শেখ হাসিনার আস্থাভাজন হতে চান ব্যাংক লুটেরা জাহাঙ্গীর
- সর্বশেষ আপডেট ০১:২১:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
- / 247
ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের মামলার অন্যতম আসামি ব্যাংকটির সাবেক নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মতিঝিল শাখার তৎকালীন প্রধান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম মজুমদার। প্রায় ৬৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় তাঁর নাম রয়েছে। ব্যাংকটির আলোচিত ঋণ কেলেঙ্কারির সময় তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। সেই জাহাঙ্গীর এখন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে নতুন রাজনৈতিক পরিচয় তৈরির চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রবাসে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজনের উদ্যোগও নিচ্ছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের আলোচিত এই কেলেঙ্কারিতে জাহাঙ্গীরের ভূমিকা নিয়ে অবশ্য নতুন করে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ নেই। কারণ, তাঁর নাম রয়েছে দুদকের দায়ের করা মামলার এজাহারে। ২০২০ সালের ২১ জুলাই প্রায় ৬৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মাহবুবুল হক চিশতী ওরফে বাবুল চিশতীসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলাটি করে দুদক। আসামিদের একজন ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম মজুমদার।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ফারমার্স ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে ঋণের নামে ৪০ কোটি ৭৯ লাখ ২১ হাজার টাকা বের করে নেন। ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সুদ-আসলসহ ওই অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬২ কোটি ৯৬ লাখ ৭৫ হাজার ৬১৯ টাকা। মামলায় মাহবুবুল হক চিশতী, তাঁর ছেলে রাশেদুল হক চিশতী, জাহাঙ্গীর আলম মজুমদার এবং আল-ফারুক ব্যাগস লিমিটেডের তিন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়।
দুদকের এজাহার অনুযায়ী, বগুড়ার আল-ফারুক ব্যাগস লিমিটেড ফারমার্স ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বকশীগঞ্জ জুট স্পিনার্সের সরাসরি ব্যবসায়িক সম্পর্ক না থাকলেও ঋণের অর্থ থেকে ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ওই প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা দেওয়া হয়েছিল। বকশীগঞ্জ জুট স্পিনার্স ছিল চিশতী পরিবারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা জমির মূল্যও অতিরিক্ত দেখানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করে দুদক।
ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে অনুসন্ধানের একপর্যায়ে ২০১৮ সালের এপ্রিলে ব্যাংকটির ১৭ কর্মকর্তা ও গ্রাহকের বিদেশযাত্রা ঠেকাতে পুলিশের বিশেষ শাখাকে চিঠি দেয় দুদক। সেই তালিকায় ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম মজুমদারও। দুদকের আশঙ্কা ছিল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের অনুসন্ধান এড়াতে দেশ ছাড়তে পারেন।
তবে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে দুদকের চিঠি এবং আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার পরও গোপনে দেশ ছাড়েন জাহাঙ্গীর আলম মজুমদার।
পালিয়ে প্রথমে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করেন। সেখানে হুন্ডির মাধ্যমে নেওয়া অর্থ বিনিয়োগ করে ব্যবসা শুরু করার অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগভিত্তিক ভিসা নিয়ে পরিবারসহ সেখানে বসবাস শুরু করেন বলে নিশ্চিত করেছে জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠজনরা।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে জাহাঙ্গীর এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁর অতীতের ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড ও দুদকের মামলার বিষয়টি সামনে না এনে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন বলে প্রবাসী মহলে আলোচনা রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে সেখানে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। সংগঠনটির সভাপতি করা হয়েছে একজন স্বনামধন্য বীর মুক্তিযোদ্ধাকে।
এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনলাইনে প্রধান অতিথি করে একটি সেমিনার আয়োজনের পরিকল্পনা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি এবং দলটির রাজনীতিতে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
তবে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা এমন বিতর্কিত ব্যক্তিকে সংগঠনে জায়গা দিতে আগ্রহী নন বলে দাবি করা হচ্ছে। শেখ হাসিনাকে জাহাঙ্গীরের আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠানে যুক্ত করার আগে তাঁর অতীতের ব্যাংক কেলেঙ্কারি ও দুদকের মামলার বিষয়টি অবহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলেও কয়েকজন নেতার অবস্থানের কথা জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দুদকের মামলার আসামি হিসেবে জাহাঙ্গীর আলম মজুমদারের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি, তাঁর অবস্থান, বিদেশে অর্থ বিনিয়োগের উৎস এবং বর্তমান রাজনৈতিক তৎপরতা; সবকিছুই স্বচ্ছভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে কেউ যদি অতীতের অভিযোগ আড়াল করতে চান, তাহলে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেছেন, জাহাঙ্গীর আলম মজুমদার একজন বিতর্কিত মানুষ। ডিসেম্বরকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যখন দেশে ফেরার সব প্রস্তুতি নিচ্ছেন; তখন জাহাঙ্গীরের মতো হাইব্রিডদের আলোচনায় যোগ দিলে সেটি দলের জন্যও বিব্রতকর হতে পারে। তৃণমূল নেতাকর্মীরা যেখানে কারাবরণ করছেন, নির্যাতন সহ্য করছেন শেখ হাসিনার ফেরার আশায়; সেখানে এমন কারো আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিলে দলের জন্য ক্ষতিই বয়ে আনতে পারে।
অনেক জাহাঙ্গীর আলম গুপ্ত রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কিনা, সেটাও খতিয়ে দেখার দাবি তুলেছেন।






























