ঢাকা ১০:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
জালিয়াতির শাস্তি ঠেকাতে আন্দোল

এনাম মেডিকেলে চিকিৎসক কর্মবিরতি, ভোগান্তিতে রোগীরা

সাভার প্রতিনিধি
  • সর্বশেষ আপডেট ০৮:০৭:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
  • / 36

আমার বাপটা অটোরিকশা এক্সিডেন্ট করছে, ইমারজেন্সি এনাম মেডিকেলে লইয়া আইছি। আইসা ডাক্তাররা কয় আজকে চিকিৎসা দেওয়া যাবে না, মইরা গেলেও না! তাদের দাবি না মানা পর্যন্ত কেউ মরলেও তারা ধইরা দেখবে না।”—চোখের পানি মুছতে মুছতে ক্ষোভ আর আকুতি মেশানো কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সাভারের হেমায়েতপুর থেকে আসা মমতাজ বেগম।

গুরুতর আহত বাবাকে নিয়ে হাসপাতালের ইমারজেন্সির সামনে মমতাজের এই অসহায়ত্বের চিত্রই বলে দিচ্ছে ঢাকার সাভারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রীর মালিকানাধীন এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি। স্বাক্ষর জালিয়াতির দায়ে চাকরিচ্যুত দুই চিকিৎসকের শাস্তি বাতিলের দাবিতে চিকিৎসকদের একাংশের আকস্মিক কর্মবিরতিতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার হাজার সাধারণ ও মুমূর্ষু রোগী। অভিযোগ উঠেছে, নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অসহায় রোগীদের একপ্রকার জিম্মি করে ফেলেছেন আন্দোলনকারী চিকিৎসকেরা।

মমতাজ বেগমের মতো একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন মানিকগঞ্জ থেকে আসা জাহানারা বেগম। কোলে থাকা অবুঝ শিশুর বুকটা শ্বাসকষ্টে ওঠানামা করছে। জাহানারা বলেন, ‘বাচ্চার শ্বাসকষ্ট, ডাক্তার নাই। পরিষ্কার বইলা দিছে চিকিৎসা দিবে না। এখন বাচ্চাটারে নিয়া কই যামু? ডাক্তাররা যদি কসাই হয়া যায়, আমাগো মরণ ছাড়া গতি নাই।’

ধামরাই থেকে এসেছে সাগর হোসেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার বোন জামাইয়ের অপারেশন হওয়ার কথা ছিল সকাল ১১টায়। সময় পার হয়া গেছে, ওটিতে কোনো ডাক্তার নাই। রোগী মেরে কি এরা ফায়দা লুটবে? অপারেশনের রোগী ওটিতে রেখে কোনো বিবেকবান ডাক্তার আন্দোলন করতে পারে?’

দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন বৃদ্ধ আব্দুল খালেক। তিনিও এসেছেন ধামরাই থেকে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “তিন দিন ধইরা বুক ব্যাথা নিয়া ভর্তি আছি। আজকে নাকি ডাক্তাররা ডিউটি বর্জন করছে। সকাল থেইকা কোনো বড় ডাক্তার ওয়ার্ডে আসে নাই। নার্সরা কয় আমাগো কিছু করার নাই। আমরা গরিব মানুষ, টাকা দিয়া ভর্তি হয়া এখন বিনা চিকিৎসায় পইড়া আছি।”

ঢাকার সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাত দফা কর্মবিরতি পালন করছেন চিকিৎসকদের একাংশ। তাদের দাবি, কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন হয়রানির কারণে এ কর্মসূচি পালন করছেন তারা। এরমধ্যে সম্প্রতি সাক্ষর জালিয়াতির দায়ে চাকরিচ্যুত দুই চিকিৎসকের বিনা শর্তে চাকরিতে পুনর্বহাল ও তাদের পক্ষে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশপ্রাপ্ত অপর এক চিকিৎসককে দায়মুক্তি দেওয়ার দাবি করা হয়। এছাড়াও এ শাস্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন তারা।

যদিও এ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া অনেকেই ক্যামেরা দেখে সটকে পড়েন। আবার কেউ কেউ কর্মসূচির কারণ বলতে পারেননি। আর কর্তৃপক্ষ বলছে, নিয়ম মেনেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে কেউ কেউ পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। এদিকে চিকিৎসকদের কর্মসূচিতে দুর্ভোগে পড়েছেন রোগীরা। বলছেন, রোগীদের জিম্মি করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে একটি পক্ষ। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাদের।

