ঢাকা ১০:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গোপালগঞ্জের কণ্ঠস্বর কেন অনুপস্থিত?

জামশেদ নাজিম
  • সর্বশেষ আপডেট ০৯:১৪:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ জুলাই ২০২৫
  • / 437

গোপালগঞ্জের কণ্ঠস্বর কেন অনুপস্থিত?

গত ক’দিন ধরে টেলিভিশনের পর্দায়, ফেসবুকের দেয়ালে, ইউটিউবের লাইভে—গোপালগঞ্জ নিয়ে অসংখ্য আলোচনা, মতামত আর বিশ্লেষণ শুনলাম। কেউ পক্ষে, কেউ বিপক্ষে। কেউ রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন, কেউ আবেগের ঢেউ তুলেছেন, কেউ আবার হিসাব-নিকাশের পাতায় তুলে ধরেছেন গোপালগঞ্জের ঘটনাপ্রবাহ।

এসব বিষয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। কারও মতামতের প্রতিও কোনো আপত্তি নেই। বরং একটা গভীর আফসোস আছে—সহজ অথচ তীব্র এক আফসোস।

আফসোস এই— যে গোপালগঞ্জকে ঘিরে এত আবেগ, এত ইতিহাস, এত আন্দোলন, সেই জেলার সাধারণ মানুষের মনের কথাগুলো কেউ শুনলো না। গোপালগঞ্জ যেন শুধুই আওয়ামী লীগের আবেগের ঠিকানা, ছাত্রলীগের পরিচয়পত্র হয়ে রয়ে গেল। অথচ এখানকার প্রতিটি মানুষ এই দেশের মানুষ। তারা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসেন, তেমনি দেশের ভবিষ্যত নিয়েও ভাবেন।

কিন্তু গণমাধ্যমে, আলোচনার আসরে, বিশ্লেষকদের টেবিলে—এই গোপালগঞ্জের সাধারণ মানুষের কণ্ঠ ছিল অনুপস্থিত। আলোচনার টেবিলে কি গোপালগঞ্জ জেলার মানুষ অতিথি হিসেবে যোগ্য নয়?

কেউ কি সত্যিই জানতে চেয়েছেন—এই জেলার মানুষগুলো কেন সেদিন পথে নামলেন? তারা কি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি ভালোবাসায় সাড়া দিয়েছেন, নাকি শেখ হাসিনার বিদায়বেলায় জন্ম নিয়েছে কোনো বঞ্চনার অভিমান?

আরও কষ্ট লাগে তখন, যখন দেখি গোপালগঞ্জ-১ (মুকসুদপুর-কাশিয়ানী) আসনে সর্বশেষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মুহাম্মদ ফারুক খান পেয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ভোট, আর তার প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী কাবীর মিয়া পেয়েছেন ১ লাখ ১৯ হাজার ভোট। গণনার নানা গুঞ্জনও ছিল, কেউ কেউ বলেছিলেন ঈগলের ভোটই বেশি ছিল।

এর মানে একটাই—এই গোপালগঞ্জেই অনেক মানুষ ভিন্নমত পোষণ করেন। তারা এখন আর চুপ করে থাকেন না। এই বাস্তবতা কি সরকার অনুধাবন করতে পেরেছে? বুঝতে পেরেছে মুকসুদপুর, কাশিয়ানী, এমনকি গোপালগঞ্জ সদরের মানুষের মনোজগতে কী পরিবর্তন ঘটছে?

তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—এই জেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এখন কতটা ন্যায্য আর কতটা বেপরোয়া? অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের নামে নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন, অর্থ লেনদেনের ঘৃণ্য চক্র গড়ে উঠছে। তাহলে কি শেখ হাসিনার সময়কার পুলিশের সঙ্গে বর্তমান সরকারের পুলিশের কোনো পার্থক্য থাকলো না?

আর মুকসুদপুর থানার সিন্ধিয়াঘাট ফাঁড়ির সেই উপপরিদর্শক আলমগীর—তিনি কত বছর ধরে এক ফাঁড়িতে? বদলির নিয়ম কি শুধু সাধারণ সদস্যদের জন্য? গোপালগঞ্জ জেলার সাবেক শেষ এসপির আশীর্বাদপুষ্ট এই এসআই কীভাবে এখনও এত দাপট নিয়ে কাজ করে যান, তা কি প্রশাসনের অজানা?

যা হোক, সব কথা বলা যায় না। তবুও বলি—গোপালগঞ্জ বাংলাদেশের মানচিত্রে একটি জেলা মাত্র, তবে আবেগে পূর্ণ এক জনপদ। এখানকার মানুষ বাংলাদেশের মানুষ। তাদেরও অধিকার আছে নিরাপত্তা পাওয়ার, কথা বলার, ন্যায়ের আশ্রয় খোঁজার।

গোপালগঞ্জকে রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক না বানিয়ে মানুষের জেলা হতে দিন। আলোচনায় অন্তত একবার তাঁদের কণ্ঠস্বর জায়গা পাক—যারা পথে হাঁটে, নেতার পাশে নয়, দেশের পাশে।

সাংবাদিক ও লেখক

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

গোপালগঞ্জের কণ্ঠস্বর কেন অনুপস্থিত?

সর্বশেষ আপডেট ০৯:১৪:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ জুলাই ২০২৫

গত ক’দিন ধরে টেলিভিশনের পর্দায়, ফেসবুকের দেয়ালে, ইউটিউবের লাইভে—গোপালগঞ্জ নিয়ে অসংখ্য আলোচনা, মতামত আর বিশ্লেষণ শুনলাম। কেউ পক্ষে, কেউ বিপক্ষে। কেউ রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন, কেউ আবেগের ঢেউ তুলেছেন, কেউ আবার হিসাব-নিকাশের পাতায় তুলে ধরেছেন গোপালগঞ্জের ঘটনাপ্রবাহ।

এসব বিষয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। কারও মতামতের প্রতিও কোনো আপত্তি নেই। বরং একটা গভীর আফসোস আছে—সহজ অথচ তীব্র এক আফসোস।

আফসোস এই— যে গোপালগঞ্জকে ঘিরে এত আবেগ, এত ইতিহাস, এত আন্দোলন, সেই জেলার সাধারণ মানুষের মনের কথাগুলো কেউ শুনলো না। গোপালগঞ্জ যেন শুধুই আওয়ামী লীগের আবেগের ঠিকানা, ছাত্রলীগের পরিচয়পত্র হয়ে রয়ে গেল। অথচ এখানকার প্রতিটি মানুষ এই দেশের মানুষ। তারা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসেন, তেমনি দেশের ভবিষ্যত নিয়েও ভাবেন।

কিন্তু গণমাধ্যমে, আলোচনার আসরে, বিশ্লেষকদের টেবিলে—এই গোপালগঞ্জের সাধারণ মানুষের কণ্ঠ ছিল অনুপস্থিত। আলোচনার টেবিলে কি গোপালগঞ্জ জেলার মানুষ অতিথি হিসেবে যোগ্য নয়?

কেউ কি সত্যিই জানতে চেয়েছেন—এই জেলার মানুষগুলো কেন সেদিন পথে নামলেন? তারা কি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি ভালোবাসায় সাড়া দিয়েছেন, নাকি শেখ হাসিনার বিদায়বেলায় জন্ম নিয়েছে কোনো বঞ্চনার অভিমান?

আরও কষ্ট লাগে তখন, যখন দেখি গোপালগঞ্জ-১ (মুকসুদপুর-কাশিয়ানী) আসনে সর্বশেষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মুহাম্মদ ফারুক খান পেয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ভোট, আর তার প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী কাবীর মিয়া পেয়েছেন ১ লাখ ১৯ হাজার ভোট। গণনার নানা গুঞ্জনও ছিল, কেউ কেউ বলেছিলেন ঈগলের ভোটই বেশি ছিল।

এর মানে একটাই—এই গোপালগঞ্জেই অনেক মানুষ ভিন্নমত পোষণ করেন। তারা এখন আর চুপ করে থাকেন না। এই বাস্তবতা কি সরকার অনুধাবন করতে পেরেছে? বুঝতে পেরেছে মুকসুদপুর, কাশিয়ানী, এমনকি গোপালগঞ্জ সদরের মানুষের মনোজগতে কী পরিবর্তন ঘটছে?

তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—এই জেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এখন কতটা ন্যায্য আর কতটা বেপরোয়া? অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের নামে নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন, অর্থ লেনদেনের ঘৃণ্য চক্র গড়ে উঠছে। তাহলে কি শেখ হাসিনার সময়কার পুলিশের সঙ্গে বর্তমান সরকারের পুলিশের কোনো পার্থক্য থাকলো না?

আর মুকসুদপুর থানার সিন্ধিয়াঘাট ফাঁড়ির সেই উপপরিদর্শক আলমগীর—তিনি কত বছর ধরে এক ফাঁড়িতে? বদলির নিয়ম কি শুধু সাধারণ সদস্যদের জন্য? গোপালগঞ্জ জেলার সাবেক শেষ এসপির আশীর্বাদপুষ্ট এই এসআই কীভাবে এখনও এত দাপট নিয়ে কাজ করে যান, তা কি প্রশাসনের অজানা?

যা হোক, সব কথা বলা যায় না। তবুও বলি—গোপালগঞ্জ বাংলাদেশের মানচিত্রে একটি জেলা মাত্র, তবে আবেগে পূর্ণ এক জনপদ। এখানকার মানুষ বাংলাদেশের মানুষ। তাদেরও অধিকার আছে নিরাপত্তা পাওয়ার, কথা বলার, ন্যায়ের আশ্রয় খোঁজার।

গোপালগঞ্জকে রাজনৈতিক শক্তির প্রতীক না বানিয়ে মানুষের জেলা হতে দিন। আলোচনায় অন্তত একবার তাঁদের কণ্ঠস্বর জায়গা পাক—যারা পথে হাঁটে, নেতার পাশে নয়, দেশের পাশে।

সাংবাদিক ও লেখক