ঘষামাজা সনদ নিয়ে বিমানে ২৭ বছর চাকরি!
- সর্বশেষ আপডেট ১১:২৬:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 26
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের গ্রাউন্ড সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের সহকারী ব্যবস্থাপক মাসুদা খানমকে ঘিরে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে শিক্ষাগত সনদে তথ্যের অসঙ্গতি, নিয়োগের শর্ত লঙ্ঘন, পদায়নে প্রভাব বিস্তার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ১৯৯৯ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে ট্রাফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে নিয়োগের সময় মাসুদা খানম যে শিক্ষাগত সনদ দাখিল করেছিলেন, তাতে বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য নিয়ে অসঙ্গতি ছিল। তাঁদের অভিযোগ, তৎকালীন নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য না থাকা এবং নির্ধারিত বয়সসীমা অতিক্রম করার কারণে যোগ্যতা অর্জনে সমস্যা থাকলেও ভুয়া বা ঘষামাজা করা সনদ দাখিলের মাধ্যমে তিনি নিয়োগ নেন।
বাংলা অ্যাফেয়ার্সের হাতে আসা নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৮৫ সালে ফরিদপুরের হালিমা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এসএসসি পাসের তথ্য রয়েছে। এর ছয় বছর পর ১৯৯১ সালে বান্দরবানের লামা কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে নিয়মিত ছাত্রী হিসেবে প্রথম বিভাগে এইচএসসি পাসের একটি সনদ পাওয়া যায়।
অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সনদে হাতের লেখার ভিন্নতা, ‘নিয়মিত’ শব্দের বানানে অসঙ্গতি এবং সাল ও জন্মতারিখের ঘষামাজার চিহ্ন স্পষ্ট। একই ধরনের অসঙ্গতি তাঁর ডিগ্রি সনদেও রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ১৯৯৯ সালে তৎকালীন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের সুপারিশে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে যোগ দেন মাসুদা খানম। এরপর ‘ফরিদপুর কোটায়’ বিগত সরকারের সময়ে প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন সুবিধাজনক হিসেবে পরিচিত ‘হোটেল বিলিং সেকশনে’ দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে সহকারী ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতির পর শেরাটন হোটেলের বিল পরিশোধ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়, যা পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পর্যন্ত গড়ায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে ফ্লাইটে বদলি করা হলেও প্রশাসনিক আদেশ অমান্য করে এবং নিজস্ব প্রভাববলয় কাজে লাগিয়ে পরে আবারও হোটেল বিলিং শাখায় ফিরে আসেন।
সবচেয়ে স্পর্শকাতর অভিযোগটি উঠেছে ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কারাঅন্তরীণ সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সেদিন মাসুদা খানমের নির্ধারিত ডিউটি না থাকা সত্ত্বেও তিনি ও তার স্বামী (বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) এভিয়েশন সিকিউরিটি বিভাগের পরিচালক ইফতেখার জাহান হোসেন) বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পলককে দেশত্যাগে সহায়তার গুঞ্জন উঠলে গোয়েন্দা সংস্থার জেরার মুখে তারা সটকে পড়েন।
পরবর্তীতে স্বামীর পদের প্রভাব খাটিয়ে বিমানবন্দরের ঐ দিনের সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
বিমানবন্দর একটি স্পর্শকাতর কেপিআই এলাকা হওয়া সত্ত্বেও মাসুদা খানমের বিরুদ্ধে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিসিটিভি ফুটেজ বাইরে পাচার করার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যা আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) মানদণ্ড অনুযায়ী জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। এছাড়া বেবিচক পাস ব্লক করার হুমকি দিয়ে তিনি সহকর্মীদের ওপর নিয়মিত মানসিক চাপ সৃষ্টি করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ আছে, ৫ আগস্টের আগে বৃহত্তর ফরিদপুর গোপালগঞ্জের আওয়ামী লীগের প্রভাব দেখিয়ে চলতেন তিনি। আওয়ামী লীগের সময় সে সুধাসদনে যাতায়াতের বিষয়ে সহকর্মীদের গর্ব করে বলতেন। শেখ হাসিনা নাকি তাকে ‘মিনা’বলে ডাকতেন। সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সাবেক শশুর শেখ হাসিনার বেয়াই খন্দকার মোশাররফ এর ভাগ্নি হিসেবে সর্বত্র পরিচয় দিতেন মাসুদা খানম।
বাংলা অ্যাফেয়ার্সের হাতে আসা একটি পে-স্লিপে দেখা যায় তিনি শ্রমিক লীগের ফান্ডে মাসে ২০০ টাকা করে চাঁদা দিতেন। বিমানের একটি পক্ষের অভিযোগ, বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে এখন দ্বিগুণ প্রভাব বিস্তার করছেন। এর পেছনে তার স্বামী ইফতেখার জাহানের হাত রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মাসুদা খানমের সাথে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।


































