চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কেএস মং
‘সাংবিধানিক স্বীকৃতিই চেয়েছি, বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়’
- সর্বশেষ আপডেট ০২:৫৮:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬
- / 15
পাহাড় ও সমতলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি কোনোভাবেই বিচ্ছিন্নতাবাদের উদ্দেশ্যে নয় বলে মন্তব্য করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কেএস মং।
রোববার (৯ আগস্ট) সকালে বান্দরবানের ঐতিহ্যবাহী রাজার মাঠে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
কেএস মং বলেন, নিজেদের অধিকার, পরিচয় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যই পাহাড়ের জনগোষ্ঠী সাংবিধানিক স্বীকৃতি চায়। এটি তাদের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে এসব দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি থাকায় পাহাড়ে এখনো নানা সংকট বিরাজ করছে।
তিনি বলেন, পাহাড়ের মানুষ নিজেদের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষায় সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানালেই কিছু ‘ভুঁইফোঁড়’ সংগঠন এর বিরোধিতা করে। এমনকি পাহাড়ে বসবাসকারী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে অপপ্রচার চালানো হয়। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কেএস মং বলেন, এসব অপপ্রচার থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
‘চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি’
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে কেএস মং বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাস্তবতা ও দেশের সংবিধানকে বিবেচনায় নিয়ে স্বশাসিত অঞ্চলের কাঠামো প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এ চুক্তি হয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন করে শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠা তার উদাহরণ।
তবে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কেএস মং বলেন, আইন ও শাসনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হলে ভূমি কমিশনকে বিশেষ মহলের প্রভাব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্ত করে কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে আদিবাসীদের সম্মিলিত ও প্রথাগত ভূমির মালিকানাকে আইনি সুরক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, এর মাধ্যমে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথও সহজ হবে।
প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার আহ্বান
পাহাড়ের উন্নয়ন প্রসঙ্গে কেএস মং বলেন, পাহাড়, বন ও পাথরসহ প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত আহরণ এবং বন ধ্বংস করে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। অথচ পাহাড়ের মানুষ প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ না করে এর সঙ্গে সমন্বয় করে জীবনযাপন করে আসছে।
তিনি বলেন, প্রকৃতি থেকে কতটুকু সম্পদ নিতে হবে এবং কীভাবে তা সংরক্ষণ করতে হবে, সে বিষয়ে পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যগত জ্ঞান রয়েছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সেই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আলোচনা সভায় বক্তারা আদিবাসীদের ভূমির অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, রাজনৈতিক ও মানবাধিকার, মৌলিক স্বাধীনতা এবং সংস্কৃতি-ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের দাবি জানান। পাশাপাশি নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা এবং আদিবাসীদের প্রতি সব ধরনের বৈষম্যের অবসানেরও আহ্বান জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আদিবাসী ফোরামের সভাপতি ডা. মং উষাথোয়াই। উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান থোয়াইং চ প্রু মাস্টার।
আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম রাইটার্স ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ক্যসামং মারমা। সভায় আরও বক্তব্য দেন মেন রুং ম্রো, আদিবাসী ফোরামের সহসাধারণ সম্পাদক কৃপা ত্রিপুরা, রিপন চক্রবর্তী, জিরকুম সাহু ও উছোমং মারমা।
আলোচনা সভা শেষে রাজার মাঠ থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি বান্দরবান শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় রাজার মাঠে গিয়ে শেষ হয়।
র্যালিতে মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খুমী, লুসাইসহ ১২টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ-তরুণী এবং বিভিন্ন পাহাড়ি সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
































