ঢাকা ০৭:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চার খুন কি পরিকল্পিত? মিলছে না মাদকের তত্ত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৪:০৯:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 40

রংপুরে চার হত্যা

রংপুরের বহুল আলোচিত চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে হত্যার যে দাবি করা হয়েছিল, অনুসন্ধানে সেই বর্ণনার সঙ্গে বেশ কিছু তথ্যের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। ঘটনাটি তাৎক্ষণিক কোনো বিরোধের জেরে নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে; এমন প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।

রংপুর জেলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশ সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নামে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের জবানবন্দির বরাতে মাদক সেবনের পর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানানো হয়। তবে একাত্তর টিভির এক বিশেষ অনুসন্ধানে পুলিশের ওই প্রাথমিক বক্তব্যের সঙ্গে বিভিন্ন তথ্যের অসামঞ্জস্য উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘটনার রাতে কথিত ইয়াবা সেবনের স্থান, অভিযুক্তদের চলাচল এবং সীমান্ত নামে এক তরুণের মায়ের বক্তব্যের সঙ্গে পুলিশের এজাহারে উল্লেখ করা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যাওয়ার পথেই মাদক সেবনের সুযোগ থাকার কথা বলা হলেও সেখানে অভিযুক্তরা কেন নীরবে একে একে চারজনকে হত্যা করল এবং প্রতিবেশীরা কোনো শব্দ শুনতে পেলেন না; তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

প্রযুক্তিগত তথ্যেও দেখা গেছে, ২১ আগস্ট রাত ৩টা থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত গণপতি চক্রবর্তী ও অভিযুক্তদের মোবাইল একই টাওয়ার এলাকার আওতায় ছিল। তবে একই টাওয়ার এলাকায় অবস্থান করলেই যে তারা একই জায়গায় ছিলেন, এমনটি নিশ্চিত হওয়া যায় না।

হত্যাকাণ্ডের পেছনে আর্থিক কারণ থাকার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। গণপতি চক্রবর্তীর প্রভিডেন্ট ফান্ডে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ছিল বলে গুঞ্জন ছড়ায়। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাচারী বাজারের সোনালী ব্যাংক শাখায় থাকা ওই প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে তিনি কোনো অর্থ উত্তোলন করেননি। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, এলপিআরে থাকায় ওই সময়ে তাঁর পেনশনের অর্থ পাওয়ার সুযোগও ছিল না। ফলে শুধু আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে; এমন ধারণার পক্ষে এখনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদ্যুৎ সংযোগ। সিসিটিভি ফুটেজে হত্যাকাণ্ডের সময় সন্দেহজনক কোনো মোটরসাইকেলের চলাচল দেখা না গেলেও গণপতি চক্রবর্তীর ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ পোল থেকে বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি সামনে এসেছে। ওই এলাকায় সেদিন নির্দিষ্ট ফিডারে মাত্র ১ ঘণ্টা ১৩ মিনিট লোডশেডিং ছিল বলে জানা গেলেও পোল থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি নেসকো বা পুলিশের তদন্তে গুরুত্ব পায়নি বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের বক্তব্যেও হত্যাকাণ্ডের আগে গণপতি চক্রবর্তীর মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর বন্ধু চায়ের দোকানি প্রদীপ ও শ্যালিকার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার আগের প্রায় দেড় মাস তিনি ঘর বন্ধ করে ঘুমাতেন। এমনকি মজা করেও নিজের জীবননাশের আশঙ্কার কথা বলতেন।

নিহতদের মধ্যে কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থী আগামী চক্রবর্তীও ছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি এক বন্ধুর সঙ্গে চ্যাটে সরকারি চাকরিপ্রার্থী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ চেয়েছিলেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্কিত কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসার দাবি উঠেছে।

গণপতি চক্রবর্তীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর শেষ কলটি ২০ আগস্ট বিকেলে স্ত্রীর মোবাইল থেকে এসেছিল। ওই মোবাইলটি পরদিন ভোর ৬টা ৫ মিনিটে বন্ধ হয়ে যায়। এই সময়সীমার মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, জবানবন্দিতে মাদক সেবনের বিষয়টি উল্লেখ করে অভিযুক্তরা তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করে থাকতে পারে।

চার হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠায় এখন ঘটনার প্রকৃত কারণ, হত্যার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী এবং সম্ভাব্য উদ্দেশ্য খুঁজে বের করতে নিরপেক্ষ ও গভীর পুনঃতদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে। নিহত পরিবারের স্বজনদের মধ্যেও এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

