একের পর এক বিতর্কে শিক্ষা মন্ত্রণালয়
- সর্বশেষ আপডেট ০১:০০:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
- / 101
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে একের পর এক সিদ্ধান্ত, পরে তা নিয়ে বিতর্ক এবং শেষ পর্যন্ত কোনো কোনো সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা; এভাবেই গত কয়েক মাস ধরে নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের সমালোচনার পাশাপাশি এসব সিদ্ধান্ত ঘিরে মাঠপর্যায়ে আন্দোলন-বিক্ষোভও হয়েছে। এমনকি বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে জাতীয় সংসদে দুঃখ প্রকাশ করতে হয়েছে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষা খাতে বড় কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রত্যাশা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তা না হলে সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই তৈরি হয় বিভ্রান্তি ও বিরোধিতা। এতে মন্ত্রণালয়ের প্রতি আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা নিয়ে নতুন বিতর্ক
সর্বশেষ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা আবারও ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে দেওয়ার আলোচনা ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) কার্যক্রম নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় বিষয়টি আলোচনায় আসে। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, এনটিআরসিএকে শুধু নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজে সীমাবদ্ধ রেখে বেসরকারি স্কুল-কলেজে প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের হাতে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়।
এর পরই শিক্ষক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ও মানববন্ধনও হয়।
তবে বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, সভার রেজল্যুশনের আলোচনার অংশবিশেষ কেটে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। কোনো বিষয় আলোচনার টেবিলে ওঠা মানেই সেটি চূড়ান্ত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে গত মাসে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতাও আবার গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এই ক্ষমতা জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন কমিটির কাছে দেওয়া হয়েছিল। ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে নিয়োগে অতীতে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ থাকায় নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সিদ্ধান্ত বদল
ভর্তি নীতিতেও সিদ্ধান্ত বদলের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছে মন্ত্রণালয়। ছয় বছর আগে সরকারি-বেসরকারি স্কুলে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ভর্তি বাণিজ্য, প্রশ্ন ফাঁস এবং কোচিংনির্ভরতা কমানো।
কিন্তু আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণি থেকে আবার ভর্তি পরীক্ষা চালুর ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী। ঘোষণার পর সন্তানদের ভর্তি প্রস্তুতির জন্য অভিভাবকদের কোচিং সেন্টারে ছুটতে দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হলে মন্ত্রণালয় শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনে।
বর্তমানে জানানো হয়েছে, প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমেই ভর্তি হবে। তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অন্যান্য শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে।
বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা ও মন্ত্রীর মন্তব্য
টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে গত মাসে তীব্র আন্দোলন হয়। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন। মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও ওঠে।
আন্দোলনের মুখে জাতীয় সংসদে নিজের বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, তার মন্তব্য কাউকে উদ্দেশ্য করে করা হয়নি; এরপরও কেউ আহত হয়ে থাকলে তিনি দুঃখিত।
প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলি নিয়েও বিতর্ক
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন এনেছে সরকার। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে বদলি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
খসড়া নীতিমালায় কমিটিতে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ রাখার বিধানও ছিল। এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে;কারা গণ্যমান্য ব্যক্তি, তা স্পষ্ট নয়। প্রশাসনিক বদলি প্রক্রিয়ায় বাইরের ব্যক্তিদের যুক্ত করলে তদবির ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
সমালোচনার মুখে গত ১৮ জুলাই ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ রাখার বিধান বাতিল করা হয়। এর পরিবর্তে শিক্ষানুরাগী বা বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিদের যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে নতুন কয়েকটি শর্তও যুক্ত করা হয়েছে।
নির্বাচিত কমিটি নেই, চলছে অ্যাডহক ব্যবস্থায়
দেশের অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসায় দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি নেই। অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হচ্ছে। কোথাও অ্যাডহক কমিটি না থাকলে প্রশাসনের কর্মকর্তারা সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
নিয়মিত কমিটি না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। নিয়োগসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও নির্বাচিত কমিটি গঠনের উদ্যোগ না থাকায় এ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।
সর্বশেষ গত ২ আগস্ট দেশের সব বেসরকারি দাখিল ও আলিম মাদ্রাসার বিদ্যমান অ্যাডহক কমিটি বাতিল করেছে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। সংশোধিত প্রবিধান অনুযায়ী নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
ভিসি নিয়োগেও প্রশ্ন
বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দেশের তিনটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্য না থাকা বিভাগের অধ্যাপকদের উপাচার্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে শিক্ষক মহলেও অসন্তোষ রয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আল-হাদিস, অন্যটিতে মার্কেটিং এবং আরেকটিতে সমাজকল্যাণ বিভাগের অধ্যাপককে শীর্ষ পদে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
নতুন কারিকুলামের ঘোষণা, পরে অবস্থান পরিবর্তন
চলতি বছরের মার্চে সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন ও যুগোপযোগী কারিকুলাম প্রণয়নের ঘোষণা দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে এর সম্ভাব্য কাঠামো নিয়েও কথা বলেন।
তবে এখন সম্পূর্ণ নতুন কারিকুলাম তৈরির বদলে পুরোনো কারিকুলাম সংশোধন ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এনসিটিবি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে ২০২২ সালের এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে ২০১২ সালের কারিকুলাম সংশোধন করে পাঠদান চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষাক্রম নিয়মিত পরিমার্জন ও আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। পুরোনো কাঠামো শুধু সংশোধন করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া কঠিন।
এপিএসকে ঘিরেও বিতর্ক
শিক্ষামন্ত্রীর এপিএস মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ানকে ঘিরেও নানা অভিযোগ ওঠে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বদলি ও তদবির বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগের পর তাকে এপিএসের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
এরপর গত ১৪ মে তাকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) পদে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হলে নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়। জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে; এমন অভিযোগও ওঠে। পরে ১৯ মে তার নিয়োগ বাতিল করে সরকার।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ধারাবাহিক সিদ্ধান্ত ও সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের বিষয়ে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু বলেন, লটারি ভর্তি ও এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের মতো ব্যবস্থাগুলো শিক্ষায় স্বচ্ছতা এনেছে। তার মতে, এসব ব্যবস্থা বাতিল না করে কারিকুলাম যুগোপযোগী করা এবং শিক্ষক নিয়োগ ও মনিটরিং ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ মনে করেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। রাজনৈতিক বিবেচনা, অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতার সমন্বয়ে এসব সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, শিক্ষা খাত নিয়ে সামগ্রিক পর্যালোচনার মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার।
এসব বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা সচিব আব্দুল খালেকের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।
তবে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, দেশের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনে সরকার যখন নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে, তখন ঘনঘন অহেতুক আন্দোলন পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। এখন শিক্ষা খাতে ধারাবাহিকতা, বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা এবং অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।




























