ঢাকা ০৫:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ছেলেকে হারিয়ে মায়ের আহাজারি

ফুয়ারে ইতার মধ্যে না নেওয়ার লাগি কইছি

নিজস্ব প্রতিবেদক, মৌলভীবাজার
  • সর্বশেষ আপডেট ০৪:৫২:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
  • / 59

ছেলেকে হারিয়ে মায়ের আহাজারি

‘আমি সবসময় কইছি, আমার ফুয়ারে (ছেলেকে) ইতার মধ্যে না নেওয়ার লাগি।’ ২০ বছরের ছেলে তারা মিয়াকে হারিয়ে এভাবেই বিলাপ করছিলেন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার আজিরুন বেগম (৫০)। ছেলেকে যারা চোরাকারবারের কাজে নিয়ে গিয়েছিল, তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান তিনি।

রোববার ভোরে ভারতের মাগুরুলি এলাকায় সীমান্তের ওপারে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন তারা মিয়া। তিনি কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের মুড়ইছড়া বস্তির আব্দুল মালেকের ছেলে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, ভোর ৪টার দিকে চোরাকারবারিদের একটি দল সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করলে বিএসএফ গুলি চালায়। এতে তারা মিয়া নিহত হন।

৪৬ বিজিবির শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ তারা মিয়ার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, তারা মিয়ার বিরুদ্ধে চোরাকারবারের একটি মামলাও রয়েছে।

তবে নিহতের পরিবারের অভিযোগ, সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত মূল হোতারা নিজেদের ঝুঁকির মধ্যে না ফেলে তরুণ ও কম বয়সী ছেলেদের ব্যবহার করে। কখনো অর্থের লোভ দেখিয়ে, আবার কখনো চাপ প্রয়োগ করে তাদের সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়।

তারা মিয়ার বড় ভাই রাজু বলেন, তার ভাইয়ের পরিবারের আর্থিক সংকট ছিল না। তাদের বাড়িঘর ও গাড়িও রয়েছে। এরপরও চোরাকারবারিরা জোর করে তার ভাইকে এই কাজে যুক্ত করেছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ঘটনার রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে রাজু বলেন, রাত ২টার দিকে তিনি স্থানীয় রবিরবাজারে ছিলেন। এ সময় এক ব্যক্তি ফোন করে জানান, তারা মিয়াকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পরে তিনি জানতে পারেন, তার ভাই সীমান্তের দিকে গেছেন।

রাজুর অভিযোগ, চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা নিজেরা সীমান্তে না গিয়ে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী ছেলেদের দিয়ে পণ্য পারাপারের কাজ করান। তিনি বলেন, তরুণদের নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পাঠানো হয়।

তিনি আরও বলেন, এক থেকে দেড় বছর আগেও তাদের পাশের বাড়ির ১৩ বছর বয়সী এক কিশোর বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছিল।

ভাইকে হারানোর পর রাজুর একটাই চাওয়া; আর কোনো পরিবার যেন এমনভাবে স্বজন না হারায়। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই তো মারা গেছে, তাকে আর ফিরে পাব না। আমি চাই, আর কেউ যেন এই কাজে না যায় এবং আর কোনো পরিবারকে যেন এভাবে স্বজন হারাতে না হয়।’

তারা মিয়ার আরেক ভাই রজাক আলী বলেন, যারা তার ভাইকে চোরাকারবারের কাজে নিয়ে গিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে, তাদের আইনের আওতায় এনে সঠিক বিচার করতে হবে।

ছেলেকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন মা আজিরুন বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় কইছি, আমার ফুয়ারে ইতার মধ্যে না নেওয়ার লাগি। এর বাদেও তারা আমার ফুয়ারে নিয়ে গেছে। আমি আমার ফুয়া হত্যার উপযুক্ত বিচার চাই।’

পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত তারা মিয়ার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে চোরাকারবারের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সীমান্ত এলাকায় তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পরিবারটি।

তারা মিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে সীমান্ত এলাকায় তরুণদের চোরাকারবারে ব্যবহারের অভিযোগ। পরিবারের প্রশ্ন, যারা তরুণদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু সীমান্তে যাওয়া তরুণদের দায়ী করলে এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা কীভাবে বন্ধ হবে?