চার খুন কি পরিকল্পিত? মিলছে না মাদকের তত্ত্ব

সর্বশেষ আপডেট ০৪:০৯:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রংপুরের বহুল আলোচিত চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে হত্যার যে দাবি করা হয়েছিল, অনুসন্ধানে সেই বর্ণনার সঙ্গে বেশ কিছু তথ্যের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। ঘটনাটি তাৎক্ষণিক কোনো বিরোধের জেরে নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে; এমন প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।

রংপুর জেলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশ সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নামে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের জবানবন্দির বরাতে মাদক সেবনের পর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানানো হয়। তবে একাত্তর টিভির এক বিশেষ অনুসন্ধানে পুলিশের ওই প্রাথমিক বক্তব্যের সঙ্গে বিভিন্ন তথ্যের অসামঞ্জস্য উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘটনার রাতে কথিত ইয়াবা সেবনের স্থান, অভিযুক্তদের চলাচল এবং সীমান্ত নামে এক তরুণের মায়ের বক্তব্যের সঙ্গে পুলিশের এজাহারে উল্লেখ করা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যাওয়ার পথেই মাদক সেবনের সুযোগ থাকার কথা বলা হলেও সেখানে অভিযুক্তরা কেন নীরবে একে একে চারজনকে হত্যা করল এবং প্রতিবেশীরা কোনো শব্দ শুনতে পেলেন না; তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

প্রযুক্তিগত তথ্যেও দেখা গেছে, ২১ আগস্ট রাত ৩টা থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত গণপতি চক্রবর্তী ও অভিযুক্তদের মোবাইল একই টাওয়ার এলাকার আওতায় ছিল। তবে একই টাওয়ার এলাকায় অবস্থান করলেই যে তারা একই জায়গায় ছিলেন, এমনটি নিশ্চিত হওয়া যায় না।

হত্যাকাণ্ডের পেছনে আর্থিক কারণ থাকার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। গণপতি চক্রবর্তীর প্রভিডেন্ট ফান্ডে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ছিল বলে গুঞ্জন ছড়ায়। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাচারী বাজারের সোনালী ব্যাংক শাখায় থাকা ওই প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে তিনি কোনো অর্থ উত্তোলন করেননি। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, এলপিআরে থাকায় ওই সময়ে তাঁর পেনশনের অর্থ পাওয়ার সুযোগও ছিল না। ফলে শুধু আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে; এমন ধারণার পক্ষে এখনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদ্যুৎ সংযোগ। সিসিটিভি ফুটেজে হত্যাকাণ্ডের সময় সন্দেহজনক কোনো মোটরসাইকেলের চলাচল দেখা না গেলেও গণপতি চক্রবর্তীর ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ পোল থেকে বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি সামনে এসেছে। ওই এলাকায় সেদিন নির্দিষ্ট ফিডারে মাত্র ১ ঘণ্টা ১৩ মিনিট লোডশেডিং ছিল বলে জানা গেলেও পোল থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি নেসকো বা পুলিশের তদন্তে গুরুত্ব পায়নি বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের বক্তব্যেও হত্যাকাণ্ডের আগে গণপতি চক্রবর্তীর মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর বন্ধু চায়ের দোকানি প্রদীপ ও শ্যালিকার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার আগের প্রায় দেড় মাস তিনি ঘর বন্ধ করে ঘুমাতেন। এমনকি মজা করেও নিজের জীবননাশের আশঙ্কার কথা বলতেন।

নিহতদের মধ্যে কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থী আগামী চক্রবর্তীও ছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি এক বন্ধুর সঙ্গে চ্যাটে সরকারি চাকরিপ্রার্থী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ চেয়েছিলেন বলে জানা গেছে। বিষয়টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্কিত কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসার দাবি উঠেছে।

গণপতি চক্রবর্তীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর শেষ কলটি ২০ আগস্ট বিকেলে স্ত্রীর মোবাইল থেকে এসেছিল। ওই মোবাইলটি পরদিন ভোর ৬টা ৫ মিনিটে বন্ধ হয়ে যায়। এই সময়সীমার মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, জবানবন্দিতে মাদক সেবনের বিষয়টি উল্লেখ করে অভিযুক্তরা তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করে থাকতে পারে।

চার হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠায় এখন ঘটনার প্রকৃত কারণ, হত্যার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী এবং সম্ভাব্য উদ্দেশ্য খুঁজে বের করতে নিরপেক্ষ ও গভীর পুনঃতদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে। নিহত পরিবারের স্বজনদের মধ্যেও এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে।