ঢাকা ০৬:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিজের বাড়িতেই বন্দি বৃদ্ধ দম্পতি, ৮ বছর ধরে মই বেয়ে যাতায়াত

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার
  • সর্বশেষ আপডেট ০৪:৪৬:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
  • / 7

নিজের বাড়িতেই বন্দি বৃদ্ধ দম্পতি, ৮ বছর ধরে মই বেয়ে যাতায়াত

বাড়ির প্রধান ফটকটি খোলা। কিন্তু সেই ফটক দিয়ে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট উঁচু ইটের দেয়াল। বাইরে যাওয়ার একমাত্র উপায় পাশের বাড়ির ছাদ, আর সেই ছাদে উঠতে ভরসা একটি কাঠের মই

সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের রাজফুলবাড়িয়া এলাকার নগরচর গ্রামের আনিসুর রহমান ও তার স্ত্রী রাশিদা বেগমের জীবন গত আট বছর ধরে এমনই। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই দম্পতিকে প্রতিদিন বাজার, চিকিৎসক কিংবা জরুরি কোনো কাজে যেতে হলে ঝুঁকি নিয়ে মই বেয়ে পাশের বাড়ির ছাদে উঠতে হয়। এরপর ছাদ পেরিয়ে অন্য পাশে নেমে তবেই মূল সড়কে যেতে পারেন তারা।

ষাটোর্ধ্ব এই দম্পতি যেন নিজের বাড়িতেই এক ধরনের বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে ঝালকাঠির সদর উপজেলার মানপয়সা গ্রামের বাসিন্দা আনিসুর রহমান সাভারের নগরচর এলাকায় চার শতাংশ জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেন। সে সময় বাড়ির পাশ দিয়ে চলাচলের রাস্তা ছিল। কয়েক বছর পর সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়।

আনিসুর রহমানের অভিযোগ, স্থানীয় বাসিন্দা আসলাম হোসেন তার বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে দেয়াল তুলে চলাচলের পথ বন্ধ করে দেন। তার দাবি, আসলাম হোসেন একসময় তার জমি ১০ লাখ টাকায় কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি রাজি না হওয়ায় পরে বাড়ির সামনে দেয়াল তুলে দেওয়া হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, আনিসুর রহমানের বাড়ির সামনে ১০ থেকে ১২ ফুট উঁচু দেয়াল। দেয়ালের কারণে বাড়ি থেকে সরাসরি বের হওয়ার কোনো রাস্তা নেই। পাশের বাড়ির ছাদে ওঠার জন্য একটি কাঠের মই রাখা হয়েছে। সেই মই বেয়ে ছাদে উঠে অন্য পাশ দিয়ে নেমে মূল সড়কে যেতে হয়।

আনিসুর রহমান বলেন, ‘১৯৯৫ সালে এখানে এসে জমি কিনে বাড়ি করেছি। তখন বাড়ির পাশ দিয়ে রাস্তা ছিল। পরে আসলাম হোসেন আমার জমি ১০ লাখ টাকায় কিনে নিতে চেয়েছিলেন। আমি রাজি হইনি। এরপর বাড়ির গেটের সামনে দেয়াল তুলে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রায় আট বছর ধরে মই দিয়ে অন্যের বাড়ির ছাদে উঠে বাইরে যেতে হচ্ছে।’

এই দম্পতির কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ জরুরি মুহূর্ত। হঠাৎ করে তারা নিজেরা অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার কোনো স্বাভাবিক ব্যবস্থা নেই। অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা, একজন অসুস্থ মানুষকেও বাড়ি থেকে বের করে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

রাশিদা বেগম বলেন, ‘বাড়িতে কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়া খুব কষ্টের। অন্যের বাড়ির ছাদ দিয়ে নিয়ে যেতে হয়। আমাদের অনেক কষ্ট হয়।’

শুধু চিকিৎসা নয়, প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনও ব্যাহত হচ্ছে তাদের। বাজার করা, ওষুধ কেনা কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া; প্রতিটি কাজের আগে তাদের ভাবতে হয় কীভাবে বাড়ি থেকে বের হবেন এবং ফিরে আসবেন।

অভিযোগের বিষয়ে আসলাম হোসেনকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। তবে তার বাড়ির ব্যবস্থাপক জিয়াউর রহমান বলেন, রেজা নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে আসলাম হোসেন চার শতাংশ জমি কিনেছেন। পরে আনিসুর রহমান বিএস রেকর্ডে জমির পাশ দিয়ে একটি রাস্তা রেকর্ড করে নেন। এ নিয়ে বিএস রেকর্ড বাতিলের দাবিতে আদালতে মামলা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা-২ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য আমান উল্লাহ আমান বলেন, তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছেন। ভুক্তভোগী পরিবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম জানান, ঘটনাটি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ অবৈধভাবে জায়গা দখল করে থাকলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত আট বছর ধরে একটি কাঠের মইই যেন আনিসুর রহমান ও রাশিদা বেগমের চলাচলের একমাত্র ভরসা। নিজের জমিতে নিজের ঘর থাকলেও বাইরে যাওয়ার স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এই বৃদ্ধ দম্পতি। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া দুজন মানুষের প্রতিদিনের এই ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত এখন শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগ নয়; এটি তাদের নিরাপদ চলাচল ও মৌলিক অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

