বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন
চাকরি হারাবে ৬ লাখ, বাড়বে দারিদ্র্য
- সর্বশেষ আপডেট ১২:৫১:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
- / 13
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, গ্যাস সংকট, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সার সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে দেশের কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি আরও চাপে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটির এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে চলতি বছর দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা থাকা মানুষের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
সরকারকে বাজেট সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে এই মূল্যায়ন করা হয়।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে। চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু সংঘাতের কারণে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের কারণে আরও বিপুলসংখ্যক মানুষের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সংস্থাটি বলছে, এ বছর দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ভূমিকা থাকতে পারে প্রায় ১০ শতাংশ। জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু পরিবহন বা বিদ্যুৎ খাতেই নয়, শিল্প উৎপাদন, কৃষি এবং খাদ্যপণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়বে।
জ্বালানির বাড়তি ব্যয় ধাপে ধাপে ভোক্তার ওপর চাপানো হলে মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্বব্যাংকের। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন নিম্নআয়ের মানুষ এবং ধনী-গরিবের বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।
তবে অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছেন, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত না হলে মূল্যস্ফীতি আরও কমত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জ্বালানি নির্ভরতায় বড় ঝুঁকি
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে সরাসরি ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। অথচ ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় বর্তমানে দেশে গ্যাস উৎপাদন প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।
সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটিকে ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এদিকে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (এমএমবিটিইউ) ২৪ থেকে ২৮ ডলারে উঠেছে, যা আগের দামের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। সেপ্টেম্বরের জন্য দুটি এলএনজি চালান কিনতে বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিটে ২৪ ডলারের বেশি ব্যয় করতে হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, জ্বালানি খাতের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান একদিনে সম্ভব নয়। আগের সময়ের বিভিন্ন সমস্যা উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া গেছে এবং সেগুলো সমাধানে সময় লাগবে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি মোট দেশজ উৎপাদনের ২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
ভর্তুকির চাপ বাড়লে সরকারকে অন্যান্য খাতে ব্যয় কমাতে হতে পারে। এতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও জরুরি প্রয়োজনীয় খাতে সরকারি ব্যয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চাপ বাড়ছে কৃষিতেও
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে কৃষি খাতেও। সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের আমদানি ও সরবরাহে সমস্যা হলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন ক্ষুদ্র কৃষকেরা। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন অনেকটাই সারের ওপর নির্ভরশীল। দেশে প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ৩৯১ দশমিক ৯ কেজি সার ব্যবহার করা হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের সরবরাহে সংকট তৈরি হলে দেশের কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন দ্রুত চাপে পড়তে পারে।
দেশের ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিকে ইতোমধ্যে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়ার দামও প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে সারের দাম দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
স্বাস্থ্য খাতেও বাড়তি চাপ
জ্বালানি ও সরবরাহ সংকটের প্রভাব পড়তে পারে স্বাস্থ্য খাতেও। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যয় বাড়ায় দেশের প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৬ হাজার ২০০ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে।
দেশের বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিদ্যুৎ বিল বাবদ মাসে কয়েক লাখ ডলার পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, ফলে জ্বালানি ব্যয়ও বাড়ছে।
ওষুধ শিল্পও আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। দেশের প্রায় ২৫০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে ওষুধ তৈরির কাঁচামাল আমদানি করে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে ব্যবহৃত ৯০ শতাংশের বেশি চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয় বাড়লে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ও বেড়ে যায়।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাড়তি ব্যয়ের কারণে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ
অর্থনীতিতে বিদ্যমান চাপের সঙ্গে নতুন করে জ্বালানি সংকট যুক্ত হওয়ায় কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমানো, কাজের সময় কমিয়ে দেওয়া এবং কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ইতোমধ্যে সামনে এসেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কার কিছু লক্ষণ বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান।
তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। কোথাও কাজের সময় কমানো হয়েছে, আবার জ্বালানি সংকটের কারণে কিছু কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে।
তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে কারখানা বন্ধ হওয়া এবং শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ঘটনাই পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন মূলত বিদ্যমান বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে সামনে এনেছে।

