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

ছেলেকে হারিয়ে মায়ের আহাজারি

ফুয়ারে ইতার মধ্যে না নেওয়ার লাগি কইছি

সর্বশেষ আপডেট ০৪:৫২:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

‘আমি সবসময় কইছি, আমার ফুয়ারে (ছেলেকে) ইতার মধ্যে না নেওয়ার লাগি।’ ২০ বছরের ছেলে তারা মিয়াকে হারিয়ে এভাবেই বিলাপ করছিলেন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার আজিরুন বেগম (৫০)। ছেলেকে যারা চোরাকারবারের কাজে নিয়ে গিয়েছিল, তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান তিনি।

রোববার ভোরে ভারতের মাগুরুলি এলাকায় সীমান্তের ওপারে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন তারা মিয়া। তিনি কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের মুড়ইছড়া বস্তির আব্দুল মালেকের ছেলে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, ভোর ৪টার দিকে চোরাকারবারিদের একটি দল সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করলে বিএসএফ গুলি চালায়। এতে তারা মিয়া নিহত হন।

৪৬ বিজিবির শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ তারা মিয়ার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, তারা মিয়ার বিরুদ্ধে চোরাকারবারের একটি মামলাও রয়েছে।

তবে নিহতের পরিবারের অভিযোগ, সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত মূল হোতারা নিজেদের ঝুঁকির মধ্যে না ফেলে তরুণ ও কম বয়সী ছেলেদের ব্যবহার করে। কখনো অর্থের লোভ দেখিয়ে, আবার কখনো চাপ প্রয়োগ করে তাদের সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়।

তারা মিয়ার বড় ভাই রাজু বলেন, তার ভাইয়ের পরিবারের আর্থিক সংকট ছিল না। তাদের বাড়িঘর ও গাড়িও রয়েছে। এরপরও চোরাকারবারিরা জোর করে তার ভাইকে এই কাজে যুক্ত করেছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ঘটনার রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে রাজু বলেন, রাত ২টার দিকে তিনি স্থানীয় রবিরবাজারে ছিলেন। এ সময় এক ব্যক্তি ফোন করে জানান, তারা মিয়াকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পরে তিনি জানতে পারেন, তার ভাই সীমান্তের দিকে গেছেন।

রাজুর অভিযোগ, চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা নিজেরা সীমান্তে না গিয়ে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী ছেলেদের দিয়ে পণ্য পারাপারের কাজ করান। তিনি বলেন, তরুণদের নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পাঠানো হয়।

তিনি আরও বলেন, এক থেকে দেড় বছর আগেও তাদের পাশের বাড়ির ১৩ বছর বয়সী এক কিশোর বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছিল।

ভাইকে হারানোর পর রাজুর একটাই চাওয়া; আর কোনো পরিবার যেন এমনভাবে স্বজন না হারায়। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই তো মারা গেছে, তাকে আর ফিরে পাব না। আমি চাই, আর কেউ যেন এই কাজে না যায় এবং আর কোনো পরিবারকে যেন এভাবে স্বজন হারাতে না হয়।’

তারা মিয়ার আরেক ভাই রজাক আলী বলেন, যারা তার ভাইকে চোরাকারবারের কাজে নিয়ে গিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে, তাদের আইনের আওতায় এনে সঠিক বিচার করতে হবে।

ছেলেকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন মা আজিরুন বেগম। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় কইছি, আমার ফুয়ারে ইতার মধ্যে না নেওয়ার লাগি। এর বাদেও তারা আমার ফুয়ারে নিয়ে গেছে। আমি আমার ফুয়া হত্যার উপযুক্ত বিচার চাই।’

পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত তারা মিয়ার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে চোরাকারবারের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সীমান্ত এলাকায় তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পরিবারটি।

তারা মিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে সীমান্ত এলাকায় তরুণদের চোরাকারবারে ব্যবহারের অভিযোগ। পরিবারের প্রশ্ন, যারা তরুণদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু সীমান্তে যাওয়া তরুণদের দায়ী করলে এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা কীভাবে বন্ধ হবে?