ঢাকা ১২:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি সংকটে চাপে অর্থনীতি, ভরসা রেমিট্যান্সে

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:১২:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
  • / 7

জ্বালানি সংকটে চাপে অর্থনীতি, ভরসা রেমিট্যান্সে

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। এই ১৮০ দিনে অর্থনীতির সাফল্য-ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বিভিন্ন সূচকে। তবে সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনীতির বাস্তব অবস্থা সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হয় বাজারে; দ্রব্যমূল্য কমেছে কি না, মূল্যস্ফীতি কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, সেটিই তাদের কাছে বড় প্রশ্ন।

ছয় মাস আগে ফেব্রুয়ারিতে দেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। জুলাইয়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে আসেনি।

অর্থনীতিতে চাপ বাড়ানোর অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে জ্বালানি সংকট। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের উৎপাদন, পরিবহন ও পণ্য পরিবহন ব্যয়ে। গত অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতেই বাংলাদেশকে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করতে হয়েছে।

তবে আমদানি ব্যয়ের চাপ থাকলেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের ধাক্কা লাগেনি। দেশে বিনিয়োগ কম থাকায় মূলধনী পণ্যসহ অন্যান্য পণ্যের আমদানির চাহিদাও তুলনামূলক কম ছিল। ফলে সরকারের ছয় মাসের মাথায় আগস্টে দেশের গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে প্রায় ৩৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। রিজার্ভের স্থিতিশীলতার কারণে ডলারের বিনিময় হারও ১২৩ টাকার আশপাশে রয়েছে।

অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেটে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ডেড ওয়্যারহাউসসহ এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হবে। তবে রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না এলে ভবিষ্যতে ঋণঝুঁকি বাড়তে পারে।

অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচকে স্বস্তি থাকলেও রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এর সঙ্গে জ্বালানি ও সার আমদানি বাড়ায় সামগ্রিক আমদানিও বেড়েছে। ফলে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকেও বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে জ্বালানি সংকট ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কারসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন। এসব সমস্যা সমাধান না হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন।

তবে অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠেছে প্রবাসী আয়। গত অর্থবছরে প্রবাসীরা ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এই অর্থ দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহের কারণে বাণিজ্য ঘাটতির বিপরীতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি উদ্বৃত্ত হয়েছে।

অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ রয়েছে। তবে সরকারের প্রথম ছয় মাসে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর বড় কোনো ব্যতিক্রমী সমাধান বা দৃশ্যমান উন্নতি এখনো দেখা যায়নি।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে দ্রুত জ্বালানি সংকটের সমাধান জরুরি। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন ও রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না এলে রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দিতে পারবে না।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

জ্বালানি সংকটে চাপে অর্থনীতি, ভরসা রেমিট্যান্সে

সর্বশেষ আপডেট ১১:১২:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। এই ১৮০ দিনে অর্থনীতির সাফল্য-ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে বিভিন্ন সূচকে। তবে সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনীতির বাস্তব অবস্থা সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হয় বাজারে; দ্রব্যমূল্য কমেছে কি না, মূল্যস্ফীতি কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, সেটিই তাদের কাছে বড় প্রশ্ন।

ছয় মাস আগে ফেব্রুয়ারিতে দেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। জুলাইয়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে আসেনি।

অর্থনীতিতে চাপ বাড়ানোর অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে জ্বালানি সংকট। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের উৎপাদন, পরিবহন ও পণ্য পরিবহন ব্যয়ে। গত অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতেই বাংলাদেশকে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করতে হয়েছে।

তবে আমদানি ব্যয়ের চাপ থাকলেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের ধাক্কা লাগেনি। দেশে বিনিয়োগ কম থাকায় মূলধনী পণ্যসহ অন্যান্য পণ্যের আমদানির চাহিদাও তুলনামূলক কম ছিল। ফলে সরকারের ছয় মাসের মাথায় আগস্টে দেশের গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে প্রায় ৩৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। রিজার্ভের স্থিতিশীলতার কারণে ডলারের বিনিময় হারও ১২৩ টাকার আশপাশে রয়েছে।

অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেটে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ডেড ওয়্যারহাউসসহ এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হবে। তবে রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না এলে ভবিষ্যতে ঋণঝুঁকি বাড়তে পারে।

অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচকে স্বস্তি থাকলেও রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এর সঙ্গে জ্বালানি ও সার আমদানি বাড়ায় সামগ্রিক আমদানিও বেড়েছে। ফলে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকেও বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে জ্বালানি সংকট ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কারসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন। এসব সমস্যা সমাধান না হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন।

তবে অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠেছে প্রবাসী আয়। গত অর্থবছরে প্রবাসীরা ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এই অর্থ দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহের কারণে বাণিজ্য ঘাটতির বিপরীতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি উদ্বৃত্ত হয়েছে।

অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ রয়েছে। তবে সরকারের প্রথম ছয় মাসে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর বড় কোনো ব্যতিক্রমী সমাধান বা দৃশ্যমান উন্নতি এখনো দেখা যায়নি।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে দ্রুত জ্বালানি সংকটের সমাধান জরুরি। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন ও রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না এলে রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দিতে পারবে না।