তদন্তে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক
সিলেটে বিএডিসির ৭৫ কোটি টাকায় কমিশন বাণিজ্য
- সর্বশেষ আপডেট ০৮:৪৬:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
- / 39
সিলেটে এনআরবি ব্যাংকের একটি শাখায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) ৭৫ কোটি টাকার আমানতকে কেন্দ্র করে এজেন্ট ব্যাংকিং কমিশন ব্যবস্থার সম্ভাব্য অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাধারণ ব্রাঞ্চ ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রহণ করা ওই আমানত পরে এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্থানান্তর করা হয়। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এজেন্টকে প্রায় ২৫ লাখ ৭১ হাজার টাকা কমিশন দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিষয়টি তদন্তে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অভিযোগে এনআরবি ব্যাংকের সিলেট অঞ্চলের প্রধান প্রশান্ত কুমার সিংহ, বড়লেখা শাখার ব্যবস্থাপক জুনায়েদ আহমেদ এবং গোয়াইনঘাটের তৌয়াকুল বাজারের এজেন্ট সাদিকুর রহমানের নাম এসেছে। ব্যাংকের একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে দুই দফা চিঠি দিয়েছেন। চিঠির অনুলিপি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানকেও দেওয়া হয়েছে।
প্রথম চিঠিটি দেওয়া হয় চলতি বছরের ২০ জুলাই এবং দ্বিতীয়টি ৬ সেপ্টেম্বর। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট নথি ও তথ্য সংগ্রহ করেছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি তদন্ত দল এ বিষয়ে ব্যাংকে যায় বলে জানা গেছে।
অভিযোগকারী ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এনআরবি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ১৭৩তম সভায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের জন্য কমিশন কাঠামো অনুমোদন করে। এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রকৃতভাবে আমানত সংগ্রহ করা হলে নির্ধারিত কমিশন দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে তাঁদের অভিযোগ, বিএডিসির ৭৫ কোটি টাকার আমানতটি এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত না হলেও পরবর্তী সময়ে সেটিকে ওই চ্যানেলে দেখিয়ে কমিশন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বিএডিসি গত বছরের ১৩ আগস্ট এনআরবি ব্যাংকের সিলেট শাখায় হিসাব খোলার জন্য চিঠি দেয়। পরে হিসাব খোলার পর ৭৫ কোটি টাকার একটি চেক গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর শাখায় জমা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, আমানতটি প্রথমে ব্যাংকের প্রচলিত ব্রাঞ্চ ব্যাংকিং সিস্টেমে লিপিবদ্ধ করা হয় এবং রিলেশনশিপ ম্যানেজারের কোডে জুনায়েদ আহমেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এরপর গত বছরের ৪ ডিসেম্বর সিলেট অঞ্চলের প্রধান প্রশান্ত কুমার সিংহ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুমোদনের জন্য একটি সংশোধনী স্মারক উপস্থাপন করেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আমানতটি ভুল কোডে লিপিবদ্ধ হয়েছে দাবি করে সংশোধনের কথা বলা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, এর আগেই ২৬ নভেম্বর আমানতটি এজেন্ট ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মে অন্তর্ভুক্ত বা স্থানান্তর করা হয়। ফলে এজেন্ট কমিশন দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ওই প্রক্রিয়ায় সাদিকুর রহমানের এজেন্ট হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও দাবি করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী ওই এজেন্টকে প্রায় ২৫ লাখ ৭১ হাজার ২৪৩ টাকা ৪৬ পয়সা কমিশন হিসেবে ম্যানুয়ালি দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আরও কমিশন দেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুদকের কাছে জানতে চেয়েছেন, আমানতটি প্রকৃতপক্ষে কোন চ্যানেলে সংগৃহীত হয়েছিল, ব্রাঞ্চ ব্যাংকিংয়ে লিপিবদ্ধ করার পর কেন তা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে স্থানান্তর করা হয় এবং এ পুনঃশ্রেণিবিন্যাসের অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এজেন্টকে দেওয়া কমিশন প্রকৃত ব্যবসার বিপরীতে দেওয়া হয়েছিল কি না এবং কমিশনের অর্থ পরে অন্য কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের কাছে গেছে কি না, তা খতিয়ে দেখার অনুরোধ করা হয়েছে।
তদন্তের অংশ হিসেবে বিএডিসির হিসাব খোলা ও আমানত স্থাপনের নথি, সিবিএসের লেনদেনের ট্রেইল, স্থানান্তরের অডিট লগ, অনুমোদনসংক্রান্ত নথি, পরিচালনা পর্ষদের কমিশন নীতিমালা, সংশোধনী মেমো, কমিশন পরিশোধের ভাউচার এবং সংশ্লিষ্ট এজেন্ট হিসাবের লেনদেনের বিবরণ পরীক্ষা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এদিকে এনআরবি ব্যাংকে কমিশনসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ এর আগেও উঠেছিল বলে জানা গেছে। ব্যাংকের এক নারী কর্মীর কমিশন না পাওয়ার অভিযোগে তাঁর বাবা ও অবসরপ্রাপ্ত ডিজিএম শ্যামাকান্ত চক্রবর্তী গত বছরের জুনে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে চিঠি দেন। ওই অভিযোগেও প্রশান্ত কুমার সিংহের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল।
বর্তমান অভিযোগের বিষয়ে প্রশান্ত কুমার সিংহের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় এবং তাঁর ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তের পরদিন তিনি ভারত যান। তবে এ তথ্যের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বড়লেখা শাখার ব্যবস্থাপক জুনায়েদ আহমেদও অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্যদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনআরবি ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, প্রশান্ত কুমার সিংহ দীর্ঘদিন ধরে কমিশনভিত্তিক আমানত সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত এবং এ ধরনের কার্যক্রমে তিনি সুবিধাভোগী। ব্যাংকের চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় বিষয়টি নিয়ে কেউ ব্যবস্থাপনার কাছে কথা বলতে সাহস করেননি বলেও তাঁরা দাবি করেন। এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ; এর স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুদকের তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা এবং কমিশন প্রদানের পুরো প্রক্রিয়া স্পষ্ট হবে। অনিয়ম বা অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রশান্ত কুমার সিংহ গত মাসে নির্ধারিত অবসরের বয়সে পৌঁছানোর পর ব্যাংক থেকে অবসর নেন। পরে তাঁকে চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনার অনুরোধ করা হয়েছে।
































