ঢাকা ০৮:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রবেশগম্যতা বৃদ্ধিতে উদ্ভাবনী ও ডিজিটাল উদ্যোগ-৪

বাংলা ভাষায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা সমৃদ্ধ করতে নানা প্রচেষ্টা

রীতা ভৌমিক, সিনিয়র প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৯:০৬:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫
  • / 129

আশিকুর রহমান অমিত।

বাংলা ভাষায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা সমৃদ্ধ করতে সরকারি-বেসরকারিভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলছে নানা প্রচেষ্টাও।

স্কিন রিডার ও ইশারা ভাষার সফটওয়্যার
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যাতে সহজেই সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ বাড়াতে পারেন এনিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন গবেষণা চলছে। যাতে তথ্য প্রযুক্তির সুবিধা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা কম। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য তথ্য প্রযুক্তির প্রবেশগম্যতা বাড়ানো সমাজসেবার কাজ হলেও বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল এ নিয়ে কাজ করছে। এরিই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্য প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধিকরণ নামে একটি প্রকল্প চালু করেছে। একটি বেসরকারি কোম্পানি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কোলাবেরেশনে গবেষণাটি করছে।

এই প্রকল্পের আওতায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য স্কিন রিডার এবং বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ইশারা ভাষার সফটওয়্যার তৈরি করছে।
এর মাধ্যমে বাংলা ভাষাভাষী বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ছাড়াও যারা তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট তারাও ইশারা ভাষা ব্যবহার করতে পারবেন।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের ( বিসিসি) পরিকল্পনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. মাহবুব করিম বলেন, যাদের মোবাইল, কম্পিউটারে ডিভাইস আছে তাদের জন্য স্কিন রিডার প্রযোজ্য। স্কিন রিডার বড় সফটওয়্যার নয়। এটা ডেমো পর্যায়ে রয়েছে। পেশাগত কাজে ব্যবহার করার মতো এখনো কাজ সম্পন্ন হয়নি। আরেকটু পরিপূর্ণ হলে আমরা এটা প্রকাশ করবো। বাস্তবায়নে যতটা সময় লাগে। এটাতে তেমন কোনো চ্যালেঞ্জ নেই।

তিনি বলেন, ইশারা ভাষার সফটওয়্যারে কিছুটা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যারা বলতে ও শুনতে পান না ইশারার মাধ্যমে কথা বলেন, তাদের ইশারাটা এই সফটওয়্যার ক্যাচ করবে, কি বলতে চাচ্ছেন তা বাংলা ভাষায় শোনাবে বা লিখে দিবে। এজন্য প্রথমে ইশারাগুলোকে মানদণ্ড করা হয়েছে। ছবি-ভিডিও অন্তভুক্তি করা হয়েছে। এআই ব্যবহার করে একজন ব্যবহারকারী যখন তার সামনে ইশারা করবে সে সেটা প্রক্রিয়াকরণ করে তুলে ধরবে।

ইঞ্জিনিয়ার মো. মাহবুব করিম আরো বলেন, এর চ্যালেঞ্জ হলো ছবির আকার বড় হওয়ায় প্রক্রিয়াকরণ করে ফলাফল আসতে বেশ কয়েক সেকেন্ড সময় লাগছে। এই দেরি পযন্ত মানুষ অপেক্ষা করবে না। মানুষ দেওয়ার সাথে সাথে ফলাফল চায়। এর উপর গবেষণা এখনো চলছে। কিছু সময় কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের শক্তিশালী জিপিও ছিল না। জিপিও’র সমস্যা মিটেছে। এই কাজগুলো যাতে দ্রুত হয় তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গবেষণা করে সময়টা কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন এটা ব্যবহার করা যাবে। একটা ইশারা করার পর ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড অপেক্ষা করতে হচ্ছে এর তথ্য জানার জন্য।

একজন বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বাজারে কিছু কিনতে গিয়ে দোকানদারকে বোঝাতে পারছেন না। দোকানদারের কাছে মোবাইলে এটি থাকতে পারে। বা যেকোনো ব্যক্তির মোবাইলে ইশারা অ্যাপ সফটওয়্যার থাকতে পারে। অথাৎ এভাবেই ইশারা অ্যাপের মাধ্যমে ইশারা ভাষাটা মানুষের কাছে পৌঁছানো। আমাদের লক্ষ্যমাত্রা স্থানগুলো হলো ডাক্তারের চেম্বার, ডাক্তারের কাছে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি তাদের সমস্যাটা বলতে পারেন না। তৈরি হলে এটা ডাক্তারদের কাছে পাঠানো হবে। এই সফটওয়্যার ব্যবহার করলে ডাক্তার রোগীর সমস্যাটা জানতে পারবেন। আদালত কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন সাক্ষীর ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি বেশি পরিমাণে দরকার। সব জায়গায় আমরা এটাকে ছড়িয়ে দিবো। ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে এই গবেষণা সম্পন্ন করতে হবে। লক্ষ্যমাত্রা হলো বাংলা ভাষাভাষী সব বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রযোজ্য হবে। ভাষান্তরের মাধ্যমে অন্য ভাষাভাষী বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও এটি ব্যবহার করতে পারবেন।

বাংলা ভাষার সহায়ক উপকরণ
বৃটিশ কাউন্সিলে আইএলটিএস হতো। আইএলটিএস উঠিয়ে কম্পিউটার ভিত্তিক করা হয়েছে। এর ফলে বৃটিশ কাউন্সিলের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না শারীরিক প্রতিবন্ধী সুমনা খান। কম্পিউটারে পরীক্ষা দিতে হলে ওকে অনস্কিন বোডে লিখতে হবে। এই দুই জায়গায় প্রতিবন্ধিকতার শিকার হয়েছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে সুমনা খান বলেন , বিদেশে স্কলারশিপের জন্য চেষ্টা করেছি। কিন্তু পি,টি,ই পরীক্ষা দিতে গিয়ে বাধাগ্রস্ত হচ্ছি। আমি কাজ করি অন-স্ক্রীন কীবোর্ডে। আর মানুষেরা হাত দিয়ে কিবোর্ডে কাজ করেন। এটা পি,টি,ই অনুমোদন দিচ্ছে না। পি,টি,ই -এর প্রধান কার্যালয়েও মেইল করা হয়েছে। তারা বার বার এটা বাতিল করে দিচ্ছে। এখন জানতে পেরেছি, বৃটিশ কাউন্সিলে যে আইএলটিএস পেপার বেইজড হতো। এটা উঠিয়ে কম্পিউটার ভিত্তিক করা হয়েছে। এর ফলে বৃটিশ কাউন্সিলের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারব না। কম্পিউটারে পরীক্ষা দিতে হলে আমাকে অন-স্ক্রীন কীবোর্ডে লিখতে হবে। এই দুই জায়গায় প্রতিবন্ধিকতার শিকার হচ্ছি। যে কারণে আমার ক্যারিয়ার নিয়ে যে ভবিষ্যৎ চিন্তা ভাবনা তা আটকে গেছে।

অস্ট্রেলিয়ান এডুকেশনাল কনসাল্টেন্সি “এডুস্পায়ারে” বিজনেস ডেভেলপমেন্ট এক্সিকিউটিভ এবং একটি ওপিডিতে প্রোগাম অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন সুমনা খান। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে তিনি কাজ করছেন।

পরিবার থেকে তাকে কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়নি। তিনি আর পাঁচটা শিশুর মতোই বিদ্যালয়ে পড়েছেন। নার্সারি থেকে কেজি টু পর্যন্ত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়েছেন। প্রিপারেটিতে ভর্তি পরীক্ষায় ৯০০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে নবম হন। কিন্তু প্রতিবন্ধী শিশু হওয়ায় স্কুল তাকে ভর্তি নিতে অপারগতা প্রকাশ করে। মা তাদের সাথে লড়াই করে তাকে ওই স্কুলে ভর্তি করায়।

সুমনার মা শাহীন সুলতানা বলেন, মেইন স্ট্রিম স্কুলে প্রতিবন্ধী শিশুদের ভর্তির ব্যাপারে বাধা সৃষ্টি করে। তাদের সুযোগ না দিয়েই , মেধা যাচাই না করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তবে পরিবারের সহযোগিতা থাকলে সব বাধা অতিক্রম করা যায়। প্রতিবন্ধী শিশুকে সুযোগ দিলে এবং শিক্ষক, সহপাঠী সহযোগিতা করলে প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করা সম্ভব হয়।
তিনি আরো বলেন, পরবর্তীতে ওই স্কুলে অনেক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী পড়ার সুযোগ পেয়েছে।

অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময়ে ভলান্টিয়ার হিসেবে কিছু স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন সোসাইটি অফ দি ডেফ অ্যান্ড সাইন ল্যাংগুয়েজ ইউজার্স (এসডিএসএল), প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠন পরিষদ (ïকরেন সুমনা খান।

সুমনা খান বলেন, এখানে কাজ করতে এসে দেখেছি, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে আমি কোনো বৈষম্যের শিকার না হলেও প্রান্তিক পর্যায়ের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনেক ধরনের প্রতিবন্ধিতার শিকার হয়েছেন। সেটা পারিবারিকভাবে, আর্থিকভাবে, কাজের ক্ষেত্রে , শিক্ষা, মানসিকভাবে হতে পারে। সব ক্ষেত্রেই তারা বাধার সম্মুখীন হয়েছেন।