ঘটনার শুরু যেভাবে

গেল ৫ মে উর্মি আক্তার নামে এক রোগীর একটি মেডিকেল পরীক্ষার স্লিপে কমিশনে অর্থ ছাড়ের জন্য অর্থ বিভাগ বরাবর পাঠান এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের প্রভাষক ডা. সজীব ঘরামী। ওই স্লিপে এনাম মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুর রহমানের সিল ও সাক্ষর যুক্ত করা হয়। তবে স্লিপটিতে গড়মিলের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ বিভাগ সেটি বাতিল করা হয়। এরপর ৭ মে সেটি আবার অর্থ বিভাগে পাঠান একই বিভাগের প্রভাষক ডা. মো. ফয়সাল আহমেদ। এটিও বাতিল করে স্লিপটি হাসপাতালের পরিচালক বরাবর পাঠানো হয়। সেখানেই প্রাথমিক তদন্তে দেখা যায়, স্লিপে থাকা সাক্ষর ও তারিখের দিনে প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. আতিকুর রহমান ছুটিতে ছিলেন। এ ঘটনায় গত ১৩ মে অভিযুক্ত দুই চিকিৎসককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ১৬ মে ওই নোটিশের জবাবে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে অধ্যক্ষ বরারবর আবেদন দেন উভয় চিকিৎসক। এরপর ১৭ মে এনাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন কলেজের উপাধ্যক্ষ ও শৃঙ্খলা কমিটির চেয়ারম্যান ডা. জাইদা রহমানকে। ২৪ মে সাত সদস্যের শৃঙ্খলা কমিটি অভিযুক্ত দুই চিকিৎসককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ পাওয়া ও নৈতিকতার অবক্ষয় প্রতীয়মান হওয়ায় গত ৬ জুন এনাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. মোতাহার হোসেন ভূঁইয়ার সাক্ষরিত আদেশে ডা. সজীব ঘরামী ও ডা. ফয়সাল আহমেদকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এর এক দিন পর ওই দুই চিকিৎসক অধ্যক্ষের কাছে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে দুঃখ প্রকাশ করে চাকরিতে পুনর্বহালের আবেদন করেন। তবে সে আবেদনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি এনাম মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ।

এদিকে এ ঘটনার পর হাসপাতালের এনেস্থিসিয়া বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া চাকরি থেকে অব্যাহতি পাওয়া দুই চিকিৎসকসহ বিভিন্ন বিভাগের প্রভাষকদের নিয়ে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে গিয়ে এই শাস্তি সঠিক হয়নি উল্লেখ করে অসদাচরণ করেন। এই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হাসপাতালের পরিচালককে নির্দেশ দেন অধ্যক্ষ। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে কেনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না জানতে চেয়ে ডা. রফিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

এদিকে এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাত দফা দাবিতে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হাসপাতালের মূল ভবনের সামনে কর্মবিরতি ও মানববন্ধন করেন চিকিৎসক, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের একাংশ।

তারা শাস্তিপ্রাপ্ত দুই চিকিৎসককে বিনা শর্তে চাকরিতে পুনর্বহাল, ডা. মো. রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে দেওয়া নোটিশ প্রত্যাহার ও নোটিশদাতার জবাবদিহিতা, শৃঙ্খলা কমিটির চেয়ারম্যান ডা. জাইদা রহমানসহ একাধিক পরিচালককে অব্যাহতি, চিকিৎসকদের সার্ভিস রুল প্রণয়ন ও ইন্টার্ন-জুনিয়র চিকিৎসকদের নানা অযুহাতে বেতন কর্তনের বিরুদ্ধে দাবি করেন।

কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়া ডা. মো. রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া কর্মসূচিতে দাবিগুলো তুলে ধরেন। তিনি দাবি করে বলেন, আমরা তাদের কোনো কিছুর প্রতিবাদ করলে হয়রানির শিকার হতে হয়। দুইজন চিকিৎসককে অব্যাহতি দেওয়ায় তাদের সঙ্গে কথা বলি। নিয়ম মানার কথা বলি। একটা নোটিশ দিয়ে চাকরিচ্যুত করতে পারে না। শাস্তি হতে হবে সঠিক নিয়মে। এসবের প্রতিবাদ করায় আমাকে শোকজ করে। এও বলা হয়, আমি নাকি দলবল নিয়ে বিশৃঙ্খলা করেছি প্রিন্সিপালের রুমে। আমরা মানববন্ধন ও কর্মসূচি করছি। আমরা সবাই এখানে এসেছি। কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজে ফিরিয়ে নিক।

