ঢাকা ১০:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্ষমতা সীমাবদ্ধতায় বড় সংস্কার থমকে ছিল: সাবেক অর্থ উপদেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৯:৩৮:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬
  • / 13

রাজনৈতিক ম্যান্ডেট ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি এমন এক সংকটে ছিল, যেখানে কাঠামো মেরামতই ছিল প্রথম অগ্রাধিকার—নতুন সংস্কার নয়।

রাজধানীর বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর ৫৮তম সমাবর্তনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিবিএ, এমবিএ, ইএমবিএ ও ডিবিএ—এই চার প্রোগ্রামের শতাধিক শিক্ষার্থী সনদ গ্রহণ করেন।

সালেহউদ্দিন আহমেদ তার বক্তব্যে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাদের হাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল না। ফলে যেসব পরিবর্তন দ্রুত দৃশ্যমান হওয়া দরকার ছিল, তা অনেক ক্ষেত্রে ধীরগতিতে এগিয়েছে। তার ভাষায়, “আগে ভেঙে পড়া ব্যবস্থাকে দাঁড় করাতে হয়েছে, তারপর সংস্কারের দিকে যেতে হয়েছে।”

তিনি আরও ইঙ্গিত করেন, অর্থনীতির তৎকালীন অবস্থা ছিল বেশ নাজুক। ব্যাংক খাত, পুঁজিবাজার এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় অস্থিরতা ছিল ছড়িয়ে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও চাপের মধ্যে ছিল, আর লেনদেনের ভারসাম্যও নেতিবাচক অবস্থায় পৌঁছেছিল। পরে কিছু সূচকে স্থিতিশীলতা ফিরলেও কাঠামোগত দুর্বলতা পুরোপুরি কাটেনি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ব্যাংক খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছিল। কেবল প্রশাসনিক নির্দেশনা দিয়ে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলেও তিনি মত দেন। তার মতে, দুর্বল আইন রেখে ভালো ফল আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।

অর্থনীতিতে সুশাসনের ঘাটতির দিকেও তিনি ইঙ্গিত করেন। সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতেই জবাবদিহির অভাব দীর্ঘ প্রকল্প বিলম্ব ও অপচয়ের জন্ম দিয়েছে—এমন মন্তব্য করেন তিনি। কিছু প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের বহু বছর পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি বলেও উল্লেখ করেন।

জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের গ্যাস অনুসন্ধানে উদাসীনতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো যেখানে এগিয়ে গেছে, সেখানে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার প্রবণতা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

রপ্তানি খাতে প্রণোদনা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিল্প প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। তার মতে, দীর্ঘ সময় সুরক্ষা দিলেও কিছু খাত এখনো পূর্ণ পরিপক্বতা অর্জন করতে পারেনি।

বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক শুল্ক কাঠামো ভবিষ্যতে আরও প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে সম্ভাবনার দিকটিও তিনি পুরোপুরি নাকচ করেননি। দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একই জায়গা থেকে শুরু করেও সঠিক নীতি ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে দেশগুলো অনেক দূর এগিয়েছে। বাংলাদেশও চাইলে সে পথ অনুসরণ করতে পারে—এমন মত দেন তিনি।

সমাবর্তনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে কেবল জ্ঞান বা দক্ষতা যথেষ্ট নয়; ধারাবাহিক শেখা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতাও জরুরি। তার মতে, সুযোগ কমে আসছে—তাই প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

ক্ষমতা সীমাবদ্ধতায় বড় সংস্কার থমকে ছিল: সাবেক অর্থ উপদেষ্টা

সর্বশেষ আপডেট ০৯:৩৮:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬

রাজনৈতিক ম্যান্ডেট ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি এমন এক সংকটে ছিল, যেখানে কাঠামো মেরামতই ছিল প্রথম অগ্রাধিকার—নতুন সংস্কার নয়।

রাজধানীর বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর ৫৮তম সমাবর্তনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিবিএ, এমবিএ, ইএমবিএ ও ডিবিএ—এই চার প্রোগ্রামের শতাধিক শিক্ষার্থী সনদ গ্রহণ করেন।

সালেহউদ্দিন আহমেদ তার বক্তব্যে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাদের হাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ণ রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল না। ফলে যেসব পরিবর্তন দ্রুত দৃশ্যমান হওয়া দরকার ছিল, তা অনেক ক্ষেত্রে ধীরগতিতে এগিয়েছে। তার ভাষায়, “আগে ভেঙে পড়া ব্যবস্থাকে দাঁড় করাতে হয়েছে, তারপর সংস্কারের দিকে যেতে হয়েছে।”

তিনি আরও ইঙ্গিত করেন, অর্থনীতির তৎকালীন অবস্থা ছিল বেশ নাজুক। ব্যাংক খাত, পুঁজিবাজার এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় অস্থিরতা ছিল ছড়িয়ে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও চাপের মধ্যে ছিল, আর লেনদেনের ভারসাম্যও নেতিবাচক অবস্থায় পৌঁছেছিল। পরে কিছু সূচকে স্থিতিশীলতা ফিরলেও কাঠামোগত দুর্বলতা পুরোপুরি কাটেনি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ব্যাংক খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছিল। কেবল প্রশাসনিক নির্দেশনা দিয়ে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলেও তিনি মত দেন। তার মতে, দুর্বল আইন রেখে ভালো ফল আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।

অর্থনীতিতে সুশাসনের ঘাটতির দিকেও তিনি ইঙ্গিত করেন। সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতেই জবাবদিহির অভাব দীর্ঘ প্রকল্প বিলম্ব ও অপচয়ের জন্ম দিয়েছে—এমন মন্তব্য করেন তিনি। কিছু প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের বহু বছর পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি বলেও উল্লেখ করেন।

জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের গ্যাস অনুসন্ধানে উদাসীনতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো যেখানে এগিয়ে গেছে, সেখানে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার প্রবণতা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

রপ্তানি খাতে প্রণোদনা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিল্প প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। তার মতে, দীর্ঘ সময় সুরক্ষা দিলেও কিছু খাত এখনো পূর্ণ পরিপক্বতা অর্জন করতে পারেনি।

বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক শুল্ক কাঠামো ভবিষ্যতে আরও প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে সম্ভাবনার দিকটিও তিনি পুরোপুরি নাকচ করেননি। দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একই জায়গা থেকে শুরু করেও সঠিক নীতি ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে দেশগুলো অনেক দূর এগিয়েছে। বাংলাদেশও চাইলে সে পথ অনুসরণ করতে পারে—এমন মত দেন তিনি।

সমাবর্তনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে কেবল জ্ঞান বা দক্ষতা যথেষ্ট নয়; ধারাবাহিক শেখা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতাও জরুরি। তার মতে, সুযোগ কমে আসছে—তাই প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই।