যানজট-বর্জ্য সংকটে অবাসযোগ্য নগর, পরিকল্পনার দাবি
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:৩২:৫৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬
- / 149
যানজট, জলজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নাগরিক সুবিধার সংকট এবং পরিবেশ দূষণের কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন নগর এলাকা ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। রাজধানী ঢাকা বিশ্বের অন্যতম অবাসযোগ্য শহরের তালিকায় রয়েছে। একই ধরনের চাপে রয়েছে চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লাসহ দ্রুত সম্প্রসারিত অন্যান্য নগরগুলোও।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন, দুর্বল সেবা ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব নগর সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। এই বাস্তবতায় দেশের নগরগুলোকে বাসযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতে সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।
শনিবার (১৪ মার্চ) এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্পের ওপর নির্ভর না করে টেকসই নগর গড়তে প্রয়োজন ব্যয়সাশ্রয়ী ও কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে জনগণের প্রকৃত চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
আইপিডি নগর উন্নয়নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশও তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে- কমিউনিটি ও নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে এলাকাভিত্তিক সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সহজ ও কার্যকর সমাধান নির্ধারণ করা।
সংস্থাটি আরও বলেছে, বর্তমানে অনেক সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচিত মেয়রের পরিবর্তে প্রশাসক দায়িত্ব পালন করলেও কাউন্সিলর না থাকায় নাগরিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে। তাই দ্রুত সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার নির্বাচন আয়োজন করে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নগর সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করা জরুরি।
নগর পরিবহন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করে আইপিডি। কেবল ফ্লাইওভার বা মেগা অবকাঠামো নির্মাণ দিয়ে যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর পরিবর্তে গণপরিবহনভিত্তিক পরিকল্পনা, বাস রুট রেশনালাইজেশন, পথচারীবান্ধব অবকাঠামো এবং বাস, মিনিবাস, রিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। পাশাপাশি মেট্রোরেল, মনোরেল, লাইট র্যাপিড ট্রানজিট (এলআরটি), বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি), কমিউটার ট্রেনসহ বহুমাত্রিক গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।
নগরের ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়েও জোর দিয়েছে সংস্থাটি। পরিকল্পিতভাবে অবৈধ দখল ও দোকানপাট সরিয়ে হাঁটার উপযোগী ফুটপাত নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ হকারদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের আওতায় এনে পরিচয়পত্র প্রদানের সুপারিশ করা হয়েছে।
পানি নিষ্কাশন সমস্যা সমাধানে হারিয়ে যাওয়া খাল ও নদীগুলো পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে আইপিডি। পাশাপাশি উন্মুক্ত স্থান, পার্ক ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে খাল খনন কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়।
নগরের বর্জ্য সমস্যার সমাধানে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স গঠন, উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য ফেলা বন্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং বর্জ্য পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি। জৈব বর্জ্যকে কম্পোস্টে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এছাড়া নগরের বিভিন্ন এলাকায় খেলার মাঠ, পার্ক ও বিনোদন সুবিধা বাড়াতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে। যেসব এলাকায় একেবারেই খেলার মাঠ নেই, সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
আইপিডি মনে করে, সিটি কর্পোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থার মধ্যে বিদ্যমান সমন্বয়হীনতা দূর করতে জবাবদিহিমূলক ও তথ্যনির্ভর সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
নগর পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবহারে অনিয়ম দমনে বিশেষায়িত পরিকল্পনা আদালত গঠন এবং পরিবেশ আদালতকে আরও কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি পরিবেশ ও ভূমি ব্যবহারসংক্রান্ত আইন যুগোপযোগীভাবে সংস্কার করে দূষণ ও দখলের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে, উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কর্পোরেট বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে জনকল্যাণ ও দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে নগর উন্নয়ন কার্যক্রমে দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি।


