প্রায় অর্ধ শতাধিক চিকিৎসক এ কর্মসূচিতে অংশ নিলেও সামনের সারিতে থাকা এক দেড় ডজন চিকিৎসক ছাড়া বাকি বেশিরভাগ চিকিৎসকই ছিলেন ইন্টার্ন ও জুনিয়র চিকিৎসক। এরমধ্যে অনেকেই এ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কারণ বলতে পারেননি। কেউ কেউ সাংবাদিকের ক্যামেরা দেখে সটকে পড়েন। কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান, কেউ কেউ জানেন না বলেও মন্তব্য করেন। মূল জমায়েতের অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা নারী চিকিৎসকদের কেউই বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

এ সময় কর্মসূচিতে থাকা চিকিৎসকদের দুইজন বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। এ ঘটনার ছবি ধারণ করতে গেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন তারা।

বেলা সাড়ে ১০টার দিকে তারা জমায়েতসহ অধ্যক্ষের কক্ষের সামনে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে তারা প্রায় আধা ঘণ্টা পর অবস্থান ছেড়ে দেন। তবে তারা কর্মবিরতি চালিয়ে যাচ্ছেন।

এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মিথুন আলমগীর বলেন, একটি ডিসকাউন্টকে কেন্দ্র করে বিষয়টির শুরু হয়। প্রথমে সেটি করে দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে কাগজটি ফেরত এলে প্রথমে বিভাগীয় ও পরবর্তীতে শৃঙ্খলা কমিটির তদন্তের পর দেখা যায় এতে সাক্ষর ও সিল জালিয়াতি করা হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শৃঙ্খলা কমিটির সুপারিশ মতো কলেজের নিয়ম অনুযায়ী কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং পরবর্তীতে চাকরিচ্যুত করা হয়।

এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপাধ্যক্ষ ও শৃঙ্খলা কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. জাইদা রহমান বলেন, শৃঙ্খলা কমিটির সুপারিশের পর অধ্যক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এরপর ডা. রফিক শাস্তিপ্রাপ্তদের পক্ষে আমাদের কাছে এসে অসদাচরণ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এরপরই এই কর্মসূচির খবর এলো। এ কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রমও কিছুটা ব্যহত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

জালিয়াতির শাস্তি ঠেকাতে আন্দোল

এনাম মেডিকেলে চিকিৎসক কর্মবিরতি, ভোগান্তিতে রোগীরা

সর্বশেষ আপডেট ০৮:০৭:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

আমার বাপটা অটোরিকশা এক্সিডেন্ট করছে, ইমারজেন্সি এনাম মেডিকেলে লইয়া আইছি। আইসা ডাক্তাররা কয় আজকে চিকিৎসা দেওয়া যাবে না, মইরা গেলেও না! তাদের দাবি না মানা পর্যন্ত কেউ মরলেও তারা ধইরা দেখবে না।”—চোখের পানি মুছতে মুছতে ক্ষোভ আর আকুতি মেশানো কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন সাভারের হেমায়েতপুর থেকে আসা মমতাজ বেগম।

গুরুতর আহত বাবাকে নিয়ে হাসপাতালের ইমারজেন্সির সামনে মমতাজের এই অসহায়ত্বের চিত্রই বলে দিচ্ছে ঢাকার সাভারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রীর মালিকানাধীন এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি। স্বাক্ষর জালিয়াতির দায়ে চাকরিচ্যুত দুই চিকিৎসকের শাস্তি বাতিলের দাবিতে চিকিৎসকদের একাংশের আকস্মিক কর্মবিরতিতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার হাজার সাধারণ ও মুমূর্ষু রোগী। অভিযোগ উঠেছে, নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অসহায় রোগীদের একপ্রকার জিম্মি করে ফেলেছেন আন্দোলনকারী চিকিৎসকেরা।

মমতাজ বেগমের মতো একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন মানিকগঞ্জ থেকে আসা জাহানারা বেগম। কোলে থাকা অবুঝ শিশুর বুকটা শ্বাসকষ্টে ওঠানামা করছে। জাহানারা বলেন, ‘বাচ্চার শ্বাসকষ্ট, ডাক্তার নাই। পরিষ্কার বইলা দিছে চিকিৎসা দিবে না। এখন বাচ্চাটারে নিয়া কই যামু? ডাক্তাররা যদি কসাই হয়া যায়, আমাগো মরণ ছাড়া গতি নাই।’

ধামরাই থেকে এসেছে সাগর হোসেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার বোন জামাইয়ের অপারেশন হওয়ার কথা ছিল সকাল ১১টায়। সময় পার হয়া গেছে, ওটিতে কোনো ডাক্তার নাই। রোগী মেরে কি এরা ফায়দা লুটবে? অপারেশনের রোগী ওটিতে রেখে কোনো বিবেকবান ডাক্তার আন্দোলন করতে পারে?’

দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন বৃদ্ধ আব্দুল খালেক। তিনিও এসেছেন ধামরাই থেকে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “তিন দিন ধইরা বুক ব্যাথা নিয়া ভর্তি আছি। আজকে নাকি ডাক্তাররা ডিউটি বর্জন করছে। সকাল থেইকা কোনো বড় ডাক্তার ওয়ার্ডে আসে নাই। নার্সরা কয় আমাগো কিছু করার নাই। আমরা গরিব মানুষ, টাকা দিয়া ভর্তি হয়া এখন বিনা চিকিৎসায় পইড়া আছি।”

ঢাকার সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাত দফা কর্মবিরতি পালন করছেন চিকিৎসকদের একাংশ। তাদের দাবি, কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন হয়রানির কারণে এ কর্মসূচি পালন করছেন তারা। এরমধ্যে সম্প্রতি সাক্ষর জালিয়াতির দায়ে চাকরিচ্যুত দুই চিকিৎসকের বিনা শর্তে চাকরিতে পুনর্বহাল ও তাদের পক্ষে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশপ্রাপ্ত অপর এক চিকিৎসককে দায়মুক্তি দেওয়ার দাবি করা হয়। এছাড়াও এ শাস্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন তারা।

যদিও এ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া অনেকেই ক্যামেরা দেখে সটকে পড়েন। আবার কেউ কেউ কর্মসূচির কারণ বলতে পারেননি। আর কর্তৃপক্ষ বলছে, নিয়ম মেনেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে কেউ কেউ পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। এদিকে চিকিৎসকদের কর্মসূচিতে দুর্ভোগে পড়েছেন রোগীরা। বলছেন, রোগীদের জিম্মি করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে একটি পক্ষ। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাদের।

ঘটনার শুরু যেভাবে

গেল ৫ মে উর্মি আক্তার নামে এক রোগীর একটি মেডিকেল পরীক্ষার স্লিপে কমিশনে অর্থ ছাড়ের জন্য অর্থ বিভাগ বরাবর পাঠান এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের প্রভাষক ডা. সজীব ঘরামী। ওই স্লিপে এনাম মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুর রহমানের সিল ও সাক্ষর যুক্ত করা হয়। তবে স্লিপটিতে গড়মিলের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ বিভাগ সেটি বাতিল করা হয়। এরপর ৭ মে সেটি আবার অর্থ বিভাগে পাঠান একই বিভাগের প্রভাষক ডা. মো. ফয়সাল আহমেদ। এটিও বাতিল করে স্লিপটি হাসপাতালের পরিচালক বরাবর পাঠানো হয়। সেখানেই প্রাথমিক তদন্তে দেখা যায়, স্লিপে থাকা সাক্ষর ও তারিখের দিনে প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. আতিকুর রহমান ছুটিতে ছিলেন। এ ঘটনায় গত ১৩ মে অভিযুক্ত দুই চিকিৎসককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ১৬ মে ওই নোটিশের জবাবে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে অধ্যক্ষ বরারবর আবেদন দেন উভয় চিকিৎসক। এরপর ১৭ মে এনাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন কলেজের উপাধ্যক্ষ ও শৃঙ্খলা কমিটির চেয়ারম্যান ডা. জাইদা রহমানকে। ২৪ মে সাত সদস্যের শৃঙ্খলা কমিটি অভিযুক্ত দুই চিকিৎসককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ পাওয়া ও নৈতিকতার অবক্ষয় প্রতীয়মান হওয়ায় গত ৬ জুন এনাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. মোতাহার হোসেন ভূঁইয়ার সাক্ষরিত আদেশে ডা. সজীব ঘরামী ও ডা. ফয়সাল আহমেদকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এর এক দিন পর ওই দুই চিকিৎসক অধ্যক্ষের কাছে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে দুঃখ প্রকাশ করে চাকরিতে পুনর্বহালের আবেদন করেন। তবে সে আবেদনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি এনাম মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ।

