রেলের পূর্বাঞ্চলে শাহ আলম ‘একাই একশ’!
- সর্বশেষ আপডেট ০৪:১২:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
- / 640
রেলের লাইন, সেতু, ভবন, অবকাঠামো- সবই সরকারি অর্থে। কিন্তু সেই কাজের টেন্ডার পেতে দিতে হয় ‘অতিরিক্ত খরচ’! রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের টেন্ডার ঘিরে এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে এস এ কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী মো. শাহ আলম। একাধারে তিনি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ঠিকাদার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব। সরকার পরিবর্তন হলেও এই ব্যাক্তির অবস্থানের কোন পরিবর্তন হয়নি।
জানা যায়, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিবন্ধিত প্রায় ১ হাজার ২০০ ঠিকাদার রয়েছে। তাদের একটি অংশের অভিযোগ, টেন্ডার পেলেই তাদের নির্দিষ্ট হারে অর্থ দিতে হয় কথিত ঠিকাদার অ্যাসোসিয়েশনকে। হার ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত।
ঠিকাদারদের ভাষ্য, এই অর্থ না দিলে শুধু টেন্ডার পাওয়াই নয়, কাজের কার্যাদেশ পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশল, কমার্শিয়াল, সরঞ্জাম ক্রয়, ভূ-সম্পত্তি ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিভাগে নিয়মিত টেন্ডার হয়। ঠিকাদারদের দাবি, এসব টেন্ডারের বড় একটি অংশে সংগঠনের নামে অর্থ আদায়ের চাপ থাকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদারের অভিযোগ, টেন্ডার পাওয়ার পর নির্ধারিত অর্থ নগদে বুঝিয়ে দিতে হয়। এরপরই মেলে কার্যাদেশ পাওয়ার নিশ্চয়তা। অর্থ না দিলে শুরু হয় নানা ধরনের চাপ। কখনো ফাইল আটকে রাখা, কখনো কার্যাদেশ দিতে বিলম্ব, আবার কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী ঠিকাদারকে ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি-এমন নানা অভিযোগ করেছেন তারা।
ঠিকাদারদের দাবি, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশলসহ বিভিন্ন বিভাগে বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার উন্নয়নকাজের টেন্ডার হয়। এর মাত্র ২ শতাংশ কমিশন ধরলেও বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা। ৩ শতাংশ হলে ৩০ কোটি। প্রশ্ন উঠছে- এই অর্থ কোথায় যায়? ঠিকাদারদের দাবি, সংগৃহীত অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব তাদের সামনে প্রকাশ করা হয় না।
রেলওয়ে ঠিকাদারদের সংগঠন নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। ঠিকাদারদের দাবি, সংগঠনটির কোনো সরকারি নিবন্ধন নেই। নেই নিয়মিত নির্বাচনও। ফলে দীর্ঘদিন ধরে একটি আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমেই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই কমিটির আহ্বায়ক শফিকুর রহমান স্বপন এবং সদস্য সচিব মো. শাহ আলম।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন- হাজারো ঠিকাদারের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সংগঠনের যদি নিবন্ধন ও নিয়মিত নির্বাচনই না থাকে, তাহলে সংগঠনের নামে অর্থ আদায় ও ব্যয়ের জবাবদিহি করবে কে?
শাহ আলমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের। ঠিকাদারদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শাহ আলম চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তখন রেলের টেন্ডার ও ঠিকাদারি অঙ্গনে বাবরের প্রভাব ছিল।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাবর আত্মগোপনে চলে গেলে সেই প্রভাবের জায়গায় শাহ আলম নিজেই সক্রিয় হয়ে ওঠেন- এমন দাবি ঠিকাদারদের। পরে বিএনপি ঘরানার পরিচিতি ব্যবহার করে রেলওয়ের ঠিকাদারি অঙ্গনে নতুন করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও ওঠে।
ঠিকাদারদের কেউ কেউ শাহ আলমকে ‘রেলের রাজা’, কেউ ‘টেন্ডারের গডফাদার’ নামে অভিহিত করেন।
তাদের অভিযোগ, সংগঠনের পদ এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে তিনি রেলওয়ের বিভিন্ন দপ্তরের টেন্ডারে প্রভাব বিস্তার করেন।
এমনকি রেল ভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মন্ত্রী-সচিব কিংবা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা বলে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের আরেকটি বড় দিক এস এ কর্পোরেশনকে ঘিরে। ঠিকাদারদের দাবি, সংগঠনের ওপর প্রভাব এবং রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে শাহ আলমের প্রতিষ্ঠান বছরে কয়েকশ কোটি টাকার টেন্ডার পেয়ে থাকে। কেউ কেউ দাবি করছেন, বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার কাজ এস এ কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণে যায়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার মো. শাহ আলম এর সাথে যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য জানা যায়নি।



































