার আগেই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন বলেও উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।

তার মতে, পর্যাপ্ত তদন্ত ছাড়া কাউকে বা কোনো গোষ্ঠীকে দায়ী করলে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যেতে পারে। এমনকি ছোট পরিসরের ঘটনাগুলো ভবিষ্যতে বড় ধরনের নাশকতার প্রস্তুতি বা সক্ষমতা যাচাইয়ের অংশ কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে উগ্রবাদ ব্যবহারের আশঙ্কা

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর আরেকটি দিকও সামনে এসেছে; উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোকে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল রাজনৈতিক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে কি না।

নুরুল হুদার মতে, সব বোমা উদ্ধার বা বিস্ফোরণের ঘটনাকে জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসব ঘটনার পেছনে একাধিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তাই তদন্তে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা অন্য কোনো স্বার্থ জড়িত আছে কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকও নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, যথাযথ প্রমাণ ছাড়া কোনো পক্ষের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়া হলে প্রকৃত অপরাধীরা সুযোগ পেতে পারে। আবার এসব ছোট ঘটনা যদি ভবিষ্যৎ বড় নাশকতার প্রস্তুতি হয়, তাহলে শুরুতেই তা শনাক্ত করা জরুরি।

২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার স্মৃতি

সাম্প্রতিক বোমা উদ্ধারের ঘটনায় ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার স্মৃতিও ফিরে এসেছে। ওই দিন মুন্সিগঞ্জ ছাড়া দেশের ৬৩ জেলায় প্রায় ৫০০টি স্থানে একযোগে বোমা হামলা চালায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবি। এতে দুজন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হন।

সেই ঘটনার পর দেশজুড়ে জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়। পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের নেটওয়ার্ক দুর্বল হলেও উগ্রবাদ পুরোপুরি নির্মূল হয়েছে; এমন দাবি করা কঠিন।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কারাগার থেকে সাজাপ্রাপ্ত কয়েকজন জঙ্গির পালিয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন মামলায় আটক ব্যক্তিদের জামিনে মুক্তির ঘটনাও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আলোচনায় এসেছে।

তাহলে শঙ্কা কতটা?

বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি বড় ধরনের জঙ্গি হামলার পূর্বাভাস হিসেবে দেখার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো প্রকাশ্যে নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বড় ধরনের নাশকতার আশঙ্কা নাকচ করছে। কিন্তু একই সময়ে একাধিক স্থানে বোমা উদ্ধার, বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম পাওয়া, নব্য জেএমবির সদস্য গ্রেপ্তার এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল-কায়েদার সেল গঠনের চেষ্টার কথা উঠে আসা; এসব ঘটনাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তাই আতঙ্ক ছড়ানোর চেয়ে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক তদন্ত ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো। উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরকগুলোর উৎস, ব্যবহারকারীদের যোগাযোগ, অর্থের জোগান, সাংগঠনিক সম্পর্ক এবং উদ্দেশ্য; সবকিছু খতিয়ে দেখা জরুরি।

একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বা অন্য স্বার্থে জঙ্গিবাদের অভিযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় থাকা দরকার। কারণ প্রকৃত নিরাপত্তা ঝুঁকি শনাক্ত করতে হলে যেমন উগ্রবাদী নেটওয়ার্ককে ছাড় দেওয়া যাবে না, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কাউকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করাও উচিত নয়।

সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘তাৎক্ষণিক বড় হামলার আতঙ্ক’ নয়, বরং ‘সতর্কতা বাড়ানোর মতো নিরাপত্তা সংকেত’ হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত। সময়মতো গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো গেলে সম্ভাব্য বড় ঝুঁকি আগেই মোকাবিলা করা সম্ভব।