এদিকে এ ঘটনার পর হাসপাতালের এনেস্থিসিয়া বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া চাকরি থেকে অব্যাহতি পাওয়া দুই চিকিৎসকসহ বিভিন্ন বিভাগের প্রভাষকদের নিয়ে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে গিয়ে এই শাস্তি সঠিক হয়নি উল্লেখ করে অসদাচরণ করেন। এই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হাসপাতালের পরিচালককে নির্দেশ দেন অধ্যক্ষ। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে কেনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না জানতে চেয়ে ডা. রফিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

এদিকে এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাত দফা দাবিতে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হাসপাতালের মূল ভবনের সামনে কর্মবিরতি ও মানববন্ধন করেন চিকিৎসক, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের একাংশ।

তারা শাস্তিপ্রাপ্ত দুই চিকিৎসককে বিনা শর্তে চাকরিতে পুনর্বহাল, ডা. মো. রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে দেওয়া নোটিশ প্রত্যাহার ও নোটিশদাতার জবাবদিহিতা, শৃঙ্খলা কমিটির চেয়ারম্যান ডা. জাইদা রহমানসহ একাধিক পরিচালককে অব্যাহতি, চিকিৎসকদের সার্ভিস রুল প্রণয়ন ও ইন্টার্ন-জুনিয়র চিকিৎসকদের নানা অযুহাতে বেতন কর্তনের বিরুদ্ধে দাবি করেন।

কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়া ডা. মো. রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া কর্মসূচিতে দাবিগুলো তুলে ধরেন। তিনি দাবি করে বলেন, আমরা তাদের কোনো কিছুর প্রতিবাদ করলে হয়রানির শিকার হতে হয়। দুইজন চিকিৎসককে অব্যাহতি দেওয়ায় তাদের সঙ্গে কথা বলি। নিয়ম মানার কথা বলি। একটা নোটিশ দিয়ে চাকরিচ্যুত করতে পারে না। শাস্তি হতে হবে সঠিক নিয়মে। এসবের প্রতিবাদ করায় আমাকে শোকজ করে। এও বলা হয়, আমি নাকি দলবল নিয়ে বিশৃঙ্খলা করেছি প্রিন্সিপালের রুমে। আমরা মানববন্ধন ও কর্মসূচি করছি। আমরা সবাই এখানে এসেছি। কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজে ফিরিয়ে নিক।

প্রায় অর্ধ শতাধিক চিকিৎসক এ কর্মসূচিতে অংশ নিলেও সামনের সারিতে থাকা এক দেড় ডজন চিকিৎসক ছাড়া বাকি বেশিরভাগ চিকিৎসকই ছিলেন ইন্টার্ন ও জুনিয়র চিকিৎসক। এরমধ্যে অনেকেই এ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কারণ বলতে পারেননি। কেউ কেউ সাংবাদিকের ক্যামেরা দেখে সটকে পড়েন। কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান, কেউ কেউ জানেন না বলেও মন্তব্য করেন। মূল জমায়েতের অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা নারী চিকিৎসকদের কেউই বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

এ সময় কর্মসূচিতে থাকা চিকিৎসকদের দুইজন বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। এ ঘটনার ছবি ধারণ করতে গেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন তারা।

বেলা সাড়ে ১০টার দিকে তারা জমায়েতসহ অধ্যক্ষের কক্ষের সামনে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে তারা প্রায় আধা ঘণ্টা পর অবস্থান ছেড়ে দেন। তবে তারা কর্মবিরতি চালিয়ে যাচ্ছেন।

এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মিথুন আলমগীর বলেন, একটি ডিসকাউন্টকে কেন্দ্র করে বিষয়টির শুরু হয়। প্রথমে সেটি করে দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে কাগজটি ফেরত এলে প্রথমে বিভাগীয় ও পরবর্তীতে শৃঙ্খলা কমিটির তদন্তের পর দেখা যায় এতে সাক্ষর ও সিল জালিয়াতি করা হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শৃঙ্খলা কমিটির সুপারিশ মতো কলেজের নিয়ম অনুযায়ী কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং পরবর্তীতে চাকরিচ্যুত করা হয়।

এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপাধ্যক্ষ ও শৃঙ্খলা কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. জাইদা রহমান বলেন, শৃঙ্খলা কমিটির সুপারিশের পর অধ্যক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এরপর ডা. রফিক শাস্তিপ্রাপ্তদের পক্ষে আমাদের কাছে এসে অসদাচরণ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এরপরই এই কর্মসূচির খবর এলো। এ কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রমও কিছুটা ব্যহত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।