নিজের বাড়িতেই বন্দি বৃদ্ধ দম্পতি, ৮ বছর ধরে মই বেয়ে যাতায়াত

সর্বশেষ আপডেট ০৪:৪৬:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

বাড়ির প্রধান ফটকটি খোলা। কিন্তু সেই ফটক দিয়ে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট উঁচু ইটের দেয়াল। বাইরে যাওয়ার একমাত্র উপায় পাশের বাড়ির ছাদ, আর সেই ছাদে উঠতে ভরসা একটি কাঠের মই

সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের রাজফুলবাড়িয়া এলাকার নগরচর গ্রামের আনিসুর রহমান ও তার স্ত্রী রাশিদা বেগমের জীবন গত আট বছর ধরে এমনই। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই দম্পতিকে প্রতিদিন বাজার, চিকিৎসক কিংবা জরুরি কোনো কাজে যেতে হলে ঝুঁকি নিয়ে মই বেয়ে পাশের বাড়ির ছাদে উঠতে হয়। এরপর ছাদ পেরিয়ে অন্য পাশে নেমে তবেই মূল সড়কে যেতে পারেন তারা।

ষাটোর্ধ্ব এই দম্পতি যেন নিজের বাড়িতেই এক ধরনের বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে ঝালকাঠির সদর উপজেলার মানপয়সা গ্রামের বাসিন্দা আনিসুর রহমান সাভারের নগরচর এলাকায় চার শতাংশ জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেন। সে সময় বাড়ির পাশ দিয়ে চলাচলের রাস্তা ছিল। কয়েক বছর পর সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়।

আনিসুর রহমানের অভিযোগ, স্থানীয় বাসিন্দা আসলাম হোসেন তার বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে দেয়াল তুলে চলাচলের পথ বন্ধ করে দেন। তার দাবি, আসলাম হোসেন একসময় তার জমি ১০ লাখ টাকায় কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি রাজি না হওয়ায় পরে বাড়ির সামনে দেয়াল তুলে দেওয়া হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, আনিসুর রহমানের বাড়ির সামনে ১০ থেকে ১২ ফুট উঁচু দেয়াল। দেয়ালের কারণে বাড়ি থেকে সরাসরি বের হওয়ার কোনো রাস্তা নেই। পাশের বাড়ির ছাদে ওঠার জন্য একটি কাঠের মই রাখা হয়েছে। সেই মই বেয়ে ছাদে উঠে অন্য পাশ দিয়ে নেমে মূল সড়কে যেতে হয়।

আনিসুর রহমান বলেন, ‘১৯৯৫ সালে এখানে এসে জমি কিনে বাড়ি করেছি। তখন বাড়ির পাশ দিয়ে রাস্তা ছিল। পরে আসলাম হোসেন আমার জমি ১০ লাখ টাকায় কিনে নিতে চেয়েছিলেন। আমি রাজি হইনি। এরপর বাড়ির গেটের সামনে দেয়াল তুলে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রায় আট বছর ধরে মই দিয়ে অন্যের বাড়ির ছাদে উঠে বাইরে যেতে হচ্ছে।’

এই দম্পতির কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ জরুরি মুহূর্ত। হঠাৎ করে তারা নিজেরা অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার কোনো স্বাভাবিক ব্যবস্থা নেই। অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা, একজন অসুস্থ মানুষকেও বাড়ি থেকে বের করে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

রাশিদা বেগম বলেন, ‘বাড়িতে কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়া খুব কষ্টের। অন্যের বাড়ির ছাদ দিয়ে নিয়ে যেতে হয়। আমাদের অনেক কষ্ট হয়।’

শুধু চিকিৎসা নয়, প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনও ব্যাহত হচ্ছে তাদের। বাজার করা, ওষুধ কেনা কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া; প্রতিটি কাজের আগে তাদের ভাবতে হয় কীভাবে বাড়ি থেকে বের হবেন এবং ফিরে আসবেন।

অভিযোগের বিষয়ে আসলাম হোসেনকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। তবে তার বাড়ির ব্যবস্থাপক জিয়াউর রহমান বলেন, রেজা নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে আসলাম হোসেন চার শতাংশ জমি কিনেছেন। পরে আনিসুর রহমান বিএস রেকর্ডে জমির পাশ দিয়ে একটি রাস্তা রেকর্ড করে নেন। এ নিয়ে বিএস রেকর্ড বাতিলের দাবিতে আদালতে মামলা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা-২ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য আমান উল্লাহ আমান বলেন, তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছেন। ভুক্তভোগী পরিবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম জানান, ঘটনাটি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ অবৈধভাবে জায়গা দখল করে থাকলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত আট বছর ধরে একটি কাঠের মইই যেন আনিসুর রহমান ও রাশিদা বেগমের চলাচলের একমাত্র ভরসা। নিজের জমিতে নিজের ঘর থাকলেও বাইরে যাওয়ার স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এই বৃদ্ধ দম্পতি। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া দুজন মানুষের প্রতিদিনের এই ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত এখন শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগ নয়; এটি তাদের নিরাপদ চলাচল ও মৌলিক অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।