শেখ হাসিনা ফিরবেন, কিন্তু কীভাবে?
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:১১:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
- / 58
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনের দুই বছর পর অনেকে প্রশ্ন তুলছেন; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে চায়? নাকি এটি কেবল ভূ-রাজনৈতিক গুজব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার আগে আমাদের বুঝতে হবে, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ কী এবং পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়? প্রকৃতপক্ষে, কোনো পরাশক্তির প্রতি অন্ধ আনুগত্য বা অতিরিক্ত সন্দেহ; দুটোই বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি, যা চীন, যুক্তরাষ্ট্র বা ভারত; কোনো একক শক্তির এজেন্ডা দ্বারা পরিচালিত হবে না।
প্রথমত, ‘যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে চায়’ এই ধারণাটি মূলত অনুমাননির্ভর। আর এই অনুমানের সূত্রপাত দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন কূটনৈতিক মিশনের বিশেষ ধরনের নড়াচড়া থেকে। ঐতিহাসিকভাবে ওয়াশিংটন কখনো কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তিকে নয়, নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কুখ্যাত স্বৈরশাসক, অগণতান্ত্রিক রাজা-বাদশাহ-আমিরের পক্ষাবলম্বনে লজ্জিত হয় না। গণতন্ত্র, স্থিতাবস্থা বা নিরাপত্তার অজুহাতে নিজেদের স্বার্থে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েও তারা শান্তি ও গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী। একইভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু নয়, পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেই স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র ও নিরাপত্তার অজুহাতে মূলত চীনের প্রভাব প্রতিরোধে সক্ষম সরকারই দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বরাবরই নিজেদের কৌশলগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছে, বন্ধু দেশ, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি-স্বার্থকে নয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল, কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে নেয়। আবার ২০০৭ সালের ১/১১ পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে কাজ করেছিল, যা পরে নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফেরার পথ খুলে দেয়। অর্থাৎ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো তাদের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করা, কোনো নির্দিষ্ট দল বা নেতাকে ক্ষমতায় বসানো নয়। মূল লক্ষ্য মার্কিন স্বার্থ উদ্ধার। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে এ ধরনের গুজব থেকে সরে এসে নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, এআরটি (Agreement on Reciprocal Trade) চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে; শেখ হাসিনা কি এই চুক্তি বাস্তবায়নে একমাত্র যোগ্য?
ওয়াশিংটনের কাছে মূল বিষয় হলো ঢাকায় এমন একটি সরকার থাকা, যারা বাণিজ্য উদারীকরণ, শ্রম অধিকার সংকুচিত করা, ‘রিয়েল প্রাইজিং’-এর নামে নাগরিকদের সুবিধাসংক্রান্ত সেবা খাতে ভর্তুকি কর্তন, বৌদ্ধিক সম্পত্তি সুরক্ষা, মার্কিন কৃষি ও প্রাণীসম্পদের বাজার সম্প্রসারণ এবং বিগ-টেক কোম্পানিগুলোর বাজারে প্রবেশ নিশ্চিত করবে। অন্তর্বর্তী সরকারকে দিয়ে তারা এই চুক্তি স্বাক্ষর করিয়ে নিলেও এর বাস্তবায়ন নির্ভর করে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর। ফলে চুক্তির বিষয়গুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হলে যেসব অজনপ্রিয় বিধি ও আইন করতে হবে, কৃষি-শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে সরাসরি মানুষের প্রতিরোধের মুখে পড়বে। তা তুলনামূলক শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ছাড়া মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।
বর্তমান বিএনপি বা জামায়াতের নীরবতায় স্পষ্ট, ক্ষমতার স্বার্থে তাদের চুক্তিতে আপত্তি নেই। তাহলে বাংলাদেশে মার্কিন স্বার্থ উদ্ধারে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে একমাত্র ঝুঁকি কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ। সেই নিষেধাজ্ঞা উঠানোর বিনিময়ে মার্কিনিরা ‘ইনক্লুসিভ’-এর স্লোগানে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরানোর জন্য কী কাজ করছে বা চায়?
সাম্প্রতিক আওয়ামী লীগের নড়াচড়ার পেছনে এমন কোনো বোঝাপড়া রয়েছে কি না; সে গুঞ্জন মাঠ থেকে বিশ্লেষক পর্যায় পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে।
তৃতীয়ত, আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন কীভাবে হবে, তা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সত্যিই কি কোনো নির্দিষ্ট নকশা আছে? তবে ওয়াশিংটন সাধারণত বহুদলীয় গণতন্ত্র, অবাধ নির্বাচন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্লোগান দিয়েই তাদের কর্তৃত্বের ন্যায্যতা নির্মাণ করে। যদি আওয়ামী লীগ অভ্যন্তরীণভাবে পুনর্গঠিত হয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চায়, তাহলে সেটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বাইরের কোনো শক্তি যেন তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যবহার করতে না পারে, সেদিকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো পথ হলো; সব রাজনৈতিক দলের জন্য একটি সমতাভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে কারা ক্ষমতায় আসবে। জাতীয় স্বার্থে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; কোনো বাহ্যিক শক্তির পছন্দ-অপছন্দ নয়।
চতুর্থত, ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগর, মিয়ানমার সংকট এবং চীন ইস্যু বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব প্রতিরোধে মিত্র খুঁজছে। বঙ্গোপসাগর এখন বিশ্ব বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর, যেখানে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ মিলেমিশে রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো কৌশল হলো এই প্রতিযোগিতায় সরাসরি সম্পৃক্ত না হয়ে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ নীতি বজায় রাখা। রোহিঙ্গা সংকটে চীনের মধ্যস্থতার প্রয়োজন, আবার মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে চাপে রাখতে মার্কিন ও ইইউর সমর্থনও দরকার। কাজেই একপক্ষকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে দরকার বহুমুখী কূটনীতি; চীনের কাছ থেকে অবকাঠামো বিনিয়োগ, ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য-নিরাপত্তা আলোচনা। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশের ভূখণ্ড বা সমুদ্রসীমা যেন কোনো পরাশক্তির সামরিক ঘাঁটি না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে, ‘গোপন সন্ধি বা স্বার্থ মিলে যাওয়ার’ প্রশ্নে বাংলাদেশের সতর্ক দৃষ্টি রাখা দরকার। পরাশক্তিগুলোর কূটনীতি প্রায়শই গোপন চুক্তির গন্ধ বহন করে, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বিপদ হলো এই ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করে বাস্তব সুযোগ হারানো। বরং বাংলাদেশের উচিত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা; প্রতিটি বাণিজ্য চুক্তি, সামরিক সহযোগিতা বা কূটনৈতিক সমঝোতা যেন জাতীয় সংসদে আলোচিত হয় এবং জনগণের সামনে উন্মুক্ত থাকে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পরাশক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে বিভক্ত ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পরও দীর্ঘদিন জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সদস্য হিসেবে ভারসাম্য রক্ষা করেছে। সেই ঐতিহ্য ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
পরিশেষে বলব, শেখ হাসিনাকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ, এআরটি বাস্তবায়ন বা আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন; এসব প্রশ্নের কেন্দ্রে থাকা উচিত বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ। কোনো পরাশক্তির দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং আমাদের নিজস্ব কৌশলগত স্বাধীনতাই হলো মূল চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের উচিত চীন-যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের মধ্যে ভারসাম্য রেখে নিজের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যারা পরাশক্তির খেলায় অন্ধভাবে পক্ষ নেয়, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের জন্য তাই একমাত্র পথ; নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে, নিজের স্বার্থ রক্ষা করে, সবার সঙ্গে সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রেখে এগিয়ে যাওয়া।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক





