তিনি বলেন, শিক্ষা গ্রহণে কোনো সমস্যা না হলেও চাকরি ক্ষেত্রে আমার চ্যালেঞ্জ ছিল। আমি বাণিজ্যিক জায়গাগুলোতে চাকরি খুব কম করেছি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এনজিওতে চাকরি খুঁজতে হয়েছে। কারণ সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য সহায়ক কর্মপরিবেশ রয়েছে। নইলে দেখতে হয়েছে, যেখানে আমি বাসা থেকে কাজ করতে পারবো। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চাকরির তিক্ত অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটা জায়গায় চাকরি নিয়েছিলাম। সেটা চালিয়ে যেতে পারিনি । ওরা অনলাইনে ইন্টারভিউ নেয়। তখন তাদের বলেছিলাম, আমি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। আমার বাথরুমে যাওয়া, খাবারের সময় কারো সহযোগিতা লাগবে। এই সুবিধাটা লাগবে। তারা বলেছিলেন, কোনো সমস্যা হবে না। লোক দেওয়া যাবে। এইচআর এই কথাটা পরবর্তীতে ভুলে যায়। আমি অফিসে যোগদান করার পর তিনি আমাকে কোনো লোক দিতে পারেননি। আমি বাথরুমে যাওয়ার জন্য সাহার্য্যকারী চাইলে উল্টো হেডের কাছে নালিশ করেন। আমি আমার শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কথা লুকিয়েছি, সহযোগিতার জন্য কোনো সাহার্য্যকারী চাইনি। অথচ আমি আমার সিভি এবং আবেদনে সব সময় আমার শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কথা উল্লেখ করি। ডান হাত দিয়ে ধীর গতিতে লিখতে পারি। বাম হাতে কিছুই করতে পারি না। এরপর চাকরিটা সেখানে আর করা হয়নি।

সুমনার নাভ জন্ম থেকে দুর্বল । তাই ধীরে হাঁটেন। উঁচু নিচুতে চলাচল সমস্যা হয়। আগে একা চলতে পারলেও এখন পারেন না। আড়াই বছর ধরে হোম অফিস করেন। মেরুদণ্ডের হাড়ে সমস্যা ধরা পড়েছে। তিন চার ঘন্টা টানা বসে থাকতে পারেন না। থেমে থেমে কাজ করতে হয়।

তিনি বলেন, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মাসিক আয় না থাকলে তার চিকিৎসা খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। মাসে ১০ হাজার টাকার উপরে ওষুধের পেছনে খরচ হয়।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতায় বাংলা ভাষার সহায়ক উপকরণ নিয়ে কেউ সচেতন নয়। এমনকি অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান, ওয়েব সাইট, ডিজিটাল
সার্ভিস সহায়ক নয়। এ নিয়ে মানুষ যত তাড়াতাড়ি সচেতন হবেন, তত তাড়াতাড়ি কাজ হবে। এক্ষেত্রে দরকার সরকারি পযায়ে আইনগত ভিত্তি এবং টেক পণ্যের প্রবেশগম্যতা।
বাংলা ভাষায় যে তথ্য প্রযুক্তি রয়েছে সেগুলো সহায়ক উপকরণে সহজতর করতে কাজ করছেন ইনটিলিয়ন টেকব্রিজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী আশিকুর রহমান অমিত। তিনি একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি । বাংলা ভাষার সহায়ক উপকরণের প্রতিবন্ধকতা নিরসনে কাজ করছেন।

বাংলা ভাষার সহায়ক উপকরণের প্রতিবন্ধকতা নিরসনে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি । প্রথমত সচেতনতা, দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রের একটা আইনগত জায়গা
নির্ধারণ, তৃতীয়ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীদারিত্ব।

আশিকুর রহমান অমিত জানান, প্রথম শুরু করেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা মোবাইলে ওয়ার্ডস ফাইল পড়তে পারতেন না। এই সমস্যা সমাধানে একটা ডক রিডার তৈরি করেন। একটা বড় সংখ্যক প্রতিষ্ঠান যারা ব্রেইল প্রিন্টিং এ কাজ করেন। তাদের ব্রেইল প্রিন্টার নষ্ট হয়ে গেলে ভারত কিংবা মালয়েশিয়ায় নিয়ে যেতে হতো। পাসগুলো সচরাচর দেশে পাওয়া যেতো না। ইনডেস্কে লিডারশিপ নেই। তিনি বলেন, এই সমস্যাগুলো থেকে বের হয়ে আসতে আমরা ব্রেইল পদ্ধতিটাকে সহজতর করি। রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্টে কাজ করতে গিয়ে আরেকটি সমস্যার সম্মুখীন হই। বাংলা ভাষার জন্য সহায়ক উপকরণ নেই। অন্যদিকে যে পণ্য গুলো আন্তজাতিক পযায়ে ইংরেজি ভাষায় রয়েছে তা বাংলায় ভাষান্তরের চেষ্টা করছি। এক্ষেত্রে বড় বাধা আমরা যখন টেক পণ্য আমদানি করি, টেক পণ্যের জন্য সুনির্দিষ্ট এইচএস কোড নেই। এইচ এস কোড ইস্যু হলো যতগুলো পণ্য বাংলাদেশে আসে বা আমদানি করা হয় এর সবগুলোর জন্য সরকার থেকে আলাদা আলাদা এইচ এস কোড নির্ধারণ করা থাকে । যার অধীনে ওই পণ্যের শুল্ক , মূল্য সংযোজন কর কত হবে তা নির্ধারণ করা হয়।

