নারীর ক্ষমতায়নে জেন্ডার শিক্ষা জরুরি: ফওজিয়া মোসলেম
- সর্বশেষ আপডেট ০৮:৩০:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
- / 16
বিশ্বব্যাপী জেন্ডার এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে জেন্ডার, নারী অধিকার ও ক্ষমতায়নকে কেন্দ্র করে চলমান নানামুখী প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার মূল লক্ষ্য হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন ও মুক্তির দর্শনকে গভীরভাবে উপলব্ধি করার চেষ্টা। ফরাসি দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ারের ভাষায়, “মানুষ নারী হয়ে জন্মায় না, সমাজ তাকে নারী করে তোলে” বললেন ডা. ফওজিয়া মোসলেম।
বৃহস্পতিবার( ২৫ জুন) বিকাল সাড়ে ৩ টায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ঢাকাস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পাঠাগার উপপরিষদের উদ্যোগে “জেন্ডার,নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন” বিষয়ক অনলাইন সার্টিফিকেট কোর্সের ১৬ তম ব্যাচের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম একথা বলেন ।
স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু; কোর্স কারিকুলাম সম্পর্কে বক্তব্য দেন কোর্স পরিচালক ও সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম।
ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, নারী আন্দোলন কেবল কর্মসূচিভিত্তিক নয়; এর একটি শক্তিশালী দার্শনিক ভিত্তি রয়েছে। অন্যদিকে নারী মুক্তি, জেন্ডার সমতা ও মানবমুক্তির প্রশ্নকে গভীরভাবে উপলব্ধি করার জন্য তাত্ত্বিক চর্চা অপরিহার্য।
তিনি বলেন, আজ সমাজ এই সত্যকে অনেকাংশে স্বীকার করে। সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি ওপুনরুৎপাদনমূলক কাঠামোগুলোকে এখন গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। নারীর গৃহস্থালি ও সেবামূলক শ্রমের অস্বীকৃতি, লিঙ্গ বৈচিত্র্যের প্রশ্ন এবং পিতৃতন্ত্রের মাধ্যমে নারীর ভাষা, সংস্কৃতি, চলাফেরা ও চিন্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ এসব বিষয়ে নতুন প্রজন্মের মধ্যে তুলে ধরার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পাশাপাশি পরিবেশ ও জলবায়ু অভিযোজনে নারীর ঐতিহাসিক ভূমিকা ও নেতৃত্বকে উন্নয়ন ভাবনার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন মাঠের অভিজ্ঞতা, একাডেমিক গবেষণা, তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণের সমন্বয়ের মাধ্যমে নারী আন্দোলন আরও শক্তিশালী, সুসংগঠিত এবং কার্যকর রূপ লাভ করবে।
স্বাগত বক্তব্যে মালেকা বানু বলেন, নারী জন্মগতভাবে বৈষম্যের শিকার হয়ে জন্মায় না; একজন মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করলেও সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাকে বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়। এই বৈষম্যের কারণ চিহ্নিত করে তা দূর করার সংগ্রামই নারী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।
পাশাপাশি তিনি আরো বলেন, নারী-পুরুষের ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা, সামাজিক কাঠামো এবং ক্ষমতার সম্পর্কগুলোকে নতুনভাবে বিশ্লেষণ ও বিন্যাস করার প্রয়োজন রয়েছে। এই উপলব্ধি থেকেই বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ‘জেন্ডার, নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন’ সার্টিফিকেট কোর্স চালু করেছে। গত ১৬ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় এই কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। তাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও স্বেচ্ছাসেবী অবদানের কারণে কোর্সটি ধারাবাহিকভাবে সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছে। এই কোর্সের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা জেন্ডার বিষয়ে গভীরতর জ্ঞান ও সংবেদনশীলতা অর্জন করবেন এবং নারী আন্দোলন, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন। একই সঙ্গে সমাজ ও নারী আন্দোলনের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা আরও গভীর ও শক্তিশালী হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
সীমা মোসলেম বলেন, একটি আন্দোলনমুখী, গণতান্ত্রিক ও স্বেচ্ছাসেবী নারী সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের মূল লক্ষ্য একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও সমতাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্য অর্জনের পথে দেখা যাচ্ছে সমাজে নারীরা নানা ধরনের বৈষম্য ও অধিকারহীনতার শিকার। নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বহুমাত্রিক ও সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। একটি মানবিক সমাজ কেবল নারী আন্দোলনের কর্মীদের একার প্রচেষ্টায় গড়ে তোলা সম্ভব নয়; নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমাজের সকল মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন, সেই উদ্যোগকে শক্তিশালী করতে জেন্ডার-সংবেদনশীল ও সমতাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। সেই বিবেচনায় সমাজের বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণীর মানুষকে এই কোর্সে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরো জানান, কোর্সের মডিউল এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে জেন্ডারের সম্পর্ক ও প্রভাব বিশ্লেষণ করা যায়। কোর্সের প্রতিটি বিষয় জেন্ডারগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলোচনা করা হবে যা অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে গঠনমূলক চিন্তা ও বিশ্লেষণী দক্ষতা যাতে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে ।
উক্ত সার্টিফিকেট কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কোর্সের ২৫ জন শিক্ষার্থী বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ, সম্পাদকমন্ডলী, কর্মকর্তাসহ প্রায় ৬০ যুক্ত ছিলেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পাঠাগার উপপরিষদ সম্পাদক রীনা আহমেদ।


































