অপসংস্কৃতি ও মূল্যবোধের অবক্ষয় ঠেকাতে জনমত গঠনের আহ্বান
- সর্বশেষ আপডেট ১০:২৮:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 9
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপসংস্কৃতির বিস্তার, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্টজনেরা। এসব অনাচার ও সামাজিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার নারী ও কন্যা নির্যাতন এবং সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির সদস্যদের সঙ্গে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, সামাজিক অস্থিরতা ও অনাচার প্রতিরোধে করণীয় নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন নারী ও কন্যা নির্যাতন এবং সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদা রেহানা বেগম।
সভায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক ড. রওনক জাহান, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও গবেষক মফিদুল হক, চর্চা ডটকমের সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক সোহরাব হাসান, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব জামান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস.এম.এ. সবুর, আরআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. মেঘনা গুহ ঠাকুরতা এবং দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের যুগ্ম সম্পাদক মাসুদ করিম। সভা সঞ্চালনা করেন সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির সদস্য ও কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা।
অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশুর প্রতি নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। বিশেষ করে ছেলেশিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা আগে তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেলেও এখন তা বাড়ছে। নির্যাতনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষকে টার্গেট করা হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীকে দায়ী করার প্রবণতা এবং সামাজিক রীতিনীতিতে পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, গত দেড় বছরে সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধে প্রতিটি ঘটনার সঠিকভাবে মনিটরিং এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শনের ওপর গুরুত্ব দেন এম এম আকাশ।
সিনিয়র সাংবাদিক বাসুদেব ধর বলেন, দেশে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অনাচারের ঘটনা ঘটছে। স্বাধীনতার পর ৫৪ বছরে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হামলার বিচার না হওয়ায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। গত দেড় বছরে এ ধরনের ঘটনা বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি মব সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন জোরদারের আহ্বান জানান।
মুক্তিযোদ্ধা ও আমরা ৭১-এর সভাপতি মাহবুব জামান বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রচারণা দেশের সমাজকে প্রভাবিত করছে। নারী ও শিশুর প্রতি অনাচার বন্ধে তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
ড. মেঘনা গুহ ঠাকুরতা বলেন, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির কার্যক্রম কেন্দ্র থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের কর্মসূচি ও উদ্যোগের প্রচার গণমাধ্যমে আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন ড. আরসাদ চৌধুরী বলেন, নির্যাতনের সঠিক পরিসংখ্যান তৈরির ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। অনলাইন রিপোর্টের ভিত্তিতে ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষক ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দার বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে সরকারকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
বিবার্তা ২৪ ডট নেটের বিশেষ প্রতিবেদক ও উইমেন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের কো-অর্ডিনেটর আঙ্গুর নাহার মন্টি বলেন, সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ জাতীয় কমিটিকে সমন্বিত বা মাল্টিসেক্টরাল পদ্ধতিতে কাজ করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
গ্রীন ভয়েজ বহ্নিশিখার সমন্বয়ক আলমগীর কবির বলেন, বর্তমানে বিকৃত ইতিহাসের চর্চা বাড়ছে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দেশীয় সংস্কৃতিমুখী করতে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, সামাজিক অনাচার প্রতিরোধে নারী-পুরুষের বিভাজন না করে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে আরও প্রতিবাদী ভূমিকা নিতে হবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়, তরুণ ও ডিজিটাল স্বেচ্ছাসেবক তৈরি এবং যেকোনো ধরনের হয়রানির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক জাগরণ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
জাতীয় কমিটির সদস্য লূনা নুর বলেন, রাষ্ট্রের দায়কে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। নারী ও শিশুকে ক্ষতিগ্রস্ত করে; এমন সিদ্ধান্তগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ফেরদৌসী সুলতানা বলেন, নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি অনাচার প্রতিরোধে আন্দোলনের পাশাপাশি অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমও চালিয়ে যেতে হবে। সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির সব সদস্যকে নিয়ে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

