আশিকুর রহমান অমিত আরো বলেন, টেকের উপর এইচএসকোড না থাকায় প্রিন্টার স্বাভাবিক কোডে আনতে হয়। বা আমরা এই সম্পর্কিত অন্য কোনো ডিভাইস আনলে প্রিন্টার এইচএস কোডে আনতে হয়। সহায়ক উপকরণের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় বাধা।

তিনি বলেন, প্রযুক্তির প্রবেশগম্যতার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তিনটি মানদণ্ড মেনে চলতে হয়। এ, ডাবল এ এবং ত্রিপল এ।

এ মৌলিক মানদন্ড – কনটেন্ট এবং টেকনোলজি দুই জায়গা থেকে প্রবেশগম্যতা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, সরকার এখন পযন্ত মাত্র ৭০ শতাংশ প্রবেশগম্যতা করতে পেরেছে ।
ডাবল এ মানদন্ড – বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ন্যুনতম সুবিধা দেওয়া। বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য বাধার -জায়গাগুলো কোথায়? কোনো ভিডিও ডকুমেন্ট তৈরি। লেখা ও ক্যাপশন আছে, ভিডিও দেখে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বুঝবে। ডাবল এ’র মানদন্ডে এখন আমরা কাজ করছি।

ত্রিপল এ স্ট্যান্ডার্ড হচ্ছে – ভিডিও ডকুমেন্টসে সাইন ল্যাগুয়েজ থাকা। বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ক্ষেত্রে কেবল ক্যাপশন দেওয়া ছাড়া খুব কমই ডকুমেন্টস আছে। যেখানে থ্রিপল এ মানদন্ড মানা হয়।

তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশে যারা উদ্যেক্তা, টেক ওয়েন্টার প্রেইনার রয়েছেন তারা প্রবেশগম্যতার আন্তর্জাতিক মানদন্ড নিয়ে এখনো সচেতন নয়।
টেক কোম্পানিগুলো যখন পণ্য উৎপাদন করে , তারা ভাবে কতোটা লক্ষ্য অর্জন করা যাবে। বাংলাদেশের বাজারে তা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বা প্রতিবন্ধী মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকে না। টেক শিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকারকে সহায়তা করতে হবে। এই কাজগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একসাথে কাজ করতে হবে। তাহলে অনেকগুলো দরজা খুলে যাবে। উন্নত বিশ্বের টেক পণ্য গুলোর যেগুলো বাজারে এসেছে এর ৯৮ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা হয়েছে। এরপর টেক ইন্ড্রাস্টি সেগুলোকে গ্রহণ করেছে।

টেক পণ্য গুলো বাজারে আসায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা উপকৃত হচ্ছেন। আমাদের স্মার্ট সাদাছড়ি আছে, যা ভয়েজ নির্দেশ দেয়। ডানে যেতে হবে, বামে যেতে হবে। কতদূর যাবে। এই জিনিসগুলো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এটুআই প্রোগ্রামের ন্যাশনাল কনসালটেন্ট – অ্যাক্সেসিবিলিটি ভাস্কর ভট্টাচার্য এ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের প্রধান সমস্যা , ভালো টেক পণ্য নেই। বাংলাদেশ সরকার টেক পণ্য বানানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু সফলতা আসেনি। ভারতের দিকে তাকালে দেখতে পাই, তারা আন্তর্জাতিক কোলাবেরশনে কাজ করেছে। ফলে স্থানীয় কোম্পানি আন্তর্জাতিক কোম্পানির সাথে কোলাবেরশনে কাজ করায় মানসম্মত টেক পণ্য তৈরি করতে পেরেছে ইংরেজি বা অন্য ভাষায়।

তিনি আরো বলেন, এক্ষেত্রে আমাদের দেশে নিজেরা তৈরির চেষ্টা করেছে। যে কোম্পানিকে দিয়েছে, তাদের ওই কাজের অভিজ্ঞতা না থাকায় মানসম্মত টেক পণ্য আমরা এখনো হাতে পাইনি।

টেক পণ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে বিশেষজ্ঞরা কাজ করেন তাদের সাথে কোলাবেরশনে গেলে আমরা মানসম্মত টেক পণ্য তৈরি করতে পারবো। সরকার টেকপণ্যের জন্য কোনো আর্থিক সহায়তা তহবিল করেনি। টেক পণ্যের উন্নয়ন, গবেষণার জন্য একটি আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠনের উদ্যোগ সরকার নিতে পারে। এই তহবিল হলে অনেক উদ্যোক্তা এ নিয়ে গবেষণা করতে পারতেন জানালেন ভাস্কর ভট্টাচার্য ।

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

প্রবেশগম্যতা বৃদ্ধিতে উদ্ভাবনী ও ডিজিটাল উদ্যোগ-৪

বাংলা ভাষায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা সমৃদ্ধ করতে নানা প্রচেষ্টা

সর্বশেষ আপডেট ০৯:০৬:৩৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫

বাংলা ভাষায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা সমৃদ্ধ করতে সরকারি-বেসরকারিভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলছে নানা প্রচেষ্টাও।

স্কিন রিডার ও ইশারা ভাষার সফটওয়্যার
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যাতে সহজেই সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ বাড়াতে পারেন এনিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন গবেষণা চলছে। যাতে তথ্য প্রযুক্তির সুবিধা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা কম। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য তথ্য প্রযুক্তির প্রবেশগম্যতা বাড়ানো সমাজসেবার কাজ হলেও বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল এ নিয়ে কাজ করছে। এরিই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্য প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধিকরণ নামে একটি প্রকল্প চালু করেছে। একটি বেসরকারি কোম্পানি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কোলাবেরেশনে গবেষণাটি করছে।

এই প্রকল্পের আওতায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য স্কিন রিডার এবং বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ইশারা ভাষার সফটওয়্যার তৈরি করছে।
এর মাধ্যমে বাংলা ভাষাভাষী বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ছাড়াও যারা তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট তারাও ইশারা ভাষা ব্যবহার করতে পারবেন।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের ( বিসিসি) পরিকল্পনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. মাহবুব করিম বলেন, যাদের মোবাইল, কম্পিউটারে ডিভাইস আছে তাদের জন্য স্কিন রিডার প্রযোজ্য। স্কিন রিডার বড় সফটওয়্যার নয়। এটা ডেমো পর্যায়ে রয়েছে। পেশাগত কাজে ব্যবহার করার মতো এখনো কাজ সম্পন্ন হয়নি। আরেকটু পরিপূর্ণ হলে আমরা এটা প্রকাশ করবো। বাস্তবায়নে যতটা সময় লাগে। এটাতে তেমন কোনো চ্যালেঞ্জ নেই।

তিনি বলেন, ইশারা ভাষার সফটওয়্যারে কিছুটা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যারা বলতে ও শুনতে পান না ইশারার মাধ্যমে কথা বলেন, তাদের ইশারাটা এই সফটওয়্যার ক্যাচ করবে, কি বলতে চাচ্ছেন তা বাংলা ভাষায় শোনাবে বা লিখে দিবে। এজন্য প্রথমে ইশারাগুলোকে মানদণ্ড করা হয়েছে। ছবি-ভিডিও অন্তভুক্তি করা হয়েছে। এআই ব্যবহার করে একজন ব্যবহারকারী যখন তার সামনে ইশারা করবে সে সেটা প্রক্রিয়াকরণ করে তুলে ধরবে।

ইঞ্জিনিয়ার মো. মাহবুব করিম আরো বলেন, এর চ্যালেঞ্জ হলো ছবির আকার বড় হওয়ায় প্রক্রিয়াকরণ করে ফলাফল আসতে বেশ কয়েক সেকেন্ড সময় লাগছে। এই দেরি পযন্ত মানুষ অপেক্ষা করবে না। মানুষ দেওয়ার সাথে সাথে ফলাফল চায়। এর উপর গবেষণা এখনো চলছে। কিছু সময় কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের শক্তিশালী জিপিও ছিল না। জিপিও’র সমস্যা মিটেছে। এই কাজগুলো যাতে দ্রুত হয় তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গবেষণা করে সময়টা কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন এটা ব্যবহার করা যাবে। একটা ইশারা করার পর ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড অপেক্ষা করতে হচ্ছে এর তথ্য জানার জন্য।

একজন বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বাজারে কিছু কিনতে গিয়ে দোকানদারকে বোঝাতে পারছেন না। দোকানদারের কাছে মোবাইলে এটি থাকতে পারে। বা যেকোনো ব্যক্তির মোবাইলে ইশারা অ্যাপ সফটওয়্যার থাকতে পারে। অথাৎ এভাবেই ইশারা অ্যাপের মাধ্যমে ইশারা ভাষাটা মানুষের কাছে পৌঁছানো। আমাদের লক্ষ্যমাত্রা স্থানগুলো হলো ডাক্তারের চেম্বার, ডাক্তারের কাছে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি তাদের সমস্যাটা বলতে পারেন না। তৈরি হলে এটা ডাক্তারদের কাছে পাঠানো হবে। এই সফটওয়্যার ব্যবহার করলে ডাক্তার রোগীর সমস্যাটা জানতে পারবেন। আদালত কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন সাক্ষীর ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি বেশি পরিমাণে দরকার। সব জায়গায় আমরা এটাকে ছড়িয়ে দিবো। ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে এই গবেষণা সম্পন্ন করতে হবে। লক্ষ্যমাত্রা হলো বাংলা ভাষাভাষী সব বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রযোজ্য হবে। ভাষান্তরের মাধ্যমে অন্য ভাষাভাষী বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও এটি ব্যবহার করতে পারবেন।

বাংলা ভাষার সহায়ক উপকরণ
বৃটিশ কাউন্সিলে আইএলটিএস হতো। আইএলটিএস উঠিয়ে কম্পিউটার ভিত্তিক করা হয়েছে। এর ফলে বৃটিশ কাউন্সিলের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না শারীরিক প্রতিবন্ধী সুমনা খান। কম্পিউটারে পরীক্ষা দিতে হলে ওকে অনস্কিন বোডে লিখতে হবে। এই দুই জায়গায় প্রতিবন্ধিকতার শিকার হয়েছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে সুমনা খান বলেন , বিদেশে স্কলারশিপের জন্য চেষ্টা করেছি। কিন্তু পি,টি,ই পরীক্ষা দিতে গিয়ে বাধাগ্রস্ত হচ্ছি। আমি কাজ করি অন-স্ক্রীন কীবোর্ডে। আর মানুষেরা হাত দিয়ে কিবোর্ডে কাজ করেন। এটা পি,টি,ই অনুমোদন দিচ্ছে না। পি,টি,ই -এর প্রধান কার্যালয়েও মেইল করা হয়েছে। তারা বার বার এটা বাতিল করে দিচ্ছে। এখন জানতে পেরেছি, বৃটিশ কাউন্সিলে যে আইএলটিএস পেপার বেইজড হতো। এটা উঠিয়ে কম্পিউটার ভিত্তিক করা হয়েছে। এর ফলে বৃটিশ কাউন্সিলের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারব না। কম্পিউটারে পরীক্ষা দিতে হলে আমাকে অন-স্ক্রীন কীবোর্ডে লিখতে হবে। এই দুই জায়গায় প্রতিবন্ধিকতার শিকার হচ্ছি। যে কারণে আমার ক্যারিয়ার নিয়ে যে ভবিষ্যৎ চিন্তা ভাবনা তা আটকে গেছে।

অস্ট্রেলিয়ান এডুকেশনাল কনসাল্টেন্সি “এডুস্পায়ারে” বিজনেস ডেভেলপমেন্ট এক্সিকিউটিভ এবং একটি ওপিডিতে প্রোগাম অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন সুমনা খান। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে তিনি কাজ করছেন।

পরিবার থেকে তাকে কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়নি। তিনি আর পাঁচটা শিশুর মতোই বিদ্যালয়ে পড়েছেন। নার্সারি থেকে কেজি টু পর্যন্ত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়েছেন। প্রিপারেটিতে ভর্তি পরীক্ষায় ৯০০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে নবম হন। কিন্তু প্রতিবন্ধী শিশু হওয়ায় স্কুল তাকে ভর্তি নিতে অপারগতা প্রকাশ করে। মা তাদের সাথে লড়াই করে তাকে ওই স্কুলে ভর্তি করায়।

সুমনার মা শাহীন সুলতানা বলেন, মেইন স্ট্রিম স্কুলে প্রতিবন্ধী শিশুদের ভর্তির ব্যাপারে বাধা সৃষ্টি করে। তাদের সুযোগ না দিয়েই , মেধা যাচাই না করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তবে পরিবারের সহযোগিতা থাকলে সব বাধা অতিক্রম করা যায়। প্রতিবন্ধী শিশুকে সুযোগ দিলে এবং শিক্ষক, সহপাঠী সহযোগিতা করলে প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করা সম্ভব হয়।
তিনি আরো বলেন, পরবর্তীতে ওই স্কুলে অনেক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী পড়ার সুযোগ পেয়েছে।

অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময়ে ভলান্টিয়ার হিসেবে কিছু স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন সোসাইটি অফ দি ডেফ অ্যান্ড সাইন ল্যাংগুয়েজ ইউজার্স (এসডিএসএল), প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠন পরিষদ (ïকরেন সুমনা খান।

সুমনা খান বলেন, এখানে কাজ করতে এসে দেখেছি, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে আমি কোনো বৈষম্যের শিকার না হলেও প্রান্তিক পর্যায়ের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনেক ধরনের প্রতিবন্ধিতার শিকার হয়েছেন। সেটা পারিবারিকভাবে, আর্থিকভাবে, কাজের ক্ষেত্রে , শিক্ষা, মানসিকভাবে হতে পারে। সব ক্ষেত্রেই তারা বাধার সম্মুখীন হয়েছেন।

তিনি বলেন, শিক্ষা গ্রহণে কোনো সমস্যা না হলেও চাকরি ক্ষেত্রে আমার চ্যালেঞ্জ ছিল। আমি বাণিজ্যিক জায়গাগুলোতে চাকরি খুব কম করেছি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এনজিওতে চাকরি খুঁজতে হয়েছে। কারণ সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য সহায়ক কর্মপরিবেশ রয়েছে। নইলে দেখতে হয়েছে, যেখানে আমি বাসা থেকে কাজ করতে পারবো। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চাকরির তিক্ত অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটা জায়গায় চাকরি নিয়েছিলাম। সেটা চালিয়ে যেতে পারিনি । ওরা অনলাইনে ইন্টারভিউ নেয়। তখন তাদের বলেছিলাম, আমি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। আমার বাথরুমে যাওয়া, খাবারের সময় কারো সহযোগিতা লাগবে। এই সুবিধাটা লাগবে। তারা বলেছিলেন, কোনো সমস্যা হবে না। লোক দেওয়া যাবে। এইচআর এই কথাটা পরবর্তীতে ভুলে যায়। আমি অফিসে যোগদান করার পর তিনি আমাকে কোনো লোক দিতে পারেননি। আমি বাথরুমে যাওয়ার জন্য সাহার্য্যকারী চাইলে উল্টো হেডের কাছে নালিশ করেন। আমি আমার শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কথা লুকিয়েছি, সহযোগিতার জন্য কোনো সাহার্য্যকারী চাইনি। অথচ আমি আমার সিভি এবং আবেদনে সব সময় আমার শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কথা উল্লেখ করি। ডান হাত দিয়ে ধীর গতিতে লিখতে পারি। বাম হাতে কিছুই করতে পারি না। এরপর চাকরিটা সেখানে আর করা হয়নি।

সুমনার নাভ জন্ম থেকে দুর্বল । তাই ধীরে হাঁটেন। উঁচু নিচুতে চলাচল সমস্যা হয়। আগে একা চলতে পারলেও এখন পারেন না। আড়াই বছর ধরে হোম অফিস করেন। মেরুদণ্ডের হাড়ে সমস্যা ধরা পড়েছে। তিন চার ঘন্টা টানা বসে থাকতে পারেন না। থেমে থেমে কাজ করতে হয়।

তিনি বলেন, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মাসিক আয় না থাকলে তার চিকিৎসা খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। মাসে ১০ হাজার টাকার উপরে ওষুধের পেছনে খরচ হয়।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতায় বাংলা ভাষার সহায়ক উপকরণ নিয়ে কেউ সচেতন নয়। এমনকি অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান, ওয়েব সাইট, ডিজিটাল
সার্ভিস সহায়ক নয়। এ নিয়ে মানুষ যত তাড়াতাড়ি সচেতন হবেন, তত তাড়াতাড়ি কাজ হবে। এক্ষেত্রে দরকার সরকারি পযায়ে আইনগত ভিত্তি এবং টেক পণ্যের প্রবেশগম্যতা।
বাংলা ভাষায় যে তথ্য প্রযুক্তি রয়েছে সেগুলো সহায়ক উপকরণে সহজতর করতে কাজ করছেন ইনটিলিয়ন টেকব্রিজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী আশিকুর রহমান অমিত। তিনি একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি । বাংলা ভাষার সহায়ক উপকরণের প্রতিবন্ধকতা নিরসনে কাজ করছেন।

বাংলা ভাষার সহায়ক উপকরণের প্রতিবন্ধকতা নিরসনে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি । প্রথমত সচেতনতা, দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রের একটা আইনগত জায়গা
নির্ধারণ, তৃতীয়ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীদারিত্ব।

আশিকুর রহমান অমিত জানান, প্রথম শুরু করেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা মোবাইলে ওয়ার্ডস ফাইল পড়তে পারতেন না। এই সমস্যা সমাধানে একটা ডক রিডার তৈরি করেন। একটা বড় সংখ্যক প্রতিষ্ঠান যারা ব্রেইল প্রিন্টিং এ কাজ করেন। তাদের ব্রেইল প্রিন্টার নষ্ট হয়ে গেলে ভারত কিংবা মালয়েশিয়ায় নিয়ে যেতে হতো। পাসগুলো সচরাচর দেশে পাওয়া যেতো না। ইনডেস্কে লিডারশিপ নেই। তিনি বলেন, এই সমস্যাগুলো থেকে বের হয়ে আসতে আমরা ব্রেইল পদ্ধতিটাকে সহজতর করি। রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্টে কাজ করতে গিয়ে আরেকটি সমস্যার সম্মুখীন হই। বাংলা ভাষার জন্য সহায়ক উপকরণ নেই। অন্যদিকে যে পণ্য গুলো আন্তজাতিক পযায়ে ইংরেজি ভাষায় রয়েছে তা বাংলায় ভাষান্তরের চেষ্টা করছি। এক্ষেত্রে বড় বাধা আমরা যখন টেক পণ্য আমদানি করি, টেক পণ্যের জন্য সুনির্দিষ্ট এইচএস কোড নেই। এইচ এস কোড ইস্যু হলো যতগুলো পণ্য বাংলাদেশে আসে বা আমদানি করা হয় এর সবগুলোর জন্য সরকার থেকে আলাদা আলাদা এইচ এস কোড নির্ধারণ করা থাকে । যার অধীনে ওই পণ্যের শুল্ক , মূল্য সংযোজন কর কত হবে তা নির্ধারণ করা হয়।

আশিকুর রহমান অমিত আরো বলেন, টেকের উপর এইচএসকোড না থাকায় প্রিন্টার স্বাভাবিক কোডে আনতে হয়। বা আমরা এই সম্পর্কিত অন্য কোনো ডিভাইস আনলে প্রিন্টার এইচএস কোডে আনতে হয়। সহায়ক উপকরণের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় বাধা।

তিনি বলেন, প্রযুক্তির প্রবেশগম্যতার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তিনটি মানদণ্ড মেনে চলতে হয়। এ, ডাবল এ এবং ত্রিপল এ।

এ মৌলিক মানদন্ড – কনটেন্ট এবং টেকনোলজি দুই জায়গা থেকে প্রবেশগম্যতা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, সরকার এখন পযন্ত মাত্র ৭০ শতাংশ প্রবেশগম্যতা করতে পেরেছে ।
ডাবল এ মানদন্ড – বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ন্যুনতম সুবিধা দেওয়া। বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য বাধার -জায়গাগুলো কোথায়? কোনো ভিডিও ডকুমেন্ট তৈরি। লেখা ও ক্যাপশন আছে, ভিডিও দেখে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বুঝবে। ডাবল এ’র মানদন্ডে এখন আমরা কাজ করছি।

ত্রিপল এ স্ট্যান্ডার্ড হচ্ছে – ভিডিও ডকুমেন্টসে সাইন ল্যাগুয়েজ থাকা। বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ক্ষেত্রে কেবল ক্যাপশন দেওয়া ছাড়া খুব কমই ডকুমেন্টস আছে। যেখানে থ্রিপল এ মানদন্ড মানা হয়।

তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশে যারা উদ্যেক্তা, টেক ওয়েন্টার প্রেইনার রয়েছেন তারা প্রবেশগম্যতার আন্তর্জাতিক মানদন্ড নিয়ে এখনো সচেতন নয়।
টেক কোম্পানিগুলো যখন পণ্য উৎপাদন করে , তারা ভাবে কতোটা লক্ষ্য অর্জন করা যাবে। বাংলাদেশের বাজারে তা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বা প্রতিবন্ধী মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকে না। টেক শিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকারকে সহায়তা করতে হবে। এই কাজগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একসাথে কাজ করতে হবে। তাহলে অনেকগুলো দরজা খুলে যাবে। উন্নত বিশ্বের টেক পণ্য গুলোর যেগুলো বাজারে এসেছে এর ৯৮ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা হয়েছে। এরপর টেক ইন্ড্রাস্টি সেগুলোকে গ্রহণ করেছে।

টেক পণ্য গুলো বাজারে আসায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা উপকৃত হচ্ছেন। আমাদের স্মার্ট সাদাছড়ি আছে, যা ভয়েজ নির্দেশ দেয়। ডানে যেতে হবে, বামে যেতে হবে। কতদূর যাবে। এই জিনিসগুলো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এটুআই প্রোগ্রামের ন্যাশনাল কনসালটেন্ট – অ্যাক্সেসিবিলিটি ভাস্কর ভট্টাচার্য এ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের প্রধান সমস্যা , ভালো টেক পণ্য নেই। বাংলাদেশ সরকার টেক পণ্য বানানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু সফলতা আসেনি। ভারতের দিকে তাকালে দেখতে পাই, তারা আন্তর্জাতিক কোলাবেরশনে কাজ করেছে। ফলে স্থানীয় কোম্পানি আন্তর্জাতিক কোম্পানির সাথে কোলাবেরশনে কাজ করায় মানসম্মত টেক পণ্য তৈরি করতে পেরেছে ইংরেজি বা অন্য ভাষায়।

তিনি আরো বলেন, এক্ষেত্রে আমাদের দেশে নিজেরা তৈরির চেষ্টা করেছে। যে কোম্পানিকে দিয়েছে, তাদের ওই কাজের অভিজ্ঞতা না থাকায় মানসম্মত টেক পণ্য আমরা এখনো হাতে পাইনি।

টেক পণ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে বিশেষজ্ঞরা কাজ করেন তাদের সাথে কোলাবেরশনে গেলে আমরা মানসম্মত টেক পণ্য তৈরি করতে পারবো। সরকার টেকপণ্যের জন্য কোনো আর্থিক সহায়তা তহবিল করেনি। টেক পণ্যের উন্নয়ন, গবেষণার জন্য একটি আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠনের উদ্যোগ সরকার নিতে পারে। এই তহবিল হলে অনেক উদ্যোক্তা এ নিয়ে গবেষণা করতে পারতেন জানালেন ভাস্কর ভট্টাচার্য ।