এক যুগ পেরিয়েও সংকটে নিমজ্জিত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:০২:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
- / 45
প্রতিষ্ঠার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, আবাসন, পরিবহন ও প্রশাসনিকসহ নানা সংকটে জর্জরিত দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রতিষ্ঠান বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি)। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও বিভাগের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল। ফলে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫টি বিভাগে শিক্ষার্থী রয়েছেন ১০ হাজারের বেশি। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য শ্রেণিকক্ষ রয়েছে মাত্র ৩৬টি এবং ল্যাবরুম ৩১টি। শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর, ছয় দফা চত্বর কিংবা গাছতলায়ও ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক পরিবেশে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
শ্রেণিকক্ষের সংকটের পাশাপাশি রয়েছে শিক্ষক সংকটও। ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ২১০ জন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধশত শিক্ষক উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ফলে বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। একাধিক কোর্সের পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ ও খাতা মূল্যায়নের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে শিক্ষকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সেশনজটের আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে সংকট সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও এখনো দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি বলে তাদের দাবি।
আবাসন সুবিধা অপ্রতুল
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটও দীর্ঘদিনের। বর্তমানে চারটি আবাসিক হল রয়েছে; ছাত্রদের জন্য দুটি এবং ছাত্রীদের জন্য দুটি। প্রতিটি হলে প্রায় ৫০০টি করে আসন রয়েছে। সব মিলিয়ে মোট আসনসংখ্যা শিক্ষার্থীর তুলনায় অত্যন্ত কম হওয়ায় আবাসিক সুবিধা পাচ্ছেন আনুমানিক ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী। বাকিদের ক্যাম্পাসের বাইরে বাসা বা মেসে থাকতে হচ্ছে।
পরিবহনেও সংকট
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ব্যবস্থাও চলছে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বাস রয়েছে মাত্র ১১টি। এ কারণে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) কাছ থেকে বাস ভাড়া করে পরিবহন সেবা চালু রাখা হয়েছে।
তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিআরটিসির ভাড়া করা অনেক বাসই পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো বাসের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে, আবার কোনো বাসের আসন ভাঙা। ফলে অনেকটা জোড়াতালি দিয়েই চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ব্যবস্থা।
নেই নিজস্ব অডিটোরিয়াম
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো অডিটোরিয়ামও নেই। ফলে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি আয়োজনের জন্য ক্যাম্পাসের বাইরে যেতে হচ্ছে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি অনুষ্ঠান জেলা শিল্পকলা একাডেমির অডিটোরিয়ামে আয়োজন করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মতে, দেশের অনেক কলেজেও যেসব মৌলিক সুবিধা রয়েছে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েও তারা সেসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
প্রশাসনেও গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য
শুধু একাডেমিক ও অবকাঠামোগত সংকট নয়, প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে উপ-উপাচার্য নেই। একই সঙ্গে স্থায়ী রেজিস্ট্রার ও কোষাধ্যক্ষও নেই। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ও কোষাধ্যক্ষ দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে প্রশাসনিক কাজে জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী গালিব বলেন, “প্রতিষ্ঠার এক যুগ পেরোলেও শিক্ষার্থী বাড়ার তুলনায় আবাসন, শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক ও পরিবহন সুবিধা পর্যাপ্ত হয়নি। আবাসন সংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকতে হচ্ছে। শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ সংকটে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলো দ্রুত পূরণ করে মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী চৈতী আক্তার বলেন, “আমাদের বিভাগে মাত্র তিনজন শিক্ষক নিজেদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। কিন্তু শিক্ষক সংকটের কারণে সব ব্যাচের ক্লাসের সময়সূচি সমন্বয় করতে গিয়ে তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। প্রত্যেক শিক্ষককে ছয়-সাতটি করে কোর্স নেওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষা গ্রহণ ও খাতা মূল্যায়ন করতে হচ্ছে। আবার শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে এক ব্যাচের ক্লাস চলার সময় অন্য ব্যাচের শিক্ষার্থীদের বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ; দুই সংকটই কমানো গেলে একাডেমিক পরিবেশ অনেকটা স্বস্তিদায়ক হবে।”
যা বলছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক সংকটের বিষয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদ বলেন, “একাডেমিক বিল্ডিং-৩ নির্মাণের প্রস্তাব ইউজিসির মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। শিক্ষক সংকটের বিষয়টিও ইউজিসিকে জানানো হয়েছে।”
আবাসন সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আবাসন ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে বড় ধরনের উন্নয়ন সম্ভব নয়, সময় লাগবে।”
পরিবহন সংকট নিয়ে উপাচার্য বলেন, “নতুন বাস কেনার মতো প্রয়োজনীয় তহবিল আমাদের নেই। আমরা একটি আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স কেনার উদ্যোগ নিয়েছি। কারণ বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে সেটি আধুনিক নয়। বিআরটিসি কর্তৃপক্ষকে ভালো মানের বাস দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছি। তারা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এখন তারা আমাদের অনুরোধ রাখে কি না, সেটি দেখার বিষয়।”



































