ঢাকা ০৮:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চিকিৎসা দেওয়ার ভবনই যেন মুমূর্ষু রোগী

আকাশ মারমা মংসিং, বান্দরবান
  • সর্বশেষ আপডেট ০৭:৫০:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬
  • / 20

চিকিৎসা দেওয়ার ভবনই যেন মুমূর্ষু রোগী

সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবনটি দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। দেয়াল ও ছাদে ফাটল, পলেস্তারা খসে পড়া, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশসহ নানা সমস্যায় আতঙ্কের মধ্যে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে রোগী ও স্বজনদের। যে ভবনে মানুষের চিকিৎসা দেওয়ার কথা, সেটিই এখন যেন নিজেই মুমূর্ষু রোগীতে পরিণত হয়েছে।

১৯৮৭ সালে ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হিসেবে নির্মিত হয় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ভবন। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণের পর দীর্ঘ ৩৯ বছরেও ভবনটিতে বড় ধরনের সংস্কার করা হয়নি। ফলে ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও দেয়াল ও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। বর্ষাকালে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ায় রোগী, চিকিৎসক ও কর্মীদের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।

দুর্গম এলাকার কয়েক লাখ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসা এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও জনবল সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে চিকিৎসক ও স্টাফসহ মোট ৩৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র তিনজন। ২৫ জন নার্সের পদ থাকলেও আছেন তিনজন। তিনটি মেডিকেল অফিসার পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন একজন। ১৮ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন মাত্র চারজন।

এ ছাড়া দুটি ফার্মাসিস্ট পদের বিপরীতে কোনো ফার্মাসিস্ট নেই। চারজন জুনিয়র কনসালটেন্টের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন একজন। ডেন্টাল সার্জন, নার্সিং সুপারভাইজার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট নার্সের পদও শূন্য রয়েছে। ছয়জন মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদ থাকলেও সেখানেও রয়েছে জনবল সংকট।

ফলে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের একদিকে জরাজীর্ণ ভবনের ঝুঁকি, অন্যদিকে চিকিৎসক ও নার্স সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডেও পর্যাপ্ত নার্স না থাকায় রোগীদের সেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনের বিভিন্ন অংশে পলেস্তারা খসে পড়েছে। দেয়াল ও ছাদে ফাটল রয়েছে। কোথাও কোথাও ছাদের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। চারপাশে ময়লা-আবর্জনা জমে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। রোগীদের ব্যবহৃত বিছানাগুলোও অনেক ক্ষেত্রে অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।

রোগীরা জানান, ভবনের বিভিন্ন অংশ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ায় কখন বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে, সেই আতঙ্কে থাকতে হয়। চিকিৎসক ও নার্সের সংকটের পাশাপাশি অপরিচ্ছন্ন পরিবেশেও তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন তারা।

চিকিৎসা নিতে আসা কুলসুম ও লোকমানসহ কয়েকজন রোগী বলেন, হাসপাতালের দেয়াল ও ছাদের অবস্থা দেখে সব সময় ভয় হয়। কখন কোনো অংশ ধসে পড়ে, তা নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয়। দ্রুত ভবন সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণ করা হলে সাধারণ মানুষ নিরাপদে চিকিৎসাসেবা নিতে পারবেন।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এনামুল হাসান বলেন, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবনটি ধীরে ধীরে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশা করছেন তিনি।

বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। তাই নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি বর্তমান ভবনের অবস্থা পরিদর্শন করে নিরাপত্তা যাচাই করা হবে। ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

চিকিৎসা দেওয়ার ভবনই যেন মুমূর্ষু রোগী

সর্বশেষ আপডেট ০৭:৫০:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবনটি দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। দেয়াল ও ছাদে ফাটল, পলেস্তারা খসে পড়া, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশসহ নানা সমস্যায় আতঙ্কের মধ্যে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে রোগী ও স্বজনদের। যে ভবনে মানুষের চিকিৎসা দেওয়ার কথা, সেটিই এখন যেন নিজেই মুমূর্ষু রোগীতে পরিণত হয়েছে।

১৯৮৭ সালে ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হিসেবে নির্মিত হয় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ভবন। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণের পর দীর্ঘ ৩৯ বছরেও ভবনটিতে বড় ধরনের সংস্কার করা হয়নি। ফলে ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও দেয়াল ও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। বর্ষাকালে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ায় রোগী, চিকিৎসক ও কর্মীদের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।

দুর্গম এলাকার কয়েক লাখ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসা এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও জনবল সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে চিকিৎসক ও স্টাফসহ মোট ৩৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র তিনজন। ২৫ জন নার্সের পদ থাকলেও আছেন তিনজন। তিনটি মেডিকেল অফিসার পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন একজন। ১৮ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন মাত্র চারজন।

এ ছাড়া দুটি ফার্মাসিস্ট পদের বিপরীতে কোনো ফার্মাসিস্ট নেই। চারজন জুনিয়র কনসালটেন্টের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন একজন। ডেন্টাল সার্জন, নার্সিং সুপারভাইজার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট নার্সের পদও শূন্য রয়েছে। ছয়জন মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদ থাকলেও সেখানেও রয়েছে জনবল সংকট।

ফলে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের একদিকে জরাজীর্ণ ভবনের ঝুঁকি, অন্যদিকে চিকিৎসক ও নার্স সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডেও পর্যাপ্ত নার্স না থাকায় রোগীদের সেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনের বিভিন্ন অংশে পলেস্তারা খসে পড়েছে। দেয়াল ও ছাদে ফাটল রয়েছে। কোথাও কোথাও ছাদের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। চারপাশে ময়লা-আবর্জনা জমে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। রোগীদের ব্যবহৃত বিছানাগুলোও অনেক ক্ষেত্রে অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।

রোগীরা জানান, ভবনের বিভিন্ন অংশ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ায় কখন বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে, সেই আতঙ্কে থাকতে হয়। চিকিৎসক ও নার্সের সংকটের পাশাপাশি অপরিচ্ছন্ন পরিবেশেও তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন তারা।

চিকিৎসা নিতে আসা কুলসুম ও লোকমানসহ কয়েকজন রোগী বলেন, হাসপাতালের দেয়াল ও ছাদের অবস্থা দেখে সব সময় ভয় হয়। কখন কোনো অংশ ধসে পড়ে, তা নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয়। দ্রুত ভবন সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণ করা হলে সাধারণ মানুষ নিরাপদে চিকিৎসাসেবা নিতে পারবেন।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এনামুল হাসান বলেন, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবনটি ধীরে ধীরে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশা করছেন তিনি।

বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। তাই নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি বর্তমান ভবনের অবস্থা পরিদর্শন করে নিরাপত্তা যাচাই করা হবে। ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।