খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
- সর্বশেষ আপডেট ১২:১১:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 12
৪৮ বছরে পা দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দলটির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। তবে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য অন্য সময়ের তুলনায় আলাদা। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় এবারই প্রথম সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ছাড়া প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে দলটি।
গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এটিই বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ফলে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে উঠে এসেছে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকা, উত্তরাধিকার এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে বিএনপির ভবিষ্যৎ পথচলার বিষয়টি।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে চার দশকের বেশি সময় ধরে নানা রাজনৈতিক উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও সংকটের মধ্য দিয়ে দলটি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
বিএনপির দীর্ঘ ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দলের নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া। স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি আশির দশকে সক্রিয়ভাবে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে দলের কাউন্সিলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর প্রায় চার দশক দলটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বে ছিলেন তিনি।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনে তাঁর ভূমিকার কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান। এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের রাজনৈতিক পালাবদলেও বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হলে তিনি আবারও সরকারপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন কেবল ক্ষমতার পালাবদল ও নির্বাচনী সাফল্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। ২০০৭ সালের পর রাজনৈতিক সংকটের সময়ে মামলা ও কারাবাসের মুখে পড়েন। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সীমিত হয়ে যায়। বিএনপি বরাবরই এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে এসেছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর খালেদা জিয়া মুক্তি পেলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এবার প্রথমবারের মতো তাঁকে ছাড়া প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে বিএনপি। দলটির নেতাকর্মীদের কাছে তিনি শুধু একজন চেয়ারপারসন ছিলেন না; দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন, সাংগঠনিক ঐক্য ও নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান প্রতীকও ছিলেন।
তাঁর অনুপস্থিতিতে বিএনপির নেতৃত্বে তারেক রহমানের ভূমিকা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার পর তাঁর দেশে ফেরাকে ঘিরে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধারণ করে দলকে এগিয়ে নেওয়া, সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানো এবং নেতাকর্মীদের ঐক্য ধরে রাখা এখন নতুন নেতৃত্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘গণতন্ত্রের মাতা ও আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দেখিয়ে দেওয়া গণতন্ত্রের পথেই বিএনপির পথচলা। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, জাতীয়তাবাদ থাকবে, তত দিন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য একই সঙ্গে স্মরণ ও নতুন করে পথচলার উপলক্ষ। প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন এবং খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সংগ্রামের উত্তরাধিকার সামনে রেখে নতুন নেতৃত্বে দলটি কীভাবে এগিয়ে যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
৪৮ বছরের পথচলায় বিএনপি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে এবং বিরোধী দল হিসেবেও বিভিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে দলটি একটি স্থায়ী অবস্থান তৈরি করেছে। সেই দীর্ঘ পথচলায় জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠাকালীন ভূমিকার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি গড়ে উঠেছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে।
এবার সেই নেত্রী নেই। রয়েছে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। সেই উত্তরাধিকারকে সামনে রেখে ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপি এখন নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের দিকে তাকিয়ে।



















